
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বিদেশী ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের জন্ম দিয়েছে। এক দিকে এসব ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য ও ঋণমান অত্যন্ত শক্তিশালী; অন্য দিকে দেশের মোট আমানত ও ঋণের বাজারে তাদের অংশ সীমিত। একই সাথে ঋণ বিতরণে সতর্কতা এবং মুনাফায় নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, রফতানি অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে ব্যাংকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দেশের উৎপাদনশীল খাতে তাদের অর্থায়ন কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, তা নিয়ে নীতিগত মহলে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের গতকাল প্রকাশিত- বাংলাদেশে বিদেশী ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম : প্রবণতা ও পরিচালনগত পর্যালোচনা (জানুয়ারি-জুন ২০২৬)- প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আমানত ও ঋণের খতিয়ান : ব্যবধান কেন বাড়ছে?
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশে কার্যরত বিদেশী ব্যাংকগুলোর আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ের থেকে এটি প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও মোট ব্যাংক আমানতে তাদের অংশ কমে ৪ শতাংশে নেমেছে। অন্য দিকে এসব ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিমের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৭০৪ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা দেশের মোট ব্যাংকঋণের মাত্র ২.৭ শতাংশ।
জুন ২০২৬ শেষে গ্রাহক আমানতের বিপরীতে মোট ঋণের অনুপাত ছিল ১২৮.২৪ শতাংশ (অর্থাৎ আমানত-প্রতি-ঋণের হিসাবে ঋণ-আমানত অনুপাত প্রায় ৭৮ শতাংশ)। এই ব্যবধান তাদের রক্ষণশীল ঋণনীতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
বিদেশী ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদ জুন শেষে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ১০ হাজার ৬২১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে দাবি ৬৮ হাজার ৭৭৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, সরকারি খাতে দাবি ৩৫ হাজার ৭৫৯৫ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক সম্পদ ১৭ হাজার ৩৬৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
শিল্প ও বাণিজ্যে ঋণ কেন্দ্রীভূত, কৃষি খাতে সামান্য আগ্রহ
বিদেশী ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের খাতভিত্তিক চিত্রে শিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একচ্ছত্র প্রাধান্য দেখা যায় : শিল্প খাত : মোট ঋণের ৫২.২ শতাংশ বা ২৫ হাজার ৪০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বাণিজ্য ও কমার্স : মোট ঋণের ২১.১ শতাংশ বা ১০ হাজার ২৭৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা; অর্থাৎ এই দুই খাতেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে মোট ঋণের ৭৩.৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক ঋণপত্র খোলা, আমদানি-রফতানির অর্থ পরিশোধ এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের সুবাদে রফতানিমুখী তৈরী পোশাক খাতে ব্যাংকগুলো বিশেষ সুবিধা পায়। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াকরণ এবং নতুন রফতানি পণ্যের বিকাশে অর্থায়ন সীমিত থাকায় অর্থনীতির বহুমুখীকরণে এর প্রভাব কম।
অন্য দিকে কৃষি, মৎস্য ও বন খাতে ঋণ ২৪.৩ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৫৭৫ কোটি ৭০ লাখ টাকায় দাঁড়ালেও মোট ঋণে এ খাতের অংশ মাত্র ৩.২ শতাংশ। পাশাপাশি পরিবহন খাতে ঋণ ৫০.৫ শতাংশ কমে ১০ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং নির্মাণ খাতে ১৪.১ শতাংশ কমেছে।
মুনাফা কমেছে ১৭.৫ শতাংশ, বেড়েছে বিদেশে অর্থ প্রত্যাবাসন
২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিদেশী ব্যাংকগুলোর আর্থিক ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে : কর-পরবর্তী মুনাফা : ১৭.৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৩২১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় (আগের বছর যা ছিল দুই হাজার ৮১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা)। সম্পদের ওপর আয় ২.০৯ শতাংশ থেকে কমে ১.৬২ শতাংশ হয়েছে। ইকুইটির ওপর আয় ৮.৪৪ শতাংশ থেকে কমে ৭.০৬ শতাংশে নেমেছে।
মুনাফা কমার এই ধারার বিপরীতে, মুনাফা ও আয় বাবদ বিদেশে পাঠানো (প্রত্যাবাসন) অর্থ ২৫.৩ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৫৭০ কোটি ১০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে (আগের বছর ছিল এক হাজার ২৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা)। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে লভ্যাংশ বাবদ কোনো অর্থ পাঠানোর তথ্য প্রতিবেদনে না থাকলেও, আয় প্রত্যাবাসন বৃদ্ধির এই প্রবণতা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে কি না; তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
রফতানি আয়ে বড় ভূমিকা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদেশী ব্যাংকগুলোর অবদান তাদের ঋণবাজারের অংশের তুলনায় অনেক বেশি : রফতানি আয় : ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে এসেছে ৩.৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রফতানি আয়ের ১৮.৬ শতাংশ (বোনা পোশাকে ১.৮২ বিলিয়ন ডলার এবং নিটওয়্যারে ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার)।
আমদানি পরিশোধ : একই সময়ে আমদানি বিল পরিশোধ হয়েছে ৪.৬২ বিলিয়ন ডলার (যা মোট আমদানির ১৩.৩ শতাংশ)। এর মধ্যে জ্বালানি পণ্যের আমদানি ৪০.১ শতাংশ এবং যন্ত্রপাতির আমদানি ৪৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মূলধন ও তারল্য শক্তিশালী, তবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে
মূলধন পর্যাপ্ততা : জুন ২০২৬ শেষে দাঁড়িয়েছে ৪১.২১ শতাংশে, যা অত্যন্ত মজবুত আর্থিক ভিত্তির পরিচয় দেয়। তারল্য : মোট সম্পদের ৪৭.৪৮ শতাংশ তরল সম্পদ। তবে লিকুইডিটি কভারেজ রেশিও আগের বছরের থেকে কমে ৩৫৮.৬৮ শতাংশে নেমেছে।
খেলাপি ঋণ : বিদেশী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৬.৫ শতাংশে পৌঁছেছে (যা আগের বছর ছিল ৬.১ শতাংশ)।
বিদেশী ব্যাংকগুলোর শক্তিশালী মূলধন এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সম্পদ। তবে প্রশ্ন হলো- এই সক্ষমতাকে কেবল নিরাপদ ব্যাংকিং ও আমলাতান্ত্রিক বৃত্তে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, রফতানি বহুমুখীকরণ ও টেকসই বৈদেশিক লেনদেনে কিভাবে আরো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, নীতিনির্ধারকদের এখন সেই কৌশলই নির্ধারণ করতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








