রক্তরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে থ্যালাসেমিয়া ও রক্তস্বল্পতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

থ্যালাসেমিয়া, রক্তস্বল্পতা ও রক্তের ক্যান্সার গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। দেশের ১৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে বংশগত রক্তরোগ থ্যালাসেমিয়ার বাহক ১১.৪ শতাংশ। বাহকদের বেশির ভাগেরই গুরুতর উপসর্গ থাকে না কিন্তু বাবা-মা উভয়েই নির্দিষ্ট ধরনের থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।  
বিভিন্ন গবেষণার ভিত্তিতে দেশে থ্যালাসেমিয়ার বাহকের হার আনুমানিক ১০.৯ থেকে ১৩.৩ শতাংশ। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বাহকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ থেকে দুই কোটি ২০ লাখ। রোগীদের নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, অতিরিক্ত লৌহ অপসারণের ওষুধ এবং সমন্বিত চিকিৎসা পাওয়ার সীমাবদ্ধতায় ভোগেন বেশির ভাগই।  
গতকাল বুধবার শাহবাগের আবু সাঈদ আন্তর্জাতিক কনভেনশন হলে আয়োজিত হেমাটোকন ২৬ সম্মেলনে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞরা রক্তরোগের সমস্যা ও চিকিৎসা পদ্ধতি তুলে ধরেন। সম্মেলনে বাহরাইন, ভারত, যুক্তরাজ্য, ইতালি, পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ (ফ্যাকাল্টি) এবং দেশের বিশিষ্ট হেমাটোলজিস্ট, চিকিৎসক ও গবেষকরা অংশগ্রহণ করেন।
সন্ধ্যার পর সম্মেলনটির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন  স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ডা. এ এন এম বজলুর রশিদ, চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব এ কে এম বেঞ্জামিন রিয়াজী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, চিকিৎসা শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নজমুল হোসাইন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হেমাটোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি ও হেমাটোকন ২০২৬’র কনভেনার অধ্যাপক ডা. আমিন লুৎফুল কবির। স্বাগত বক্তব্য দেন সম্মেলনের সদস্যসচিব ও সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো: আদনান হাসান মাসুদ।
সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রক্তরোগে আক্রান্ত রোগীরা যেন দেশেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পান, সেজন্য গবেষণা বাড়াতে হবে এবং তরুণ চিকিৎসকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তিনি হেমাটোলজি চিকিৎসার উন্নয়ন, উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা এবং গবেষণার প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। 
বিশেষজ্ঞরা বলেন, থ্যালাসেমিয়ার বাহক শনাক্ত করতে হিমোগ্লোবিন বিশ্লেষণসহ প্রাসঙ্গিক পরীক্ষা করা হয়। বিয়ের আগে বা সন্তান নেয়ার পরিকল্পনার সময়ে দু’জনের বাহক অবস্থা জানা থাকলে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জিনগত পরামর্শ নেয়া যায়। বাবা-মা উভয়েই একই প্রাসঙ্গিক রোগসৃষ্টিকারী জিনের বাহক হলে প্রতিটি গর্ভধারণে সন্তান থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত । তবে জিনগত ধরন অনুযায়ী ঝুঁকি ও রোগের তীব্রতা ভিন্ন হতে পারে।
সম্মেলনের সদস্যসচিব অধ্যাপক আদনান হাসান মাসুদ বলেন, বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসায় নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন, শরীরে অতিরিক্ত লৌহ জমা প্রতিরোধের ওষুধ এবং বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সমন্বিত সেবার প্রয়োজন। কিন্তু এসব সেবার প্রাপ্যতা ও ব্যয় রোগীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। থ্যালাসেমিয়া বা অন্যান্য রক্তরোগের ক্ষেত্রে জাতীয় রোগী নিবন্ধন, জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ, বাহক শনাক্তকরণ ও জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অধ্যাপক আদনান হাসান মাসুদ বলেন, রক্তরোগের আরেকটি বড় সমস্যা রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া। রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, ফ্যাকাশে ভাব, বুক ধড়ফড় ও শারীরিক পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।