ন্যাশনাল ব্যাংক কি পারবে ঋণের টাকায় ঘুরে দাঁড়াতে

বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে আস্থার সঙ্কট এবং তীব্র তারল্য ঘাটতি মোকাবেলায় এক নতুন মোড় নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের শিকার হয়ে ধুঁকতে থাকা বেসরকারি খাতের অন্যতম পুরনো প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে ১০ শতাংশ সুদে ন্যাশনাল ব্যাংককে সাত হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে তিন মাসের জন্য এই ঋণ দেয়া হয়েছে। এই ঋণের জন্য  তিন মাসে   প্রায় ১৭৫ কোটি টাকার সুদ পরিশোধ করতে হবে ন্যাশনাল ব্যাংককে। সেটি কি পারবে ন্যাশনাল ব্যাংক, নাকি ঋণের টাকা থেকে সুদ পরিশোধ করা হবে?
এখন প্রশ্ন উঠেছে- একটি দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংককে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ দেয়ার ফলে শেষ পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়বে না তো সোনালী ব্যাংক? এই ঋণের আসল গন্তব্য কোথায় এবং ন্যাশনাল ব্যাংক কি আদৌ এই অর্থ ফেরত দিতে সক্ষম হবে? অতীত রেকর্ড কিন্তু তা বলে না। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই ব্যাংকে তারল্য সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল। জানা  গেছে, ন্যাশনাল ব্যাংক তার ‘কানাকড়ি’ পরিশোধ করতে পারেনি। তার সক্ষমতাও নেই পরিশোধের!  তবে ন্যাশনাল ব্যাংক ঋণ দেয়ার পিছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতি উৎসাহ বেশ কৌতূহলোদ্দীপক !
সঙ্কটের নেপথ্য চিত্র ও অতীত রেকর্ড   
এক সময়ের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংকের এই করুণ দশার পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাব। ২০০৯ সালের পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আওয়ামী লীগপন্থী ব্যবসায়ী সিকদার পরিবারের হাতে। ওই সময়ে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে চরম অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, যার বড় অংশই এখন মন্দ বা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। মন্দ ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ৭০ শতাংশ বলে জানা গেছে।  ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে  পরিবর্তন আনা হলেও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ক্ষত এখনো সারেনি। ন্যাশনাল ব্যাংকের অতীত রেকর্ড অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।
সূত্র জানায়,অতীতে বিভিন্ন ব্যাংক ও উৎস থেকে ৯৮৫ কোটি টাকা ধার নিয়ে তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল ব্যাংকটি। শেষ পর্যন্ত সেই দায় মেটাতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেই প্রতিষ্ঠানটির মোট দেনার পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এর পুরোটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা ছাপিয়ে বা বিভিন্ন উপায়ে সরবরাহ করেছে। টানা লোকসানের মুখে থাকা এই ব্যাংকটির পক্ষে নতুন ঋণ শোধ করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে অর্থনীতিবিদদের।   
এ ধরনের রেকর্ড থেকে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে: যে ব্যাংক ৯৮৫ কোটি টাকা ফেরত দিতে পারেনি, সে সাত হাজার কোটি টাকা তিন মাসে ফেরত দিবে কিভাবে?
সোনালী ব্যাংকের ঝুঁকি কতখানি?
তাত্ত্বিক ও চুক্তিগত দিক থেকে বিবেচনা করলে, এই অর্থায়নে সোনালী ব্যাংকের সরাসরি কোনো আর্থিক ঝুঁকি নেই বললেই চলে। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) স্পষ্ট করেছেন যে, এই ঋণের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ গ্যারান্টি। চুক্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত তিন মাস মেয়াদ শেষে ন্যাশনাল ব্যাংক যদি অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, তবে শর্তানুযায়ী মাত্র তিন কর্মদিবসের মধ্যে সেই অর্থ সোনালী ব্যাংককে বুঝিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক। পূর্বে ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য সংস্থাকেও একই মডেলে তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছিল।   তবে পরোক্ষ ও ম্যাক্রো-ইকোনমিক ঝুঁকি অত্যন্ত গভীর। বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে গ্যারান্টি দিয়ে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে টাকা স্থানান্তর করছে, তার বড় অংশই আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বা নতুন মুদ্রা সৃষ্টির মাধ্যমে। দিনশেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এভাবে দায় নিতে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে বেশ কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি ঘর ১০ শতাংশের ঘরে রয়েছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এই হার চলতি অর্থবছরে ১১ শতাংশ হতে পারে। 
আমানতকারীদের ভিড় ও বর্তমান পরিস্থিতি  
তহবিল সঙ্কটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকা তুলতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে বাধ্য হয়ে চারজন আমানতকারী হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে ন্যাশনাল ব্যাংক আজ ১৫ অক্টোবর থেকে প্রতিটি শাখা ও এটিএম বুথে পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ এবং আমানত ফেরতের ঘোষণা দিয়েছে।   ঘোষণার পর গত তিন দিনেই এক লাখ টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন প্রায় সাড়ে সাত হাজার গ্রাহক টাকা তোলার জন্য আবেদন করেছেন। ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন আশা প্রকাশ করেছেন যে, গ্রাহকদের আস্থা ফিরলে সবাই একবারে টাকা তুলে নেবেন না। তবে বাস্তবে যদি বিশাল অঙ্কের আমানত একসাথে উইথড্র হয়ে যায়, তবে সাত হাজার কোটি টাকার এই তারল্য সহায়তাও খুব দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে।   
স্থায়ী সমাধান কোন পথে?
ব্যাংকটি টানা লোকসানে রয়েছে এবং আয়ের নতুন কোনো শক্ত উৎস দেখা যাচ্ছে না।
মূল সমস্যা খেলাপি ঋণ। তা আদায়ের অগ্রগতির তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
এর আগের ধার ও তারল্য সহায়তার ফল সন্তোষজনক নয়।
আমানত প্রত্যাহারের চাপ বাড়লে সহায়তার অর্থ দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের তারল্য সহায়তা বা ধার দেয়া হলো সাময়িক ব্যথানাশক ওষুধের মতো। এটি কেবল তাৎক্ষণিক গ্রাহক অসন্তোষ ও লাইন কমানোর কাজ করবে। কিন্তু ন্যাশনাল ব্যাংকের অন্তর্নিহিত সঙ্কট কাটবে না, যদি না খেলাপি ঋণ আদায় করা যায় এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসন ফিরে আসে। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবে যেসব ঋণ লোপাট হয়েছে, তা কঠোর হাতে উদ্ধার করতে হবে। অন্যথায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টি বা অন্য ব্যাংকের তারল্য দিয়ে একটি মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর এর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

Advertisement