‘হলুদ রেখা’র ফাঁদে বিপন্ন দক্ষিণ লেবানন ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে গৃহহীনরা

আলজাজিরা
দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তঘেঁষা খিয়াম গ্রামের বাসিন্দা আলি বেশ কয়েক মাস ধরে পরিবার নিয়ে উত্তর-পূর্বের হাসবাইয়া অঞ্চলের একটি ভাড়াবাড়িতে বসবাস করছেন। ইসরাইলি আগ্রাসনে দক্ষিণ লেবাননের যেসব হাজার হাজার অধিবাসী ভিটেমাটি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, আলি তাদেরই একজন। নিজের পরিচয় গোপন রেখে তিনি আলজাজিরাকে বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এক অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। মূলত ভুল রাজনৈতিক কৌশল ও চরম ব্যর্থতার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দুই দেশের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সেনা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে জুন মাসে একটি সমঝোতাচুক্তি সই হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, চুক্তি সত্ত্বেও ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের এক বিশাল এলাকা দখলে রেখেছে। একই সাথে তারা একের পর এক গ্রামে বাড়িঘর ও সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো ধারাবাহিকভাবে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ ইতোমধ্যে স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাদের সেনারা দক্ষিণ লেবানন ছাড়বে না। তার এই বক্তব্যে ইঙ্গিত মেলে, অতীতে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে চলা দখলের মতোই এবারো সেখানে দীর্ঘমেয়াদে আস্তানা গাড়তে চলেছে ইসরাইল।
কঠোর নিয়ন্ত্রণসীমা
দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় বিরতির পর গত ২ মার্চ ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে রকেট বর্ষণ করে হিজবুল্লাহ। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি শর্ত বারবার লঙ্ঘন এবং মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিবাদেই এই পাল্টা আঘাত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেবাননের ওপর দ্বিতীয় দফায় ভয়াবহ আক্রমণ শুরু করে ইসরাইল। স্থল অভিযান ও আকাশ হামলায় ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন প্রায় ১২ লাখ মানুষ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লিপ্ত হিজবুল্লাহ তীব্র বিরোধিতা করলেও, বৈরুত সরকার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সাথে সরাসরি আলোচনায় অংশ নেয়। হিজবুল্লাহর অনীহা সত্ত্বেও ওই আলোচনার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় রূপরেখা চুক্তি। এতে বলা হয়, কয়েকটি বিশেষ ‘পাইলট জোন’ থেকে ইসরাইল সরে দাঁড়াবে এবং সেখানে লেবাননের জাতীয় সেনাবাহিনী গিয়ে হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ অস্ত্র মুক্ত করবে। বর্তমানে লেবানন সীমান্তের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার অঞ্চল ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সামরিক দখলের এই সীমানাকে ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই রেখার পেছনের এলাকাগুলোতে একের পর এক স্থাপনা ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে তারা।
 প্রসঙ্গত, গাজা উপত্যকায় নিজেদের দখলকৃত অঞ্চল বোঝাতেও একই ধরনের ‘হলুদ রেখা’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিল ইসরাইলি বাহিনী। নিউ ইয়র্কভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দক্ষিণ লেবাননের বিনতে জেবিলের সন্তান মোহাম্মদ বাজ্জি জানান, সীমান্তঘেঁষা ডজন ডজন গ্রাম সম্পূর্ণ জনশূন্য করা এবং স্থানীয়দের বিতাড়িত করে অঞ্চলটিকে বসবাসের অযোগ্য তোলাই ইসরাইলের মূল লক্ষ্য। স্যাটেলাইট চিত্রেও সেই ছবিই স্পষ্ট।

Advertisement