স্থবির বেতন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কমছে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা

 

Advertisement

২০২৬ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির দাপটে চরম চাপের মুখে পড়েছে দেশের সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা। মূল্যস্ফীতি যে হারে বাড়ছে, শ্রমজীবী মানুষের আয় বা মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে তারচেয়ে ধীরগতিতে। এতে দিন দিন সঙ্কুচিত হচ্ছে মানুষের প্রকৃত আয়। ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত আমানত বা তারল্য থাকলেও তা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না হওয়া এবং সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত সোমবার বিকেলে  প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক : সেপ্টেম্বর ২০২৬’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এটি জিইডির ওয়েবসাইটে সোমবার দিলেও কাল থেকে এটিকে জিইডির ওয়েবসাইটে আর  খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 
৩০ হাজার টাকার বাজেটে ২.৩ দিনের খরচ গায়েব
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএসএস) মূল্যস্ফীতির তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশে। এর প্রভাবে এক বছর আগে যে ৩০ হাজার টাকার বাজেটে একটি পরিবারের পুরো মাস (৩০ দিন) চলত, বর্তমান দরদামে সেই টাকায় চলছে মাত্র ২৭.৭ দিন। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় প্রতি মাসে একটি পরিবার প্রায় ২.৩ দিনের সমপরিমাণ ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। আয় বাড়লেও কমছে ঘরের সঞ্চয় সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশ হলেও মজুরি বা আয় বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৭.৯ শতাংশ। আয়ের চেয়ে ব্যয়ের অনুপাত  বেশি হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বাস্তব ক্ষেত্রে আরো বেশি দরিদ্র হয়ে পড়ছে। প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোর দৈনিক জীবনযাত্রার মান  হ্রাস পাচ্ছে।  
উল্লেখ্য, টানা ৪ বছর ধরেই দেশে উচ্চমূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল(আইএমএফ) তাদের গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত ইকোনমিক আউটলুকে বলেছে, চলতি বছরেও বাংলাদেশে উচ্চমূল্যস্ফীতি থাকবে। এবং সেটি ১১ ভাগে উত্তীর্ণ হতে পারে। 
ব্যাংকিং খাতে অলস তারল্য
বেসরকারিতে ঋণের বিষয়ে জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৩১ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১১.৯৬ শতাংশ বেশি। কিন্তু এই বিপুল আমানতের বিপরীতে ব্যক্তিগত বা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ (১৮ লাখ ৩০ হাজার ৬১ কোটি টাকা)।   অন্য দিকে একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৩২.৪৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাত লাখ ২২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকায়। 
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, উচ্চ সুদের হার ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থার অভাব থাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ থমকে আছে। সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার সুযোগকে সঙ্কুচিত (ঈৎড়ফিরহম ড়ঁঃ) করছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সার্বিক অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগে মন্দা নেমে আসতে পারে। 
রেমিট্যান্সে স্বস্তি, উদ্বেগে রফতানি খাত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষায় এই মুহূর্তে প্রধান ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি : ২০২৬ সালের ১ থেকে ৫ অক্টোবরের মধ্যে দেশে ৫১৩ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২১.৪ শতাংশ বেশি। কিন্তু জুলাই থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত এসেছে মোট ৯.১০ বিলিয়ন ডলার (১৩.৭% প্রবৃদ্ধি)। রিজার্ভ পরিস্থিতি : ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩৬.২১ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি (ইচগ৬) অনুযায়ী রিজার্ভ ৩১.৪০ বিলিয়ন ডলার।
সতর্কবার্তা 
রেমিট্যান্স ভালো প্রবাহ ধরে রাখলেও রফতানি আয় দ্রুত বৃদ্ধি না করা গেলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতিযোগী সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। পরিকল্পনা কমিশনের জিইডি মনে করে, দেশের এই অর্থনৈতিক চাপ থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে ব্যাংক ঋণের খরচ কমানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।