
পাকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকেও যে ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবমুক্ত থাকার জন্য প্রশংসা পেয়েছে, সেই ব্যবস্থাই এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজরে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অধীনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বাড়তে থাকা বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে এই আলোচনা শুরু হয়েছে।
‘ছোট্ট একটি স্ফুলিঙ্গ শতবর্ষী বনও পুড়িয়ে দিতে পারে’- কথাটি যেন ভারতের নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে সত্য হয়ে উঠছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের এই পরিস্থিতি নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে বিতর্কের সূত্রপাত। এরপর বিষয়টি দেশটির রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এখন সেই বিতর্ক নির্বাচন কমিশনের ৭৬ বছরের বিশ্বাসযোগ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সাথে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকারী গোষ্ঠী ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ দেশজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু করেছে। ‘যন্তর মন্তর সিজন ২’ নামে পরিচিত এই আন্দোলনের লক্ষ্য, জুলাইয়ের বিক্ষোভের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটানো। ওই আন্দোলনের পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৪ সালে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় আসার অনেক আগে থেকেই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে চালু ছিল। তবে বর্তমান সংশোধন কার্যক্রম কোটি কোটি দরিদ্র ভারতীয়ের জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ৩০ লাখ নাম বাদ পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্র দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের প্রায় ১০০ কোটি মানুষকে ভোটাধিকার ধরে রাখতে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে নথিপত্র দেখাতে বলা হচ্ছে। পত্রিকাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের দরিদ্র নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নাম ধরে রাখতে এক দিকে নির্বাচন কর্মকর্তাদের দফতরে বারবার যেতে হচ্ছে, অন্য দিকে দৈনিক মজুরির কাজ করে জীবিকা নির্বাহের বিষয়টিও সামলাতে হচ্ছে।
পত্রিকাটি আরো বলেছে, এই প্রক্রিয়া নিয়ে জনরোষ রাস্তায় নেমে আসা প্রমাণ করে যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের একটি বড় অংশ নরেন্দ্র মোদি ও তার নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপিকে ভোট দেয়ার সম্ভাবনা কম- এমন বিশ্লেষণও তুলে ধরেছে পত্রিকাটি।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে আগে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোর আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়ার ওপর জনসাধারণের আস্থা তুলনামূলকভাবে দৃঢ় ছিল।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বিশ্লেষক ও বিরোধী নেতাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত ও অন্যান্য’ শ্রেণীতে প্রায় ৯ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ায় আগের নির্বাচনগুলোর স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সাথে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
পত্রিকাটি আরো উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল ফলের পর মোদির দল রাজ্য পর্যায়ে একের পর এক জয় পেয়েছে। এর মধ্যে সংশোধিত ভোটার তালিকার ভিত্তিতে এমন একটি বড় রাজ্যেও জয় পেয়েছে, যেখানে দলটি আগে কখনো ক্ষমতায় আসেনি। ভারতের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








