
- ডিলার নিয়োগে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য, রয়েছে আওয়ামী লীগও
- সচিবালয় থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত তদবির, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ
- কিছু অনিয়ম হয়েছে, কমিটিতে কথা বলব : সংসদীয় কমিটির সভাপতি
সার ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সুপারিশ ও স্বজনপ্রীতিই প্রাধান্য পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ৫৫ জেলার আংশিক তালিকায় নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই অনভিজ্ঞ ও নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ‘খাঁটি বিএনপি’ নিশ্চিত করতে গিয়ে এই তালিকায় ঢুকেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতারাও। রয়েছেন শিক্ষার্থীও। সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার ডিলার নিয়োগে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়লেও যাচাই-বাছাইয়ের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সচিবালয় থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত তদবির, আত্মীয়স্বজনকে অগ্রাধিকার এবং লাখ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে বিভিন্ন জেলায় বিতর্ক ছড়িয়েছে। কোথাও দলীয় প্যাডে দেয়া তালিকার সাথে চূড়ান্ত অনুমোদনের নাম ও ক্রমের মিল পাওয়া গেছে, কোথাও সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতারা প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন। নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে তিনজনের প্যানেল কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে পাঠানোর কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এতে সার বিতরণব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং কৃষকের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
পীরগাছায় দলীয় প্যাডের তালিকার সাথে হুবহু মিল : রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রংপুরের পীরগাছা উপজেলা। রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আখতার হোসেন। অথচ পীরগাছায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্বাক্ষরযুক্ত দলীয় প্যাডে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দেয়া তালিকার সাথে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকার নাম ও ক্রমের হুবহু মিল পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের আটটিতে দলীয় তালিকার এক নম্বরে থাকা ব্যক্তি এবং অন্য ইউনিয়নে দুই নম্বরে থাকা ব্যক্তি ডিলার হিসেবে অনুমোদন পেয়েছেন।
অনুমোদিত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের মেয়ে ও দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জয়িতা আক্তার জিনির (জয়িতা সার বিতান) ডিলারশিপও নিশ্চিত হয়েছে। উপজেলার ইটাকুমারী ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানার শ্বশুর আলিমুদ্দিন ময়েন মোল্লাকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
নাগেশ্বরীতে সাবেক এমপির তালিকা, কৃষকদলের প্রতিবাদ : কুড়িগ্রাম-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো: সাইফুর রহমান রানা তার নির্বাচনী এলাকার ১৫টি ইউনিয়নের জন্য নির্ধারিত সার ডিলারদের রাজনৈতিক পরিচয়সহ একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন। তালিকায় কয়েকটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের ডিলারশিপ দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়ার তথ্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে এ আসনের সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর।
নাগেশ্বরী পৌর কৃষকদলের সদস্যসচিব মো: আদম আলী অভিযোগ করেন, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিলারশিপ পাইয়ে দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, দলের কোনো নেতাকর্মী ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য দুর্নীতিতে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া উচিত, যাতে সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ না হয়।
সাতক্ষীরায় ডিলারশিপ বিক্রির অভিযোগ : জেলার চারজন সংসদ সদস্যই বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর। কিন্তু বিএনপি নেতাদের সুপারিশে জেলা প্রশাসন ডিলারশিপ তালিকা প্রণয়ন করেছে।
সাতক্ষীরায় সার ডিলার নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস সেক্রেটারি সাইদুর রহমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, জেলার চারটি সংসদীয় আসনের কয়েকজন জনবিচ্ছিন্ন নেতার সুপারিশে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বিতর্কিত তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তার অভিযোগ, জেলার ৭৮টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ জায়গায় বিএনপির ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে অনভিজ্ঞ ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে। প্রায় ৩০টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ নেতাদের এবং কয়েকটি ইউনিয়নে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। কয়েকটি ইউনিয়নে ডিলারশিপের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলেও তার অভিযোগ। এ পরিস্থিতিতে বিতর্কিত তালিকা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বোরহানউদ্দিনে বহিরাগতকে ডিলার নিয়োগ : ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা ইউনিয়নে ‘ভাই ভাই ট্রেডার্স’-এর মালিক লোকমান হোসেনকে সার ডিলার নিয়োগ দেয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, তিনি ওই ইউনিয়নের বাসিন্দা কিংবা ভোটার নন। তার পরিবারের একাধিক সদস্যের নামেও ইতোমধ্যে সার ডিলারশিপ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। বোরহানউদ্দিন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বাছাই কমিটিকে জানালেও কমিটি কোনো আপত্তি আমলে নেয়নি।
ঈশ্বরগঞ্জে সংসদ সদস্যের ক্ষোভ : ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, অনৈতিক লেনদেন এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুযোগ দেয়ার চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন। এ নিয়ে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে শুক্রবার বেলা ১টার দিকে নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দেন সরকারদলীয় এই এমপি। পোস্টে সংসদ সদস্য দাবি করেন, সার ডিলারের লাইসেন্স দেয়ার নামে অনৈতিক লেনদেনের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন ব্যক্তি লাইসেন্সের জন্য তাকে টাকা দিতে চাইলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে উল্লেখ করেন। ঈশ্বরগঞ্জে তিনি কোনো অনৈতিক সুবিধা নেন না এবং ভবিষ্যতেও নেবেন না বলেও দাবি করেন। সরিষা ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ফ্যাসিবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অর্থ নিয়ে ঘোরাফেরা করা লোকজন লাইসেন্স পেলে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা কে কোথা থেকে কত শতাংশ টাকা নেন, তা তিনি জানেন বলেও পোস্টে দাবি করেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদ সদস্য আরো লেখেন, তার দলের নেতাকর্মীরা মামলা ও হামলার শিকার হবেন, অথচ প্রশাসন টাকার বিনিময়ে সার ডিলারের লাইসেন্স দেবে- এটি মেনে নেয়া হবে না। রাজনৈতিক নেতাদের শুদ্ধি অভিযানের আগে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও শুদ্ধি অভিযান চালানোর দাবি জানান তিনি।
শুধু ময়মনসিংহ, রংপুর, কুড়িগ্রাম নয়- দেশের বিভিন্ন জায়গায়ও ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও ২০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের গুঞ্জন এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বাদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সচিবালয়ে তদবিরের চাপ, তালিকা বদলের অভিযোগ : সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহে কৃষি মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন জেলার সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের আনাগোনা বেড়েছে বলে মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের দফতরে পছন্দের প্রার্থীকে ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে তদবির এবং তালিকায় নামের অবস্থান পরিবর্তনের চাপ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ দিকে গত শুক্রবার যখন কৃষি মন্ত্রণালয় ডিলারশিপের খন্ডিত অংশ প্রকাশ করে তার আগের দিনও কৃষি মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন এমপি ও দলীয় নেতাদের তদবির করতে দেখা গেছে। গত সপ্তাহের মাঝামাঝিতে দিনাজপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: আক্তারুজ্জামান মিয়াসহ একাধিক জনপ্রতিনিধি নিজ এলাকার বিভিন্ন ইউনিয়নের জন্য তালিকা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন সংসদীয় এলাকার সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ অনুসারী বা দলীয় নেতাকর্মীদের ডিলারশিপ দেওয়ার সুপারিশ করে ডিও লেটারসহ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
শুধু সংসদ সদস্যরাই নন, যেসব এলাকায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্য রয়েছেন, সেসব এলাকার বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য কিংবা স্থানীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকেও দলীয় প্যাডে পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকা পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সরকার তাদের পছন্দমতো সার ডিলার নিয়োগ দিচ্ছে। সেটা দিতে পারে। কিন্তু দেখতে হবে, তাদের যোগ্যতা আছে কি না, সার বিতরণে কাজ করতে পারবে কি না।’ বিভিন্ন এলাকায় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এগুলো কেস বাই কেস তদন্ত করা উচিত। তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের শাস্তি দিতে হবে।’
কৃষি সচিব সেলিম খানের সাথে এ বিষয়ে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ডিলার নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে একজন সংসদ সদস্যকে দেখলাম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকের ক্ষোভ-দুঃখ আছে। কিছু অনিয়ম হয়েছে, দেখতেছি। স্বৈরাচারের দোসরদেরও অনেকে পেয়ে গেছে। আমরা এ নিয়ে কমিটিতে কথা বলব। অনেকের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখছি। এগুলো দেখতে হবে।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








