
রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই ক্রেতাদের। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ সঙ্কটের প্রভাবে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে শাকসবজি ও বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। এর সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি। নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে সয়াবিন তেল ও চিনি। ডিমের দাম নিয়েও বাজারভেদে রয়েছে ভিন্ন চিত্র। সব মিলিয়ে সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানোর খরচ আরো বেড়েছে।
এ দিকে শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করলেও তার সুফল এখনো পুরোপুরি পাচ্ছেন না ক্রেতারা। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে শিম, বেগুন, করলা, বরবটি, ঝিঙা ও ঢেঁড়সের মতো সবজি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায়। কোনো কোনো বাজারে আগাম শিমের দাম ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। গাজর বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা এবং টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে। কাঁচামরিচের দামও রয়েছে ১২০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে। তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে পেঁপে, মুলা ও কিছু মৌসুমি সবজি। গতকাল শুক্রবার দুয়ারিপাড়া, মিরপুর-৬ এবং পল্লবি বাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের এমন চিত্র পাওয়া গেছে। তবে বাজারভেদে পণ্য ও মানের কারণে দামে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে একাধিক পণ্যের দাম একসাথে বেশি থাকায় কেনাকাটার পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। আগে যে পরিবার এক কেজি করে কয়েক ধরনের সবজি কিনত, এখন তাদের অনেকেই আধা কেজি করে কিনছেন। কেউ কেউ আবার প্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্য কিছু কেনা বাদ দিচ্ছেন।
দুয়ারিপাড়া বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুজ্জামান সোহেল বলেন, প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেশি। ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে ভালো মানের অনেক সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। শীত আসার আগে দাম কমার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। এ দিকে বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি শীতকালীন সবজির পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ এখনো শুরু হয়নি। আগের মৌসুমের সবজি কমে আসায় বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি সরবরাহের ঘাটতিও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
মিরপুর-৬ বাজারের সবজি বিক্রেতা খাদিমুল ইসলাম বলেন, বেগুন ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বেশির ভাগ সবজির দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। পরিবহন খরচ বেড়েছে, আবার শীতের নতুন সবজি এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণে আসেনি। আগামী এক থেকে দুই মাসে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। তবে শুধু সবজির বাজার নয়, ভোজ্যতেল ও চিনির বাজারেও ক্রেতাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ২০৪ টাকা হলেও বিভিন্ন দোকানে তা ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ২২০ টাকা এবং পাম তেল ২০০ টাকায়।
এ দিকে এক কেজি প্যাকেটজাত চিনির গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১১০ টাকা লেখা থাকলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। কিছু দোকানে প্যাকেট খুলে খোলা চিনি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। সরবরাহের ঘাটতি ও পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে কেনার কারণে নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করা কঠিন বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা।
খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সয়াবিন তেলের সরবরাহ নিয়মিত না হওয়ায় বাজারে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। একই সাথে তেল বিক্রি করে মুনাফা কমে যাওয়ায় অনেক দোকানি পণ্যটি বিক্রিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। আগে প্রতি লিটার বোতলজাত তেলে তিন থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত লাভ হলেও এখন তা কমে এক টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে তাদের দাবি। পল্লবী বাজারে হালিম জেনারেল স্টোরের রাজিব হোসেন বলেন, পাঁচ লিটার তেলের বোতল বিক্রি করে তাদের লাভ হচ্ছে মাত্র পাঁচ টাকা। এত টাকা বিনিয়োগ করে অন্য পণ্য বিক্রি করলে তুলনামূলক বেশি লাভ করা যায়। এর ওপর কোম্পানিগুলো নিয়মিত তেল সরবরাহ করছে না। এ কারণে তেল বিক্রি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ দিকে পেঁয়াজের দামও বেড়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়ে ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। রান্নার অপরিহার্য এ পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ ক্রেতাদের ব্যয় আরো বেড়েছে। একই সাথে আটা ও ময়দার দামও রয়েছে বাড়তি। বাজারে প্রতি কেজি আটা ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ময়দা ৭০ থেকে ৮০ টাকার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় এসব পণ্যের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।
ডিমের বাজারে অবশ্য বিভিন্ন বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। কিছু বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের ডজন ১৪০ টাকায় বিক্রি হলেও অন্য বাজারে তা ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা। পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ডিম কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকা। ফলে ডিমের দাম কমেছে নাকি বাড়তি পর্যায়েই রয়েছে তা বাজার ও বিক্রয়স্থলভেদে নির্ভর করছে।
মুরগির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন নেই। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো বাজারে দাম ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠছে। সোনালি মুরগির কেজি ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা। গরুর গোশত বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ৮০০ টাকায়।
মাছের বাজারেও ক্রেতাদের স্বস্তি নেই। তেলাপিয়া প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০ থেকে ২৩০ টাকা এবং রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাবদা মাছের দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, ট্যাংরা ৭০০ টাকা এবং চিংড়ি আকার ও মানভেদে এক হাজার থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা। বড় আকারের রুই, দেশী কই, বাইম ও শোলের মতো মাছ কিনতে কেজিপ্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বা তারও বেশি খরচ হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ, মাছের আকার এবং জীবিত বা মৃত হওয়ার ওপর দাম নির্ভর করে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায, নিত্যপণ্যের মূল্য চাপের পেছনে একাধিক কারণ একসাথে কাজ করছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পরিবহন ব্যয় বাড়ানোর একটি কারণ হতে পারে। তবে সব পণ্যের দাম বৃদ্ধিকে শুধু পরিবহন ব্যয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। উৎপাদন, মৌসুমি সরবরাহ, পাইকারি বাজারের মূল্য, মজুদ ও বিতরণব্যবস্থা এবং খুচরা পর্যায়ের প্রতিযোগিতাও দামের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই বাজারে প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে উৎপাদন এলাকা থেকে রাজধানীর খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্য ও সরবরাহের ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ জরুরি। বিশেষ করে ভোজ্যতেল ও চিনির ক্ষেত্রে সরবরাহ ঘাটতি এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। উৎপাদক ও পরিবেশক পর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক আছে কি না, খুচরা ব্যবসায়ীরা কত দামে পণ্য কিনছেন এবং কেন এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে- এসব বিষয়ে কার্যকর তদারকি না থাকলে বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হতে পারে। অন্য দিকে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছতে উৎপাদন এলাকা থেকে বাজার পর্যন্ত পরিবহন ও মধ্যস্বত্বভোগী পর্যায়ের ব্যয়ও নজরদারিতে রাখা দরকার। শুধু সরবরাহ বাড়লেই খুচরা বাজারে দাম আনুপাতিক হারে কমবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








