সালাহউদ্দিন বাবর
সালাহউদ্দিন বাবর। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব নতুন নয়। দেশের প্রধান তিনটি দল বিএনপি, আওয়ামী লীগ (যদিও লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ) ও জামায়াত। এই তিন দলের রাজনৈতিক ধারণা বরাবর তিন ধারায় প্রবাহিত। কারো রয়েছে আদর্শবাদী রাজনীতি। যার লক্ষ্য সমাজকে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে তোলা। অন্য দিকে আছে রাজনৈতিক রাজনীতি, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পাওয়া, প্রশাসন, নীতি ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার প্রকাশ থাকে। এই দুই সত্তার স্বরূপ ও চর্চা পুরোপুরি আলাদা। যেমন দ্বিতীয় ধারায়, কথায় থাকে উত্তাপ, কখনো বিনয়, কখনো চাতুরী। দেহভঙ্গিমায় কখনো হেলা, কখনো বা সমীহ, বাচনে থাকে ক্ষোভ উষ্মা ইত্যাদি যত কৌশল। 
বিশ্বে সব গণতান্ত্রিক দেশে উভয় রাজনৈতিক দর্শনের শৈলীর সহাবস্থান লক্ষ করা যায়। কোনো দেশে আদর্শগত পার্থক্যের কারণে পরস্পরের মাঝে সহিংস সঙ্ঘাত হয় না। সহিষ্ণুতার চমৎকার চর্চা বেশির ভাগ দেশে বিরাজ করে। তাদের লড়াই কেবল কাগজে পরিশীলিত ভাষায় বক্তৃতা ও বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ বাংলাদেশে ঠিক তার বিপরীত। সে কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে কেবল অস্থিরতাই অবস্থান করে না, পরস্পর সংঘর্ষ-সঙ্ঘাত প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। এর প্রতিক্রিয়া সর্বত্রই ছড়ায়। ইতোমধ্যে গোটা আর্থসামাজিক জীবন ক্ষত-বিক্ষত ও বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। সহাবস্থানের ঘাটতি দেশের অর্থনীতি ও সুস্থ সমাজ নির্মাণের কাজে ভয়ঙ্কর স্থবিরতার সৃষ্টি করেছে। 
বর্তমান সময়ে রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্যই যেন পাল্টে গেছে। দেশ গড়ার রাজনীতি হয়ে উঠেছে ক্ষমতা হাতে নেয়া, ব্যক্তি গোষ্ঠীর ভাগ্য বদলের হাতিয়ার। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী অতিবাহিত হলেও বাংলাদেশের রাজনীতির এজেন্ডায় এখনো মানুষের ভাগ্য গড়ার লক্ষ্য স্থান করে নিতে পারেনি। ব্যক্তিবিশেষ এবং তাদের অনুসারীতে ভাগ্য বদলের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এর নির্মম পরিণতি হচ্ছে,  সাধারণের ভাগ্য যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই অবস্থান করছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, রাজনীতির এমন অস্থিরতা এবং অন্যান্য অনুষঙ্গ মিলে দেশে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। দেশে বিরাজমান রাজনীতির যোগ ফল এমনটিই হতে বাধ্য। একসময় জনমনে রাজনৈতিক নেতারা ছিলেন নায়ক-মহানায়ক এবং আশার স্থল। এখন হয়তো তারা প্রতিনায়ক হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছেন। কেউ জানে না কেউ বলে না দেশ কোথায় যাচ্ছে। রাজনীতির নেতাদের ভূমিকাকিী! 
আওয়ামী-লীগ ও বিএনপি— এই দুই দলের হাতেই সব চেয়ে বেশি সময় রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল। বিএনপির সময়টা ছিল মন্দের ভালো। স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রপরিচালনা ও গণতান্ত্রিক বিকাশে সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক শক্তি। উভয়েই অনেক বেশি সময়ই রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। দুই দলের আদর্শ এবং ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও পরিচয় পৃথক হলেও একটি বিষয়ে তাদের অভিন্ন অবস্থান। দুই শক্তিই মুখে মুখে গণতন্ত্র, সামগ্রিকভাবে জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণের কথা বলে। কিন্তু তাদের ঘোষিত আদর্শের সাথে বাস্তব রাজনৈতিক চেতনায়, চেহারায় ও আচরণে কতটা জাতি ও জনগণের কল্যাণের ধারণার সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ সেটি একেবারেই স্বচ্ছ না। তাদের ভূমিকার মূল্যায়ন আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের মূল দর্শনে থাকতে হয় দেশের উন্নয়ন এবং জনগণের সুখ ও সমৃদ্ধি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও মানুষের বেঁচে থাকার পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটিও এখনো কোনো মানুষের ধরাছোঁয়ার মাঝে অবস্থান করছে না। তাহলে এমন প্রশ্ন উঠবেই। তারা কোন রীতি-নীতির চর্চা করে। আওয়ামী লীগ সবসময় স্বাধীনতাযুদ্ধকে তাদের ‘ঐতিহাসিক’ অবদানের কথা বলে হাটে-ঘাটে ‘বিক্রয়’ করে। অথচ প্রকৃত সত্য হচ্ছে— ‘স্বাধীতার পর’ থেকে আওয়ামী লীগ দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকে। ক্ষমতার অপচর্চা করেছে, শাসনের নামে শোষণ করে জনগণকে ভুখা-নাঙ্গা ও হতদরিদ্র করেছে। সাথে মানুষের কথা বলার অধিকারটুকু পর্যন্ত হরণ করে নিয়েছে। তারা কখনো কথা দিয়ে, কথা রাখে না। ইতিহাসের পাতায় এ কথাই আছে। অবশেষে ব্যর্থতার দায় মাথায় তুলে পালিয়ে গেছে। দলটির (লীগ) শাসনামলে নিজদের আদর্শের সাথে নিজেরাই নিয়ত প্রতারণা করেছে। পাতানো নির্বাচনে বরাবর সব আসনে ‘বিজয়ী’ হয়েছে। লীগের ইতিহাস নিছক প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বাসভঙ্গের ইতিহাস। বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে যে বয়ান তাদের ছিল, প্রকৃত অর্থে সেটি একটি সঙ্কীর্ণ দর্শন। সেখানে বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো ছোট বা বড় জাতিসত্তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। যা জাতীর ঐক্য ও সংহতির ওপর আঘাত অনিবার্য করেছে। একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষ যদি জাতীর পরিচয় নিয়ে সঙ্কটে পড়ে, নাগরিকদের মাঝে দেয়াল তৈরি হতে বাধ্য। তার প্রতিক্রিয়া কী হয় সেটিও দেখা গেছে। লীগ বলেছে— রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বৈষম্যের সুযোগ নেই; কিন্তু চর্চায় সেটি কোনো গুরুত্ব পায়নি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর ক্ষমতাসীন (আ’লীগ) কর্মী-সমর্থকরা বিভিন্ন সময় দেশের বহু স্থানে হামলা- পীড়ন চালিয়েছে। এসব কিছুই লীগের দ্বিচারিতা। 
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও অসংখ্য গুমের ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগের ঘোষিত আদর্শ ও অনুশীলনের মধ্যে একে শুধু বৈপরীত্য বলে জাতি গ্রহণ করে না; বরং চরম বর্বরতা, নৃশংসতা ও স্বৈরতন্ত্রের ভয়ঙ্কর প্রকাশ বলে মনে করে হয়। ইতিহাসে তাদের এভাবে স্থানে হবে। 
স্বাধীনতার পরবর্তীকালে বিএনপি এ দেশে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের বিপরীতে জাতীয়তাবাদের নতুন দর্শন ও অভিন্ন রাজনৈতিক পাটাতন তৈরি করে। নাগরিকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় শহীদ জিয়ার এই দর্শন। সে কারণে অনন্তকাল পরম শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করবে বাংলাদেশ। দেশের রাজনীতিতে বিএনপি উপস্থাপিত দর্শন দেশের মানুষকে এক সূত্রে গেঁথেছে। 
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুধু রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক। তার শাসনামল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় তৈরি করেছে। এককথায় তা ছিল অনন্য ও অসাধারণ। 
বাংলাদেশের জন্য বেগম খালেদা জিয়ার অবদান ছিল উত্তমতর। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাকে দীর্ঘ সময় কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। তিনিও জাতির জন্য ঐতিহাসিক একটি কাজ করেছেন। ১৯৯৬ সালে তিনি নির্বাচন করিয়েছেন। সেই নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশে পুনরায় সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ সে নির্বাচন নিয়েও বহু অর্বাচীন তার (বেগম জিয়া) সমালোচনা করেছে। দেশনেত্রী খালেদার সরকারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল। আওয়ামী লীগের মতো জাতিবিনাশী একটি সংসদীয় বিরোধী দল। সরকারকে বিপদগ্রস্ত করতে অসংখ্য হরতাল, অবরোধ এবং সংসদ বর্জন করেছে। আওয়ামী সভানেত্রী  এসব নেতিবাচক কার্যক্রম জাতির জন্য প্রভূত ক্ষতির কারণ ছিল। একসময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে দলটি বেগম খালেদা জিয়া ও তার দলসহ গোটা জাতির ওপর স্টিমরোলার চালিয়েছে। শেখ হাসিনা ইতিহাসে একজন খলনায়ক হিসেবে অনন্তকাল ধিকৃত হতে থাকবেন। 
কালের ধারায় বিএনপি আবারো বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। তাদের এবারের বিজয়কে শুধু বিজয় বললেই যথেষ্ট হবে না। বলতে হবে বিপুল বিজয় তথা ভূমিধস বিজয়। তবে এই বিজয়  এক দিকে যেমন আনন্দের, তেমনি শঙ্কাও কম নয়। এ দেশে অতীতে যারাই এমন বিজয় পেয়েছে, তাদের সবাই ভালোর চেয়ে মন্দ করেছে অনেক বেশি। এখন দেখা যাক, তারেক রহমান দেশকে কোন পথে অগ্রসর হন। তবে ঈশানকোণে মেঘ জমেছে, ঝড় আসতে পারে। ইতিহাসের মহাবীর তারেকের মতোই প্রধানমন্ত্রী তারেক যদি শক্ত হাতে হাল ধরতে পারেন তবে আবারো নতুন ইতিহাস রচিত হবে। তবে তাকে পা ফেলতে হবে ভেবেচিন্তে। জাতির ৩৬ কোটি হাতকে এক করতে পারাটা তার সাফল্যের চাবিকাঠি। এর চাবিটা প্রধানমন্ত্রীর হতেই আছে। 
জামায়াতের রাষ্ট্রভাবনা মূলত আদর্শভিত্তিক। তাদের রাজনীতির কেন্দ্রে আছে ইসলামকে শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়; বরং রাষ্ট্র ও সমাজ সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ তাদের কাছে রাজনীতি ক্ষমতার খেলা নয়; বরং দাওয়াত ও সংস্কারের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই জায়গায় তারা প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক দলগুলোর থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এখানে রয়েছে সংবিধান, নির্বাচন, প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও বহুত্ববাদী সমাজ কাঠামো। ফলে আদর্শবাদী লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতিতে এলেও ক্ষমতায় যেতে হলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, জোটনীতি, নির্বাচন-সমঝোতা এসব গ্রহণ করতে হয়। এখানেই আদর্শবাদ ও রাষ্ট্রনৈতিক রাজনীতির দূরত্ব তৈরির সম্ভাবনা থাকে। একই সাথে জামায়াতের রাষ্ট্রযন্ত্রের ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিনের সঙ্কট আছে বলে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন। অবশ্য এটি জামায়াতের জন্য শুধু নতুন অধ্যায় নয়; বরং বিরাট একটি চ্যালেঞ্জ। এখান থেকে লেখা হবে জামায়াতের সক্ষমতার নতুন এক ইতিহাস। 
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
ndigantababar@gmail.com

Advertisement