
শিশুর শারীরিক, মানসিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয় জীবন শুরুর প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই। এ সময় শিশুর প্রয়োজন সুষম খাবার; যে খাবারে শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় শর্করা, আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ আছে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার শিশুকে স্থূল করে তোলে। অতিরিক্ত ওজন শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করে। অতিরিক্ত চিনি স্থূলতার সাথে সাথে পরবর্তীতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে। ইদানীং অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদেরও হৃদরোগ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা আছে।
চিনিযুক্ত খাবার বেশি খাওয়ায় দাঁতের ক্ষয় শিশুদের সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে স্ক্রিননির্ভর সংস্কৃতির প্রভাবে নগর ও গ্রামীণ পর্যায়ে শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে প্যাকেটজাত চিনিযুক্ত খাবার প্রাধান্য পাচ্ছে, যা শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি। এসব খাবার; সূচনাতেই স্বাদের বিকৃতি ঘটায়। শিশুর স্বাদগ্রন্থি বিকাশের শুরুতেই অতিরিক্ত মিষ্টি ও কৃত্রিম খাবারের সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক খাবারের সাথে অভ্যস্ত হতে পারে না। ফলে শাকসবজি, দেশীয় ফল, ডাল বা মাছের মতো পুষ্টিকর খাবার এবং নতুন কোনও খাবারের প্রতি অনীহা (পিকি ইটিং) অভ্যাসে পরিণত পড়ে।
একই সাথে শিশুরা প্যাকেটজাত বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর অতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বর্তমানে শিশুদের পিৎজা, স্যান্ডউইচ বা বার্গারের প্রতি অতি আকর্ষণ এভাবেই তৈরি হয়েছে। বর্তমানে অভিভাবকদের বড় একটি অংশও সন্তানদের খুশি করতে এসব খাবারে অভ্যস্ত করছেন। শিশুদের সকালের নাশতায়ও এখন এসব খাবার দেন অভিভাবকরা। চাকরিজীবী মায়েরা শিশুর সকালে নাশতা হিসেবে কিনে রাখা স্যান্ডউইচ বা চিকেন ফ্রাই ওভেনে গরম করে দেন।
অন্য দিকে শিশুদের জন্মদিনসহ বিভিন্ন উৎসবে ফাস্টফুডের জমকালো আয়োজন করেন। এসব খাবারে উচ্চমাত্রায় চিনি, অতিরিক্ত লবণ, ক্ষতিকর চর্বি ও প্রিজারভেটিভ থাকে। এগুলো দ্রুত ক্যালরি তৈরি করে; কিন্তু প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ সরবরাহ করে না। আপাতদৃষ্টিতে শিশু পর্যাপ্ত খাবার খেয়েছে মনে হলেও তাদের রক্তে লৌহ, ভিটামিন সি, জিংক, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং ভিটামিন এ-এর মতো অতিপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর ঘাটতি থেকে যায়; যা পরে রক্তস্বল্পতা, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মোবাইল ফোনে কার্টুন বা ভিডিও দেখিয়ে শিশুকে অন্যমনস্ক করে জোর করে খাওয়ানো বর্তমানে বেশির ভাগ পরিবারে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে শিশুর ক্ষুধা ও তৃপ্তির সঙ্কেতের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। একই সাথে খাবারের গঠন, গন্ধ ও চিবানোর অনুভূতি না থাকায় চিবিয়ে খাওয়ার পেশির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
সমাজে প্রচলিত ধারনা হলো, ‘গোলগাল, নাদুস-নুদুস শিশুই সুস্থ শিশু’। এ ধারণা থেকে অনেক সময় অভিভাকরা শিশুকে বেশি বেশি খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। বহুজাতিক কোম্পানির ‘উচ্চতাবৃদ্ধি’ বা ‘মেধার বিকাশ’ এর প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে কৃত্রিম খাবারে অভ্যস্ত করান, যা পরে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে।
চিকিৎসকদের প্রায়ই বিব্রত অবস্থায় পড়তে হয়, বিশেষ করে যখন কিশোর-কিশোরী ও শিশুদের অভিভাবকরা অনুরোধ করেন তাদের সন্তানদের শাকসবজি, মাছ, ডিম ও দুধ খাওয়ার পরামর্শ দেয়ার জন্য। কারণ জিজ্ঞেস করলে অভিভাবকদের নিরুত্তাপ জবাব, আমরা বললে শিশুরা এগুলো খেতে চায় না। ডাক্তার বললে যদি খায়! চমৎকার যুক্তি!
শিশুকে ছোটবেলা থেকে ফাস্টফুড খাইয়ে বড় করেছেন, এখন ডাক্তার সাহেবের ওপর ভরসা। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের শহর অঞ্চলের ২০টি বিদ্যালয়ের ৯৭৫ জন শিক্ষার্থীর খাদ্যাভ্যাসের ওপর জরিপ চালানো হয়। দেখা গেছে, টিফিনের সময় তারা যে খাবার কিনে খায় তার পুষ্টিমান নিম্নস্তরের। শিশুরা এগুলো কেনে, আকর্ষণীয় মোড়ক দেখে এবং দাম তুলনামূলক কম হওয়ায়। এসব খাবার নিরাপদ কি না, তা নিয়ে তাদের ধারণা ভাবনা নেই।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যখন পুষ্টিসম্পন্ন নিরাপদ শিশু খাবারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইন তৈরি হচ্ছে তখন বাংলাদেশে পুষ্টিহীন, অনিরাপদ ফাস্টফুডের অনিয়ন্ত্রিত প্রসারের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। এভাবেই আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম রোগগ্রস্ত দুর্বল জনশক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের (Policies to protect children from the harmful impact of food marketing) নীতি অনুযায়ী, অনেক দেশ ইতোমধ্যে শিশুখাদ্য তৈরি, বিপণন ও বিজ্ঞাপন প্রচারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বাংলাদেশেও ওই নীতির আলোকে শিশুখাদ্যের ক্ষতিকর বিপণনের বিষয়ে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার চিহ্নিত করে তা প্রস্তুত ও বিপণনে সরকার নির্ধারিত পুষ্টিমানভিত্তিক মানদণ্ড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ সব প্রিন্ট মিডিয়া ও গণমাধ্যমে শিশুখাদ্য-সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন এবং প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে শুরুটা হওয়া দরকার পরিবারে। পরিবার যেকোনো সংস্কৃতির প্রসূতি। পরিবারের খাদ্যাভাস সুবিন্যস্ত এবং সুষম হলে শিশুরা বাইরের খাবার খাবে না।
আজকাল অনলাইনে বিভিন্ন ফাস্টফুড, বিশেষ করে পিৎজা, চিকেন ফ্রাই, স্যান্ডউইচ, বার্গার ঘরে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ফলে এসব খাবারের একটি সংস্কৃতি সমাজে গড়ে উঠেছে। এর রাশ টানতে হবে। এগুলোর বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে হবে। ফাস্টফুডের অপকারিতা সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার চালানো দরকার। প্রতিটি ফাস্টফুডের খাদ্যমান, উপাদান এবং মেয়াদকাল স্পষ্টভাবে লেখা থাকতে হবে। খাদ্য অধিদফতর এগুলোর প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তদারকি করবে । অনুষ্ঠানে এসব খাবার সরবরাহে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এতে এগুলোর সহজলভ্যতা কমে যাবে। সাথে সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিক্রয় ও প্রদর্শনী কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
স্বাস্থ্যকর খাবার সহজলভ্য করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ খাবার বা টিফিনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বাড়িতে মৌসুমি ফল, বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর নাশতার আয়োজন অনিরাপদ খাবার থেকে শিশুদের রক্ষা করবে। মোটকথা, শিশুদের জন্য নিরাপদ খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সরকার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন শিশু সংগঠন এবং সর্বোপরি পরিবারের সতর্ক ভূমিকা ও কার্যকর আইনের প্রয়োগ।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ
shah.b.islam@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








