ড. আবদুল লতিফ মাসুম
ড. আবদুল লতিফ মাসুম। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধানের অবস্থান ও তাৎপর্য বুঝতে হলে ব্রিটিশ সাংবিধানিক চিন্তাবিদ ওয়াল্টার বেজহটের কাছে ফিরে যেতে হয়। ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত ইংলিশ কনস্টিটিউশন গ্রন্থে তিনি সংবিধানের দু’টি দিক চিহ্নিত করেছিলেন, মর্যাদার অংশ এবং কার্যকর অংশ। প্রথমটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, আনুগত্য ও আবেগকে ধারণ করে; দ্বিতীয়টি রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব ক্ষমতা প্রয়োগ করে। ব্রিটিশ রাজা বা রানি মর্যাদার অংশের প্রতীক, আর রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। তবে বেজহট আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতাহীন বলে অর্থহীন মনে করেননি। তার মতে, সাংবিধানিক রাজার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার রয়েছে, পরামর্শ চাওয়ার অধিকার, উৎসাহ দেওয়ার অধিকার এবং সতর্ক করার অধিকার। এই অধিকারগুলো আইন দিয়ে নির্ধারিত না হলেও ব্যক্তির প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রভাব তাই সব সময় সাংবিধানিক ক্ষমতার পরিমাপে ধরা যায় না; অনেক সময় তা নির্ভর করে তার ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক কর্তৃত্বের ওপর।

Advertisement

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির অবস্থানও সংসদীয় ব্যবস্থার এই মৌলিক দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতো তিনি একই সাথে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান নন; তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদ তাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য দায়িত্ব পালনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বে প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে ৫৫(২) অনুচ্ছেদে। এমনকি সংসদে পাস হওয়া বিলে রাষ্ট্রপতির সম্মতির ক্ষেত্রেও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অর্থবিল ছাড়া অন্য বিল একবার পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানোর সুযোগ থাকলেও সংসদ পুনরায় পাস করলে রাষ্ট্রপতিকে সম্মতি দিতে হয়। ফলে রাষ্ট্রপতির কোনো বিলে স্বাক্ষর করা নিয়ে জনপরিসরে যে প্রশ্ন বা বিস্ময় দেখা যায়, তার উত্তর খুঁজতে হলে ব্যক্তির ইচ্ছার চেয়ে সংবিধানের কাঠামো বুঝতে হবে। রাষ্ট্রপতি ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী নয়, সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্য দিয়েই কাজ করেন।

তবে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার সঙ্গে ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ইংল্যান্ডে সাংবিধানিক রীতিনীতি শতাব্দীর রাজনৈতিক অনুশীলনে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। বাংলাদেশের সংসদীয় অনুশীলনের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনে বারবার বিঘ্নিত। ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন এবং ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন— এই পরিবর্তনগুলো আমাদের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে প্রভাবিত করেছে। কেবল সংবিধানের অনুচ্ছেদ সংযোজন করলেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না; প্রয়োজন দীর্ঘদিনের অনুশীলন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অলিখিত সাংবিধানিক রীতির বিকাশ। যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির অধীন হয়ে পড়ে, সেখানে সংবিধানের উৎকৃষ্ট বিধানও প্রত্যাশিত কার্যকারিতা অর্জন করতে পারে না।

‘‘প্লেটো তার দ্য রিপাবলিক গ্রন্থে শাসনের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও চরিত্রের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। আধুনিক গণতন্ত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকলেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে চরিত্রের গুরুত্ব কমে যায়নি। রাষ্ট্রপতির হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতার বিশাল ভাণ্ডার নেই; আছে সংবিধান, মর্যাদা এবং জন-আস্থার শক্তি। এই শক্তিকে কার্যকর করতে হলে তাকে দলীয় পরিচয়ের সঙ্কীর্ণতা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের প্রতিনিধি হতে হবে। বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল রাষ্ট্রপতি ভবনের দায়িত্ব পালন নয়; বরং রাষ্ট্রপতি পদের নৈতিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তিনি যদি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন, তবে সীমিত সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়েও রাষ্ট্রের শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠতে পারবেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের এ এক গভীর সত্য—ক্ষমতা যেখানে সীমিত, সেখানেও প্রজ্ঞা, নিরপেক্ষতা ও চরিত্রের মাধ্যমে প্রভাব অসীম হয়ে উঠতে পারে’’

ভারতের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। সেখানে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে মন্ত্রিসভার পরামর্শের অধীন হলেও ব্যক্তির মর্যাদা ও বিচারবোধ অনেক সময় পদটির নৈতিক তাৎপর্য বাড়িয়েছে। প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ হিন্দু কোড বিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহরুর সঙ্গে মতপার্থক্য প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে কে. আর. নারায়ণন মন্ত্রিসভার সুপারিশে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠিয়েছিলেন। তাদের ভূমিকা দেখায়, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা মেনেও রাষ্ট্রপ্রধান রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ, সাংবিধানিক শুদ্ধতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন। এখানে ব্যক্তিগত ক্ষমতা নয়, বরং সাংবিধানিক বিবেকের প্রশ্নটি মুখ্য। পদ যত আনুষ্ঠানিকই হোক, তার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রয়োজন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি ক্ষমতার সীমা জানেন, কিন্তু ন্যায়ের প্রশ্নে নীরব থাকাকে কর্তব্য মনে করেন না।

রাষ্ট্রপতির অবস্থান নিয়ে আলোচনাটি কেবল সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিনস প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থার ‘বিজয়ী সবকিছু পায়’ প্রবণতা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থায়ও ভিন্নভাবে এই প্রবণতার প্রকাশ ঘটেছে— প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবনের মাধ্যমে। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল অনেক সময় রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সিদ্ধান্তের ওপর একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা দেখায়। ফলে সংসদ, প্রশাসন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রপতির পদ— সবকিছুই ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক বিবেচনার ছায়ায় পড়ে। অথচ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসনে নয়; বরং সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতাকে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে রাখার ব্যবস্থায়।  যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে ক্ষমতার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ থাকা আবশ্যক।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্ন নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদের বিভিন্ন প্রস্তাবে তার প্রতিফলন দেখা যায়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য— এসব বিষয়ের অন্তর্নিহিত দর্শন একই: রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা একটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া উচিত নয়। তবে প্রস্তাবিত সংস্কার এবং বর্তমানে কার্যকর সাংবিধানিক বিধানের মধ্যে পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। সংস্কারের আলোচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন জবাবদিহি, নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার বাস্তব ভিত্তি তৈরি হবে।

২০২৬ সালের ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন; প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব:) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। ২১ আগস্ট তিনি শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে এটি প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। 

মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ছিলেন। তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সঙ্কট মোকাবিলার দক্ষতা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে পরিচিতি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে সম্পদ হতে পারে। আবার দীর্ঘ দলীয় সম্পৃক্ততা তার সামনে নিরপেক্ষতার কঠিন পরীক্ষাও তৈরি করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, দীর্ঘদিনের মহাসচিবকে রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে তাকে সম্মানিত করা হলেও দলীয় রাজনীতিতে তার প্রত্যক্ষ প্রভাবের পরিসর সঙ্কুচিত হয়েছে। এই বিশ্লেষণকে নিছক ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার অর্থই হলো দলীয় নির্বাহী ক্ষমতা থেকে সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার দিকে যাত্রা। এই রূপান্তর কতটা সফল হবে, তা নির্ধারিত হবে তার আচরণে—বিরোধী মতের প্রতি সৌজন্য, সরকারের সাথে সাংবিধানিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্পষ্টতা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠার সামর্থ্যে।

তাহলে সীমিত ক্ষমতার একটি পদে ব্যক্তির যোগ্যতা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ রাষ্ট্রপতির নৈতিক প্রভাবের উৎস মূলত তার ব্যক্তিত্ব। সংবিধান রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম বয়স ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতার কথা বলেছে। কিন্তু সাংবিধানিক যোগ্যতা এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত যোগ্যতা এক বিষয় নয়। মুসলিম রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আল-মাওয়ার্দি তার আল-আহকাম আস-সুলতানিয়্যাহ গ্রন্থে রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়পরায়ণতা, জ্ঞান, বিচারবুদ্ধি ও সাহসের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামো তার সময়ের চেয়ে ভিন্ন হলেও নৈতিক নেতৃত্বের এই মানদণ্ডের তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। ইবনে খালদুন তার মুকাদ্দিমায় দেখিয়েছেন, শাসকের অবিচার সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

রাষ্ট্র, সরকার ও দল— এই তিনটি ধারণাকে পৃথকভাবে বোঝা জরুরি। সরকার আসে ও যায়, রাজনৈতিক দলের উত্থান-পতন ঘটে, কিন্তু রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকে। রাষ্ট্রপতি সেই স্থায়ী রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিনিধি। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র ও দলের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে এসেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালনা, সাংবিধানিক পদে দলীয় বিবেচনার প্রাধান্য এবং বিরোধী মতকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে দেখার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রাষ্ট্রপতি যদি রাষ্ট্রের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতা ও বক্তব্যে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তবে তা কেবল তার ব্যক্তিগত মর্যাদা বাড়াবে না; রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতার গুরুত্ব সম্পর্কে কঠিন শিক্ষা দিয়েছে। ২০০৬ সালের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত হলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যদিও বিরোধীদের চক্রান্তে তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে জরুরি অবস্থা জারি হয়। এ ছাড়াও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের সবাই পলায়ন করলেও রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত আওয়ামী বিশ্বস্ত প্রতিনিধি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু দীর্ঘদিন যাবৎ দায়িত্ব পালন করে যান এবং অবশেষে তিনি পদত্যাগ করেন। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক সঙ্কটের মুহূর্তে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তখন জাতি তার কাছ থেকে দলীয় অবস্থান নয়, প্রজ্ঞা, সংযম ও নিরপেক্ষতা প্রত্যাশা করে। 

এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক শিক্ষা স্মরণ করা প্রয়োজন। রাজনীতি কেবল ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা নয়; বরং সমাজে ন্যায়, সম্পদ, অধিকার ও সুযোগের বণ্টন কিভাবে হবে, তারও প্রক্রিয়া। এই বণ্টনকে ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা থাকা জরুরি। রাষ্ট্রপতির পদ সেই আস্থার প্রতীকী ও নৈতিক ভিত্তি জোরদার করতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত সংযম, রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং সাংবিধানিক সীমার প্রতি শ্রদ্ধা। রাষ্ট্রপতি যদি নিজেকে সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন, তবে সঙ্ঘাত তৈরি হবে; আবার সরকারের অনুগত প্রতীকে পরিণত হলেও পদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। তার সঠিক অবস্থান হবে সংবিধানের অভিভাবকসুলভ নৈতিক উপস্থিতি— যেখানে ক্ষমতার দাবি নয়, রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থই মুখ্য।

করণীয় সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে পরামর্শ ও ঐকমত্যের একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি রীতি গড়ে তোলা দরকার। এতে রাষ্ট্রপতি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত ব্যক্তি না হয়ে বৃহত্তর জাতীয় গ্রহণযোগ্যতার অধিকারী হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে নিয়মিত সাংবিধানিক পরামর্শের চর্চা প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রক্রিয়া গড়ে তোলা জরুরি। চতুর্থত, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ও আচরণে সংযম, নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক শালীনতা বজায় থাকা দরকার। 
প্লেটো তার দ্য রিপাবলিক গ্রন্থে শাসনের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও চরিত্রের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। আধুনিক গণতন্ত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকলেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে চরিত্রের গুরুত্ব কমে যায়নি। রাষ্ট্রপতির হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতার বিশাল ভাণ্ডার নেই; আছে সংবিধান, মর্যাদা এবং জন-আস্থার শক্তি। এই শক্তিকে কার্যকর করতে হলে তাকে দলীয় পরিচয়ের সঙ্কীর্ণতা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের প্রতিনিধি হতে হবে। বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল রাষ্ট্রপতি ভবনের দায়িত্ব পালন নয়; বরং রাষ্ট্রপতি পদের নৈতিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তিনি যদি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন, তবে সীমিত সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়েও রাষ্ট্রের শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠতে পারবেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের এ এক গভীর সত্য—ক্ষমতা যেখানে সীমিত, সেখানেও প্রজ্ঞা, নিরপেক্ষতা ও চরিত্রের মাধ্যমে প্রভাব অসীম হয়ে উঠতে পারে। 

লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 
Mal55ju@yahoo.com