ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। নয়া দিগন্ত

আপত্তির মুখে সারাবিশ্বে হিমশিম খাচ্ছে ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলন, সরকারি কঠোর বিধিনিষেধে স্তিমিত হয়ে আসছে। এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলন বিকাশ লাভ করে। মানবাধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলায় আন্দোলনকারীরা কিছু দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। ধীরে ধীরে ট্রান্সজেন্ডার + এলজিবিটিকিউ সংস্কৃতির স্বরূপ উদ্ঘাটন হতে থাকে। পুংমৈথুন, লেসবিয়ানিজম এবং যৌন নৈরাজ্য পারিবারিক ও সাংসারিক জীবন হুমকির মুখে ফেলে দেয়। এটি যে প্রকৃতিবিরুদ্ধ, ধর্মপরিপন্থী— তা উপলব্ধি করতে মানুষের বেশি সময় লাগেনি। পৃথিবীর কোনো ধর্ম এই সংস্কৃতিকে অনুমোদন করে না। এটি মূলত দাজ্জালি কর্মকাণ্ড। নারী-পুরুষ আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি। এ সংস্কৃতি সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক মানবাধিকারের ভিত্তিতে ট্রান্সজেন্ডার সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে। ১৯৬৯ সালে তারা নিউ ইয়র্ক শহরকে আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেয়। ১৯৬০ সালের আগে ট্রান্সজেন্ডার শব্দটির সাথেও মানুষ পরিচিত ছিল না। মার্কিন চিকিৎসাবিজ্ঞানী হ্যারি বেঞ্জামিন ও জন ওলিয়েন প্রথম সমাজবিজ্ঞান ও চিকিৎসায় শব্দটিকে ব্যবহার করতে শুরু করেন। ট্রান্সজেন্ডার সংস্কৃতির কোনো একক নির্দিষ্ট একটি দেশ বা একক নির্দিষ্ট তারিখের উৎপত্তি নেই। আধুনিক চিকিৎসার পরিভাষায় ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি বিংশ শতাব্দীতে তৈরি হলেও, জন্মগত লিঙ্গ পরিচয়ের বাইরে ভিন্ন লিঙ্গীয় পরিচয় বা ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ (হিজড়া) হিসেবে বেঁচে থাকার সংস্কৃতি প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও সভ্যতায় স্বাধীনভাবে উদ্ভূত হয়েছে।
যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রান্সজেন্ডার সংস্কৃতির জন্ম, ইদানীং সে দেশের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, If you are born with male DNA you will never be a woman.
‘আপনি যদি পুরুষ ডিএনএ নিয়ে জন্ম নেন, আপনি কখনো মেয়ে হতে পারেন না।’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলনকে সমর্থন না করার পেছনে প্রধানত তার রক্ষণশীল রাজনৈতিক আদর্শ, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ, জৈবিক লিঙ্গ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিশুদের অধিকার ও অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়ে অবস্থান কাজ করছে। ট্রাম্পের অবস্থান হলো- মানুষের লিঙ্গ মূলত জন্মগত জৈবিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তিনি একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। তার প্রশাসনের সরকারি নথি ও নীতিমালায় নারী ও পুরুষ- এই দুই জৈবিক শ্রেণীকে স্বীকৃতি দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে লিঙ্গ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে হরমোন চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের বিরোধিতা করেছে। প্রশাসনের যুক্তি, শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক পরিণতি বিবেচনা না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। শিশুদের লিঙ্গ পরিবর্তন-সংক্রান্ত চিকিৎসায় কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জন্মগতভাবে পুরুষ হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিরা নারীদের প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে কিছু খেলায় নারীরা শারীরিক প্রতিযোগিতায় অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারেন। এ কারণে ট্রাম্প নারীদের খেলাধুলায় জৈবিক লিঙ্গভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক বাহিনীতে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি, শৃঙ্খলা ও সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ট্রাম্পের এ অবস্থানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল খ্রিষ্টান ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমর্থকদের রাজনৈতিক অবস্থানের মিল রয়েছে। তবে তার নীতির সব কারণকে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিশেষ করে ট্রান্সজেন্ডার যুবকদের স্বাস্থ্যসেবা এবং স্কুলে লিঙ্গ ও যৌনতা সম্পর্কিত পাঠ্যক্রম বা বইয়ের ওপর বিধিনিষেধ জারি করার হার বৃদ্ধি পেয়েছে।  
রাশিয়ায় এলজিবিটিকিউ আন্দোলন আইনি নিষেধাজ্ঞা ও চরম দমন-পীড়নের শিকার হয়ে প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালে রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট তথাকথিত ‘আন্তর্জাতিক এলজিবিটি আন্দোলন’কে একটি ‘চরমপন্থী গোষ্ঠী’ হিসেবে ঘোষণা করে তা নিষিদ্ধ করে। এর আগে ২০১২ সাল থেকে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের জন্য ‘নন-ট্রেডিশনাল সেক্সুয়াল রিলেশনশিপ’-এর প্রচার নিষিদ্ধ করে কঠোর ‘গে প্রোপাগান্ডা আইন’ কার্যকর রয়েছে। এর ফলে প্রকাশ্যে কোনো ব্যানার, সামাজিক মাধ্যম পোস্ট, শিক্ষাকার্যক্রম বা সমাবেশ আয়োজন করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। উগান্ডা, ঘানাসহ আফ্রিকার একাধিক দেশে ধর্মনীতি ও সামাজিক রক্ষণশীলতাকে কেন্দ্র করে চরম এলজিবিটিকিউ-বিরোধী আইন পাস করা হয়েছে। ২০২৩ সালে উগান্ডায় প্রণীত হয় বিশ্বের অন্যতম কঠোর সমকামিতা-বিরোধী আইন (Anti-Homosexuality Act)। এতে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে প্রাণদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এবং অধিকার রক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। ঘানাতেও সমকামী অধিকার-সংক্রান্ত কার্যকলাপ বা প্রচারণাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গৃহীত হয়।  
যুক্তরাজ্যের স্কুলে লিঙ্গ পরিবর্তন-সংক্রান্ত নীতি এবং স্পোর্টস/মেডিক্যাল ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ নিয়ে চলমান বিতর্কের কারণে ট্রান্সজেন্ডার অধিকার আন্দোলন কিছুটা জটিল ও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় পড়েছে।
উন্নত দেশগুলোতে সাধারণত এলজিবিটিকিউ আন্দোলনের আইনি স্বীকৃতি বেশি হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে বৈচিত্র্যময় বিতর্ক ও আইনি পরিবর্তন আন্দোলনের গতি ক্রমশ ধীর হয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু দেশের সরকার বা রাজনৈতিক দল জাতীয়তাবাদ, ঐতিহ্যগত ধর্মীয় মূল্যবোধ বা ‘পরিবার রক্ষা’র কথা বলে এলজিবিটিকিউ আন্দোলনকে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করে। সভা-সমাবেশ, ওয়েবসাইট বা প্রকাশনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আন্দোলনের ভৌগোলিক সুযোগ সীমিত করে দিয়েছে। কঠোর আইনি পদক্ষেপের কারণে সক্রিয়কর্মীরা গ্রেফতার, হামলা বা সামাজিক বয়কটের আশঙ্কায় প্রকাশ্য আন্দোলন থেকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন।  
পূর্ব ইউরোপের হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হলেও এই দেশগুলোতে এলজিবিটিকিউ আন্দোলনের ওপর সরকারি চাপ বজায় রয়েছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের সরকার স্কুলে এলজিবিটিকিউ সম্পর্কিত শিক্ষা বা প্রচার উপাদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে এবং গণমাধ্যমে সমকামী বা ট্রান্সজেন্ডার বিষয় তুলে ধরা সীমিত করেছে। পোল্যান্ডে বেশ কিছু স্থানীয় সরকার আগে নিজেদের এলাকাকে ‘এলজিবিটি-ফ্রি জোন’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। যদিও পরবর্তীতে কিছু এলাকা ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপে তা তুলে নেয়; কিন্তু সেখানকার আন্দোলন ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই (যেমন— সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইত্যাদি) ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর কারণে কোনো প্রকার খোলাখুলি এলজিবিটিকিউ আন্দোলন বা সমাবেশের সুযোগ নেই। এখানে সমকামিতা বেআইনি এবং এর সাজা কঠোর (যার মধ্যে দীর্ঘ কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডও রয়েছে)। ফলে সেখানে প্রথাগত আন্দোলনের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

Advertisement

চীনা সরকারের কঠোর সেন্সরশিপ
চীনে ট্রান্সজেন্ডার তথা এলজিবিটিকিউ অধিকার আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত ও সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। অতীতে চীনে প্রকাশ্যে না হলেও অনলাইনে ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে এলজিবিটিকিউ আন্দোলন গড়ে উঠছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে চীনা সরকারের কঠোর সেন্সরশিপ, সামাজিক চাপ এবং নাগরিক সমাজের ওপর ধারাবাহিক নজরদারির কারণে এই আন্দোলন প্রায় বন্ধের মুখে ঠেকেছে। চীনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক প্রাচীন এবং প্রভাবশালী এলজিবিটিকিউ সংগঠন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বা সেগুলো কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা ও মানসিক সচেতনতা নিয়ে কাজ করা বিখ্যাত ‘Beijing LGBT Center’ ২০২৩ সালে সরকারি চাপের মুখে তাদের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়। সমকামী দম্পতিদের অধিকার ও আইনি লড়াই চালানো অন্যতম প্রধান সংস্থাকে ‘LGBT Rights Advocacy China’ ২০২১ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়।  চীনের অন্যতম বড় বার্ষিক আয়োজন ‘সাংহাই প্রাইড’ (Shanghai Pride) ২০২০ সালে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়। চীনে ইন্টারনেটে বা সামাজিক মাধ্যমে এলজিবিটিকিউ-বিষয়ক আলোচনা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। চীনের শীর্ষস্থানীয় উইচ্যাট (Wechat) প্ল্যাটফর্ম থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অসংখ্য এলজিবিটিকিউ স্টুডেন্ট ক্লাবের পেজ ও অ্যাকাউন্ট রাতারাতি মুছে ফেলা বা ব্লক করা হয়েছে।  
চীনের সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে ‘QueerÕ, ÔLGBT’, বা সম্পর্কিত নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ ও শব্দগুলো সার্চ রেজাল্ট থেকে লুকিয়ে রাখা বা সেন্সর করা হয়। চীনা সরকার জাতীয় সংস্কৃতি, ‘ঐতিহ্যবাহী পরিবার প্রথা’ এবং পুরুষালী ভাবমর্যাদা (Masculinity) বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। সিনেমা, টিভি ড্রামা ও অনলাইন কনটেন্টে যেকোনো ধরনের সমকামী বা রূপান্তরকামী চরিত্র প্রকাশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ বা বাদ দেয়ার নীতি রয়েছে। পপ-কালচারে ছেলেদের ‘মেয়েলি’ রূপ বা ‘Sissy men’ (Niang pao) হিসেবে দেখানোর ওপর সরকারিভাবে অনুৎসাহ ও নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে। বর্তমানে চীনে প্রকাশ্যে বা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো এলজিবিটিকিউ অধিকার আন্দোলন চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
গোটা দুনিয়া যেখানে এলজিবিটিকিউ + ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন দেশের সরকার এ অমানবিক ও প্রকৃতিবিরুদ্ধ কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে প্রমোট করার চেষ্টা অব্যাহত আছে। ট্রান্সজেন্ডার কর্মীদের সরকারের উচ্চ লেভেলে আনাগোনা লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারি অনুষ্ঠানে তারা এতদসংক্রান্ত বই-পুস্তক বিতরণ করছে। মুক্তিকামী জনগণকে সচেতন থাকতে হবে। সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। পারস্পরিক বৈরিতা, দ্বন্দ্ব ও বিবাদ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ শক্তি নিয়ে ট্রান্সজেন্ডার ফিতনাকে প্রতিহত করতে হবে। 
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
drkhalid09@gmail.com