
আমাদের দেশে এবং সমাজে নাগরিকবোধ বা সাধারণ সামাজিক শিষ্টাচারের অভাব যে তীব্র; তা যত কম বলা যায়, ততই মনে হয় ভালো। গণপরিবহনে চলাচলকারী যেকোনো সচেতন মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারেন। আলোচনার শুরুতে নাগরিকবোধ আসলে কী তা নিয়ে একটু বলে রাখা ভালো। সহজ কথায় বললে, সমাজের একজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, অন্যের অসুবিধা না সৃষ্টি করা এবং নিয়ম মেনে চলার যে সামাজিক জ্ঞান ও বোধ, তাই ‘সিভিক সেন্স’ বা নাগরিক সচেতনতা। এটি শুধু শহুরে পরিশীলিত জীবন যাপনের সংস্কৃতি নয়, গোটা সমাজেরই সংস্কৃতি হিসেবে আমাদের কাছে উপস্থিত। তাই তো কারো মধ্যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু দেখা গেলে, কেউ একজন বলে ওঠেন, ‘ব্যাটা আস্ত একটা গাড়ল।’ কথাগুলো চারপাশে অহরহ শুনি। বরং গ্রামের মানুষের চেয়ে ইদানীং নগরজীবনে যেন একটু বেশিই দৃশ্যমান।
দেশের গণপরিবহন বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাসের যে হাল, তাতে কেউ বাধ্য না হলে উঠতে চান না। তবে ঢাকায় মেট্রোরেল চালুর পর এর যাত্রীদের মধ্যে নাগরিকবোধ বজায়ে থাকবে— এমনটি আশা করা হয়েছিল। নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস গড়ে উঠবে। কিন্তু এখানেও নাগরিকবোধের আকাল উৎকটভাবে উপস্থিত। আসলে নাগরিকরোধটাই যেন আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে গেছে। সবার মজ্জাগত অভ্যাস আইন ভঙ্গ করা। নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবার এই যে মানসিকতা, এটিও আধুনিক সমাজগঠনে অন্যতম বাধা।
মেট্রোরেলে যাত্রীদের নাগরিকবোধ নিয়ে লেখার কারণ, গত ২৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক অসুস্থবোধ করলে বসার আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কেউ সাড়া দেননি। পরে তার মৃত্যু হয়। সেদিন মেট্রোরেলে ছিল প্রচণ্ড ভিড়। দাঁড়িয়ে থাকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ৬৪ বছর বয়সী নজীবুর রহমান অসুস্থ বোধ করছিলেন। পাশে বসে থাকা যাত্রীদের উদ্দেশে কয়েকবার বসতে দেয়ার অনুরোধও জানান। কিন্তু কেউ সাড়া দেননি বলে অভিযোগ তার ছেলে নাকিবুর রহমানের। এর এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে মেট্রোরেলের মেঝেতে পড়ে যান নজীবুর রহমান। পরে তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। যাত্রীদের এই অমানবিক আচরণকে আমরা কী বলব? নিশ্চিতভাবেই এটি আমাদের সামাজিক শিষ্টাচারের অভাবের ফল। হয়তো ওই সময়েই অসংখ্য তরুণ যুবক সিটে বসে ছিল। সাধারণ ভদ্রতা বলেও একটা বিষয় একসময় সমাজে ছিল। বয়স্ক যাত্রী দেখলে তরুণরা আসন ছেড়ে দিয়ে তাকে বসতে দিতেন। আজ সেই ভদ্রতার লেশ সামান্যও দেখা যায় না।
আধুনিকতা এবং নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজনে বাংলাদেশে মেট্রোরেল চালু করা হয়েছে। ধীরগতির যান্ত্রিক ট্রাফিক জ্যাম, ধুলোবালি আর গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলার ঢাকা শহরে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ট্রেনটি রাজধানীবাসীর যাতায়াতে এনে দিয়েছে গতি। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বাহনটি আধুনিক ও বিশ্বমানের হলেও এর যাত্রীসাধারণের একটি অংশের আচরণ এবং মানসিকতা শৃঙ্খলাহীন। শুরু থেকে মেট্রোরেলের মতো একটি উন্নত গণপরিবহনেও আসন দখল নিয়ে কাড়াকাড়ি, লাইনে না দাঁড়ানো, নির্ধারিত স্থানে ময়লা না ফেলা কিংবা হুড়োহুড়ি করে ওঠার মতো আইন অমান্যের নানা চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে বারবার উঠে আসছে। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব ছোঁয়া কি তবে আমাদের মানসিকতার চশমা বদলাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে?
মেট্রোরেলে পা রাখলে যে বিষয়টি সবচেয়ে আগে চোখে পড়ে, তা হলো লাইন ধরে দাঁড়ানোর সংস্কৃতির আংশিক বিচ্যুতি। প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষার সময় হলুদ দাগের পেছনে সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে ট্রেনে ওঠার নিয়ম থাকলেও, ট্রেন আসার সাথে সাথে সেই নিয়ম ভেঙে হুড়োহুড়ি করার প্রবণতা লক্ষণীয়। ট্রেন থামার আগে ভেতরে থাকা যাত্রীদের নামার সুযোগ না দিয়ে ধাক্কাধাক্কি করে ভেতরে ঢুকে পড়ার এই তাড়া আমাদের সমাজবাস্তবতায় চরম অধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অভাব স্পষ্ট করে দেয়। অথচ শিষ্টাচার হলো— যেসব যাত্রী নামবেন, তাদের আগে পথ ছেড়ে দেয়া। সেই সাথে শৃঙ্খলা বজায় রাখা নাগরিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে আমাদের আসন পাওয়ার বা আগে ওঠার অসুস্থ প্রতিযোগিতা যেন সবকিছু ছাপিয়ে যায়। আইন অমান্যের এই প্রবণতা শুধু ওঠার ক্ষেত্রে নয়; বরং ভেতরে প্রবেশের পরও সমানভাবে দৃশ্যমান। প্রবীণ নাগরিক, নারী, শিশু এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত আসনগুলোতে দিব্যি তরুণ ও সক্ষম যাত্রীদের বসে থাকতে দেখা যায়। অনেক সময় আসন ছাড়ার অনুরোধ করলে সৃষ্টি হয় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি। চলে বাগি¦তণ্ডা। এমনকি ঘোষণা সত্ত্বেও সংরক্ষিত আসনের গুরুত্ব উপলব্ধি না করার এই উদাসীনতা আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধের বড় ধরনের দুর্বলতা নির্দেশ করে।
মেট্রোরেল পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) যাত্রীদের নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কঠোর কিছু নিয়মকানুন ও শাস্তির বিধান রেখেছে। যেমন— স্পর্শকাতর এলাকায় ধূমপান করা নিষিদ্ধ। কামরার ভেতরে পান-সুপারি বা গুলখা খেয়ে পিক ফেলা নিষেধ। এছাড়া যেকোনো ধরনের খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও, আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লুকিয়ে বা প্রকাশ্যে এসব নিয়ম ভাঙার প্রবণতা আমাদের অনেকের মধ্যে রয়ে গেছে।
নিয়ম ভাঙার এ সংস্কৃতির পেছনে মূল কারণগুলোর অন্যতম হলো— শাস্তি বা জরিমানার বিধানের কার্যকর প্রয়োগের অভাব। কিংবা সামাজিক জবাবদিহির ঘাটতি। মানুষ যখন দেখে, অন্য কেউ আইন অমান্য করেও পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তার মধ্যেও আইন না মানার এক ধরনের মানসিক স্বস্তি বা প্রবণতা তৈরি হয়। এছাড়া, মেট্রো স্টেশনের ভেতরে ও কামরায় সিসিক্যামেরা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও অনেক যাত্রীর সচেতনতার অভাব এবং নিয়মের প্রতি অবজ্ঞাবোধ কাজ করে।
নাগরিক জীবনে আইন না মানার এ প্রবণতা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা ছিল চরম বিশৃঙ্খল। যেখানে ধাক্কাধাক্কি না করলে গাড়িতে ওঠা যেত না। আসন পাওয়া যেত না। যেখানে নিয়মের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো চলাই ছিল বেঁচে থাকার কৌশল। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অভ্যস্ততা মানুষের অবচেতন মনে এমন একটি বার্তা দিয়ে দিয়েছে, নিয়মের ভেতরে থাকলে পিছিয়ে পড়তে হবে। তাছাড়া, সমষ্টিগত স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে বড় করে দেখার সঙ্কীর্ণ মানসিকতাও আমাদের সমাজে প্রবলভাবে বিদ্যমান। আমার একটু সুবিধা হলেই তো হলো, অন্যের বা রাষ্ট্রের কী ক্ষতি হলো, এ চিন্তা মেট্রোরেলের মতো একটি যৌথ এবং জাতীয় সম্পদেও প্রতিফলিত হয়। অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ মানে কারো একার নয়, সুতরাং তা নষ্ট করলে বা নিয়ম ভাঙলেও ব্যক্তিগতভাবে কারো গায়ে লাগে না। অথচ এই সম্পদ রক্ষা করা যে নাগরিক দায়িত্ব, তা অনেকে ভুলে যান।
মনে রাখা দরকার, তীব্র যানজটের শহর ঢাকায় মেট্রোরেল আমাদের যাতায়াতে সময় বাঁচায়। কিন্তু এ সুবিধা সবার জন্য স্বস্তিদায়ক করে তুলতে যাত্রীদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। লাইনে দাঁড়ানো। আগে অন্যদের নামতে দেয়া। ব্যাগ সামলে রাখা। ফোনের আওয়াজ কমানো কিংবা প্রয়োজনের সময় কাউকে আসন ছেড়ে দেয়া। এমন ছোট ছোট কাজে বদলে যেতে পারে যাতায়াতের পরিবেশ। নিয়ম মেনে চলার মানে শুধু জরিমানা এড়িয়ে চলা নয়। এর অর্থ অন্যের নিরাপত্তা, স্বস্তি ও অধিকারকে গুরুত্ব দেয়া। তাই পরেরবার মেট্রোরেলে চড়ার সময় নিজের আচরণের দিকে একটু খেয়াল রাখা দরকার। আমাদের ছোট্ট সচেতনতা হয়তো অন্য কারো যাত্রা আরো সহজ ও স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে। উল্লিখিত বিষয়গুলো মেনে চলার প্রবণতা বাড়লেই কেবল সমাজের সর্বত্র কাঙ্ক্ষিত নাগরিকবোধের সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। এটি কি খুব অসম্ভব? নিশ্চয় নয়।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
camirhamza@.yahoo.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








