মীযানুল করীম
মীযানুল করীম। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশজুড়ে বিস্তৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাহাড়, বন, নদী ও দুর্গম সীমান্তবেষ্টিত এ অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। অথচ দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার পরিস্থিতি ক্রমে আরো জটিল করে তুলছে। রাষ্ট্রের উপস্থিতি যেখানে দুর্বল, সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ে— পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা সেই পুরনো সত্যকে নতুন করে সামনে আনছে।
গত ২৪ অক্টোবর খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার লক্ষ্মীছড়ি-রাঙাপানি এলাকায় সশস্ত্র ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সদস্যদের মহড়া, সড়ক অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি শুধু পাহাড়ের মানুষের মধ্যে নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব থাকা সত্ত্বেও কিভাবে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে চলাচল বাধাগ্রস্ত করার সাহস পায়?
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার প্রশ্ন নয়; বরং পাহাড়ে অস্ত্রের বিস্তার, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের অভিযোগকে একসাথে বিবেচনায় নেয়া জরুরি। পরিস্থিতির গভীরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, সমস্যাটি শুধু নিরাপত্তা অভিযান চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সাথে যুক্ত আছে অস্ত্রের সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের জোগান, স্থানীয় জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।

Advertisement

আধুনিক অস্ত্রের বিস্তার, বাড়ছে উদ্বেগ
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে পাওয়া তথ্যে বলা হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কয়েক হাজার সদস্যের হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে একে-৪৭ রাইফেল, এসএমজি ও অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থাকার কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা, ধরন ও উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে না থাকায় এ বিষয়ে সতর্ক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
ইউপিডিএফের সাবেক চার সদস্যের বক্তব্যেও অস্ত্রের বিস্তার এবং সশস্ত্র তৎপরতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির কাছে এসএমজি ও একে-৪৭-এর মতো অস্ত্র আছে। রিভলবার ও পিস্তল সাধারণ সদস্যদের কাছেও থাকতে পারে। তাদের দাবি, পাহাড়ে অবরোধ, অগ্নিসংযোগ এবং আধিপত্য বিস্তারের নানা ঘটনা অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়। ইউপিডিএফ ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদা আদায় ঘিরে অস্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
এসব বক্তব্যের সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলেও তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে আধুনিক অস্ত্র থাকা মানে কেবল তাদের আক্রমণক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া নয়; এর অর্থ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকারিতা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়া।

অস্ত্রের বাজার : অর্থনীতি যখন সহিংসতার জ্বালানি
সংগঠনটির সাবেক সদস্যদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের বাজারে দাম ও চাহিদা বেড়েছে। তাদের দাবি, আগে একটি এসএমজির দাম ছিল আনুমানিক সাড়ে তিন লাখ টাকা; বর্তমানে তা চার থেকে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট অস্ত্রের দামও বেড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একেকটি রাইফেলের দাম সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। গোলাবারুদের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
এই মূল্য তথ্যগুলো স্বাধীন বাজার-তথ্য বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যাচাইকৃত নথির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তবু এসব দাবি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে : পাহাড়ে অস্ত্রের সরবরাহ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তার অর্থের জোগান কোথা থেকে আসছে। সেই সাথে এই বাজারের পেছনে কারা সক্রিয়?
সাবেক সদস্যদের ভাষ্য, বড় অস্ত্রের চালানের সাথে কখনো কখনো ছোট অস্ত্র বিনা মূল্যে দেয়া হয়, তবে গোলাবারুদের মূল্য আলাদাভাবে পরিশোধ করতে হয়। এমন ব্যবস্থা সত্য হলে তা অস্ত্রের বাজারে ক্রেতা ধরে রাখা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর সরবরাহকারীর প্রভাব বজায় রাখার কৌশলও হতে পারে।
অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা সাধারণ কোনো পণ্যবাণিজ্য নয়। এর সাথে যুক্ত থাকে সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, মধ্যস্থতাকারী, অর্থের জোগানদাতা এবং অস্ত্রের চূড়ান্ত ব্যবহারকারী। ফলে শুধু অস্ত্র উদ্ধার করলে পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে না। সরবরাহের উৎস, অর্থের প্রবাহ ও যোগাযোগব্যবস্থা শনাক্ত করা না গেলে একই পথে নতুন অস্ত্র আসতে পারে।

সীমান্তের দুর্গমতা ও নজরদারির ঘাটতি
পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অন্যতম জটিল দিক হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান— তিন পার্বত্য জেলার সাথে ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত আছে। পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি, ঘন বন, নদী-ছড়া এবং দুর্গম জনপদের কারণে সীমান্তের প্রতিটি অংশে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন।
প্রকাশিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যে ভারত ও মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন পথে অস্ত্র প্রবেশের অভিযোগ আছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যসংলগ্ন এলাকা এবং ভারতের মিজোরাম সীমান্তের কিছু পথকে সম্ভাব্য চলাচলের রুট হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে নির্দিষ্ট চালান, সরবরাহকারী ও রুট সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া কোনো দেশ বা গোষ্ঠীকে দায়ী করা ঠিক হবে না। প্রয়োজন হলো, অভিযোগগুলো তদন্তের বিষয় হিসেবে নিয়ে অস্ত্রের উৎস ও গতিপথ শনাক্ত করা।
সাবেক সদস্যদের দাবি, আগে মিয়ানমার সীমান্তকেন্দ্রিক কিছু নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অস্ত্র আসত; এখন ভারত ও মিয়ানমার— উভয় দিক থেকে অস্ত্র প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। তাদের বর্ণনায়, সবজি কিংবা অন্যান্য পণ্যের আড়ালে অস্ত্র পরিবহনের মতো কৌশলও ব্যবহৃত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রবেশের পর অস্ত্রের চালান পাহারা দিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নেয়া হয়। একই সাথে লেনদেন সম্পন্ন করা হয়। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা তৎপরতারও গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন— সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া না থাকা মানে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই— এমন নয়। আবার দুর্গম ভূ-প্রকৃতিকে অজুহাত দেখিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ ঠেকানোর দায়িত্ব এড়ানোরও সুযোগ নেই। কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়, ঝুঁকিপূর্ণ পথ চিহ্নিতকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন।

এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ও সংগঠিত নেটওয়ার্ক
সাবেক সদস্যদের দেয়া তথ্যে আরো বলা হয়েছে, অস্ত্রের অর্ডার ও নির্দেশনা আদান-প্রদানে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করা হয়। তাদের দাবি, বড় চালানে একক ব্যক্তির সাথে সরাসরি যোগাযোগের পরিবর্তে একাধিক ধাপে দায়িত্ব বণ্টন করা থাকে। স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে অর্থের জোগানও আসে।
এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। তবে অপরাধী নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে যোগাযোগের গোপনীয়তা, দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া এবং অর্থের উৎস আড়াল করা— এসব তদন্তকে জটিল করে তোলে। তাই কেবল মাঠপর্যায়ে অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। আইনসম্মত ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান এবং অস্ত্র সরবরাহকারীদের শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
অন্য দিকে পাহাড়ে চাঁদাবাজির অভিযোগও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ঠিকাদার ও সাধারণ মানুষের ওপর নিয়মিত অর্থ প্রদানের চাপ থাকলে তা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সমস্যা থাকে না; এর প্রভাব পড়ে ব্যবসাবাণিজ্য, কর্মসংস্থান, পর্যটন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। চাঁদাবাজির অর্থ সশস্ত্র তৎপরতায় ব্যবহৃত হলে সহিংসতার একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়। সেই চক্র ভাঙতে হলে অস্ত্রের পাশাপাশি অর্থের উৎসও বন্ধ করতে হবে।
আঞ্চলিক বাস্তবতা ও জাতীয় নিরাপত্তা
পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী অবস্থানকে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখলে পুরো সমস্যাটি বোঝা যাবে না। মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাত, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের বাস্তবতা— সবকিছুই এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের সাথে বাংলাদেশের পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক, অস্ত্রের উৎস কিংবা যোগাযোগের ধরন নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে হবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ। অনুমানকে তথ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে প্রকৃত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার বদলে তদন্ত ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একইভাবে, সীমান্তের ওপারে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্তিত্বকে বাংলাদেশের ভেতরে নির্দিষ্ট অপরাধের স্বয়ংক্রিয় প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা নীতিতে তাই দু’টি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রবেশ বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে গোয়েন্দা তথ্যবিনিময় ও কার্যকর সীমান্ত সহযোগিতা জোরদার করা। অস্ত্রের উৎস শনাক্ত হলে কূটনৈতিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ফিরবে কিভাবে
পার্বত্য চট্টগ্রামে বছরের পর বছর অস্থিরতা চলতে পারে না। দেশের কোনো অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে, সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে কিংবা অর্থ আদায়ের মাধ্যমে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য স্পষ্ট সতর্কসঙ্কেত।
কিন্তু এর সমাধান শুধু কঠোর অভিযান নয়। প্রয়োজন সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশল। প্রথমত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অস্ত্রের উৎস শনাক্ত এবং সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। দ্বিতীয়ত, সীমান্তের ঝুঁঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, চাঁদাবাজির অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, স্থানীয় জনগণ যেন ভয় ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একই সাথে পাহাড়ের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, ন্যায়বিচার, ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ, উন্নয়নবৈষম্য এবং নিরাপত্তাবোধের প্রশ্নগুলোও গুরুত্বের সাথে মোকাবেলা করতে হবে। সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে কোনো সশস্ত্র সংগঠনের সাথে এক করে দেখা যেমন অন্যায়, তেমনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর অপরাধকে রাজনৈতিক বা জাতিগত পরিচয়ের আড়ালে ছাড় দেয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধের বিচার হতে হবে ব্যক্তির কর্মকাণ্ড ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু অস্ত্রধারীদের দমন করা নয়; মানুষের আস্থা অর্জন, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করে মানুষ নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারে।
পাহাড়ের সঙ্কট তাই কেবল অস্ত্রের সঙ্কট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক সমাধান ও জনআস্থার সম্মিলিত পরীক্ষা। অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ বন্ধ না হলে, চাঁদাবাজির অর্থনীতি ভাঙা না গেলে এবং সশস্ত্র আধিপত্যের পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।
বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারে না। আবার সেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথও হতে হবে আইনসম্মত, ন্যায়ভিত্তিক ও জনবান্ধব। পাহাড়কে শান্ত রাখতে হলে অস্ত্রের মজুদ যেমন ভাঙতে হবে, তেমনি ভাঙতে হবে ভয়, অবিশ্বাস ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার মূল্য শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামকে নয়, পুরো বাংলাদেশকে দিতে হতে পারে।  
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক