
চলচ্চিত্র বা সিনেমা একটি শিল্পমাধ্যম। সাধারণত মানবিক চেতনার স্ফুরণ ও সুকুমারবৃত্তির লালন পরিপোষণ এই শিল্পমাধ্যমের কাজ। তবে এটি জনসচেতনতা সৃষ্টি ও জনমত গঠনে কার্যকর হাতিয়ারও।
সংবাদপত্র বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের খবর, প্রবন্ধ নিবন্ধ বা মোটিভেশন লেখা ইত্যাদি প্রকাশ করে কোনো বিষয়ে জনমত গঠন যত কঠিন, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সেটি ততই সহজ। কোনো বিষয় চলমান দৃশ্যের মাধ্যমে নিপুণভাবে তুলে ধরা হলে তা খুব সহজে মানুষের আবেগ-অনুভূতির গভীরে নাড়া দেয়, হৃদয় স্পর্শ করে এবং তার চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে পারে। উদাহরণ অজস্র।
হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের কথা মনে পড়ে। লেখক যেন নাটকের প্রধান চরিত্র বদিকে ফাঁসিকাষ্ঠে না ঝোলান এমন দাবিতে ঢাকার রাজপথে মিছিল বেরিয়েছিল। অথচ বদি একজন সন্ত্রাসী মাস্তান তথা সমাজবিরোধী। তার জন্য মানুষের মনে সহানুভূতি তৈরি হলো কেন? কারণ, হুমায়ূন আহমেদ বদির চরিত্রের মানবিক দিকটি পরম মমতায় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন, যা মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে, আপ্লুত করে।
যদি কোনো আদর্শিক অবস্থান থেকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একই রকম মানবিক আবেদনসমৃদ্ধ বার্তা পৌঁছে দেয়া যায় তাহলে সেই আদর্শের পক্ষে জনমত গড়ে তোলাও সম্ভব। এ জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অসংখ্য চলচ্চিত্র তৈরি হয় যেগুলো বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরোধী চেতনার বিকাশে ভূমিকা রাখে।
শুধু যুদ্ধ নয়, নানা ধরনের সামাজিক রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক সমস্যা সঙ্কটের মোকাবেলায়ও চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণবাদ, দারিদ্র্য, উদ্বাস্তু সঙ্কট বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব সহজে সচেতনতা গড়ে তোলা যায়। ইউনেস্কোর এ ধরনের কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে চলমান।
এছাড়াও রাজনৈতিক দল বা সরকার অনেক সময় নিজস্ব আদর্শ প্রচারে বা নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনে চলচ্চিত্র বা সিনেমাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সব সময় তা ইতিবাচকভাবে হবে এমন নয়। ছুরি দিয়ে অপারেশন করে যেমন রোগী বাঁচানো যায়, তেমনি খুনও করা যায়। ভারতে যেমনটি ঘটছে গত প্রায় দুই দশক ধরে। দেশটির ক্ষমতাসীন দল সিনেমাকে মুসলিমবিরোধী প্রচারণার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
সুপরিকল্পিতভাবে বানানো হয়েছে ‘দ্য কাশ্মির ফাইলস’, ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ অথবা ‘আর্টিকেল ৩৭০’ বা ‘দ্য সবরমতি রিপোর্ট ও ধুরন্ধর’-এর মতো বেশ কিছু সিনেমা যার বিষয়বস্তু পুরোপুরি ভিত্তিহীন এবং বিদ্বেষপ্রসূত। দ্য কেরালা স্টোরির কাহিনী এতটাই বানোয়াট যে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ছবিতে একটি ডিসক্লেইমার যোগ করতে নির্মাতাদের বাধ্য করেন। তাতে বলা হয়— এই সিনেমার কাহিনীর সাথে বাস্তবের কোনো যোগসূত্র নেই, এটি কল্পনাপ্রসূত গল্পমাত্র।
এসব সিনেমায় রাষ্ট্রীয় তহবিলের জোগান দেয়া হয়নি বটে, তবে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে নানাভাবে। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ও তার মাতৃসংগঠন আরএসএস এসব সিনেমার পক্ষে সার্টিফিকেট দিয়েছে, বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্য সরকার করমুক্ত প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছে, সিনেমা দেখার জন্য কর্মচারীদের এক দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী ও নেতারা প্রকাশ্যে প্রশংসা এবং বিনামূল্যে টিকিট বিতরণের ব্যবস্থা করেছেন।
সমালোচক, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং মানবাধিকারকর্মীরা এসব সিনেমাকে আখ্যা দেন মুসলিমবিদ্বেষী ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বলে। আল জাজিরা ও ব্রিটিশ গার্ডিয়ানের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই ধারার চলচ্চিত্রগুলোকে বলিউডের ‘হাইভোল্টেজ পলিটিক্যাল প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু এটি সত্য যে, ভারতজুড়ে মুসলিমবিরোধী উগ্র কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ার পেছনে এসব সিনেমার ভূমিকা যথেষ্ট।
ভারতের নেতিবাচক সিনেমা বা রাজনীতি আমাদের আজকের বিষয় নয়। এতক্ষণ যা বলা হলো তা নিছক অবতরণিকা। আজ আমরা একটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলব, যেটি হিংসা ছড়ায় না, হিংসার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, প্রতিবাদ করে।
এই মুহূর্তে বিশ্বে সবচেয়ে নৃশংস বর্বর হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড চলছে ফিলিস্তিনের গাজায়। ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল গোটা মানবজাতির চোখের সামনে নির্বিচারে নির্মূল করছে ফিলিস্তিনিদের। গণহত্যা চালাতে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক সেনাবাহিনী, সমরাস্ত্র, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত খুনে রোবট সিস্টেম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে, নিশানা করে এবং হত্যা করে। এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের প্রামাণ্য দালিলিক উপস্থাপন আলোচ্য ছবি। মূল প্রসঙ্গে ঢোকার আগে আসুন ছবিটি প্রদর্শনের পর দর্শকদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া হয় সে বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে জনৈক নেটিজেনের বক্তব্য জেনে নিই।
জনৈক মহবুল হক (Mohbul Haque) ‘রক্তাক্ত স্ক্রিন, এআই কিলিং মেশিন এবং ২৫ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস নীরবতা : ভেনিসে বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিলো NAZA’ শিরোনামে ফেসবুকে লিখেছেন—
‘সিনেমা কি কেবলই কল্পনার ক্যানভাস, নাকি ক্ষমতার অন্ধকারের দিকে তাক করা এক নির্মম আয়না? ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৬-এর আলো ঝলমলে প্রেক্ষাগৃহে যখন ৮০ মিনিটের অন্ধকার নেমে এসেছিল, তখন কেউ ভাবেনি পর্দার আলো নিভে যাওয়ার পর যা ঘটবে, তা বিশ্ব চলচ্চিত্রের শতবর্ষের ইতিহাস নতুন করে লিখতে বাধ্য করবে।
ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের শেষ দৃশ্যটি মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় গোটা প্রেক্ষাগৃহ। কয়েক সেকেন্ডের এক বাকরুদ্ধ স্তব্ধতা, আর তার পরেই শুরু হয় অশ্রুভেজা করতালির গর্জন। পুরো হলরুম উঠে দাঁড়ায়। এক মিনিট, দুই মিনিট করে পুরো ২৫ মিনিট ধরে দর্শকরা একটানা দাঁড়িয়ে অভিবাদন (Standing Ovation) জানান নির্মাতাদের। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো সৃষ্টির ভাগ্যে এত দীর্ঘস্থায়ী করতালি জোটেনি। কান্নায় ভেঙে পড়া বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক— সবার চোখেমুখে ছিল একটাই অভিব্যক্তি : তীব্র অপরাধবোধ আর সত্যের মুখোমুখি হওয়ার এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণা। অনেকে তো চোখ মুছতে মুছতে উড়িয়ে দিয়েছেন ফিলিস্তিনের লাল-কালো-সাদা-সবুজ পতাকা।
এই ঐতিহাসিক ঝড় তোলা তথ্যচিত্রটির নাম ‘NAZA’। আর এই নজিরবিহীন সৃষ্টির কারিগর অন্য কেউ নন, দু’জন বিবেকবান ইসরাইলি চলচ্চিত্র নির্মাতা, ইউভাল আব্রাহাম (Yuval Abraham) এবং র্যাচেল জার (Rachel Szor)। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রযোজনায় নির্মিত এই তথ্যচিত্রটি কোনো রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা নয়; এটি নিজ রাষ্ট্রের ভেতর থেকে তোলা এক ভয়ঙ্কর ও প্রামাণ্য দলিল।
নাজা : যখন জীবনের মূল্য নিছক একটি সমীকরণ
হিব্রু সামরিক ও গোয়েন্দা পরিভাষায় একটি মারাত্মক কোডওয়ার্ড হলো ‘নাজা’। এর মূল অর্থ— অত্যন্ত শীতল ও অমানবিক। কোনো বিমান হামলা বা সামরিক অভিযান পরিচালনার আগে সম্ভাব্য কতজন সাধারণ নাগরিক— নারী, শিশু ও বৃদ্ধ নিহত হতে পারে (Pre-calculated Civilian Deaths বা Collateral Damage), সামরিক নথিপত্রে সেই পূর্বনির্ধারিত সংখ্যাটি গণনা করতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, একজন জীবন্ত মানুষ, তার স্বপ্ন, তার পরিবার— সবকিছু সেখানে স্র্রেফ একটি পরিসংখ্যান, একটি ডাটা পয়েন্ট। ফিলিস্তিনিদের জীবনের এই হিসাব কষে হত্যার উৎসবকে রূপক ও বাস্তব দুই অর্থেই ফুটিয়ে তুলতে এই চলচ্চিত্রের নামকরণ করা হয়েছে ‘নাজা’ ।
তেল আবিবের ছাদ থেকে তিন বছরের গোপন অনুসন্ধান
‘নাজা’ সাধারণ স্টুডিওর চার দেয়ালে তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হয়েছে চরম ঝুঁকি আর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ তিন বছর ধরে তেল আবিবের বিভিন্ন গোপন ডেরায়, রাতের অন্ধকারে ক্যামেরাবন্দী করা হয়েছে ফুটেজ। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো— এই চলচ্চিত্রে কোনো অনুমানের জায়গা রাখা হয়নি। এখানে কথা বলেছেন খোদ ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ২৪ থেকে ২৫ জন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও উচ্চপদস্থ সামরিক হুইসেলব্লোয়ার, যারা নিজেরা এই অভিযানের প্রত্যক্ষ অংশীদার।
তাদের স্বীকারোক্তি শুনে শিউরে উঠেছে আন্তর্জাতিক সমাজ। ক্যামেরার সামনে সামরিক পোশাকধারী এই কর্মকর্তারা অকপটে স্বীকার করেছেন, কিভাবে পুরো গাজা উপত্যকাকে পরিণত করা হয় এক উন্মুক্ত ভিডিও গেমের ময়দানে। যেখানে বাস্তব মানুষের মৃত্যু কোনো বেদনা জাগাত না; বরং স্ক্রিনে টার্গেট লক করে বোতাম টেপাটা ছিল এক বিকৃত বিনোদন।
এক কর্মকর্তা নথির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সামরিক মহলে এই হত্যাকাণ্ডগুলো কোনো যুদ্ধের মতো নয়; বরং একটি নিখুঁত ও উপভোগ্য গেমিং ইন্টারফেসের মতো পরিচালিত হচ্ছিল।
‘ল্যাভেন্ডার’ ও এআই নজরদারি : প্রযুক্তি যখন জল্লাদ
তথ্যচিত্রটিতে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। ইসরাইল কিভাবে সাধারণ মানুষের স্মার্টফোন হ্যাক করে, ডাটা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে গাজার প্রতিটি অলিগলি নজরদারির আওতায় এনেছে, তা বিশদভাবে ডিকোড করেছেন নির্মাতারা। উঠে এসেছে কুখ্যাত এআই সিস্টেম ‘ল্যাভেন্ডার’-এর মতো স্বয়ংক্রিয় নজরদারি টুলের ভূমিকা।
এই এআই অ্যালগরিদম লাখ লাখ গাজাবাসীর ফোনের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘টার্গেট’ নির্ধারণ করত। সবচেয়ে মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক দিকটি হলো— এআই যখন শনাক্ত করত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিজের পরিবারের কাছে ফিরেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ড্রোন বা মিসাইল হামলা চালানো হতো।
উদ্দেশ্য ছিল একটাই— শুধু লক্ষ্যবস্তু নয়, তার সাথে থাকা নিষ্পাপ শিশু এবং পুরো পরিবারটিকে একসাথে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া। ভিডিও গেমের মতো স্ক্রিনে ফ্ল্যাশ করা পয়েন্টে ট্রিগার টিপে আস্ত এক একটি প্রজন্ম ধ্বংস করে দেয়া।
বিবেকের দায় ও সাহসিকতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত
ইউভাল আব্রাহাম এবং র্যাচেল জর— যারা এর আগেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের মেধার ছাপ রেখেছিলেন, বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে, সত্যের কোনো নির্দিষ্ট জাতীয় পরিচয় হয় না। নিজেরা ইসরাইলি নাগরিক হয়েও তারা নিজ রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।
প্রিমিয়ার মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নির্মাতারা বলেন, ‘আমরা এখান থেকেই এসেছি, তাই অন্ধকারের গভীরতা আমাদের চেয়ে ভালো কেউ জানে না। আমাদের দায় ছিল পৃথিবীর সামনে আয়নাটি তুলে ধরার, যাতে ইতিহাস সাক্ষী থাকে— আমরা এই বর্বরতার অংশীদার হতে চাইনি।’
ভাইরাল হওয়া ছবিতে সহপরিচালক র্যাচেল জরের অশ্রুসিক্ত ও দৃঢ় চোখ দু’টি আজ বিশ্বজুড়ে শান্তিকামী মানুষের সাহসের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ইতিহাস কি কেবলই পরিসংখ্যান মনে রাখবে
লাখো ফিলিস্তিনির প্রাণহানি, গুঁড়িয়ে যাওয়া শত শত জনপদ, আর হাজারো নাম না-জানা শিশুর কবর— এগুলো কি কেবল খবরের কাগজের শিরোনাম হয়েই থাকবে? ‘নাজা’ সেই সহজ ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতিকে সজোরে চপেটাঘাত করেছে।
সিনেমা শুধু বক্স অফিসের কাঞ্চনমূল্য কিংবা ড্রয়িংরুমের অলস বিনোদন নয়; সিনেমা যে একটি রক্তক্ষয়ী বাস্তবতার জীবন্ত দলিল এবং জালিমের চোখে চোখ রেখে সত্য উচ্চারণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার— ভেনিসের লাল গালিচায় দাঁড়িয়ে ‘নাজা’ তা প্রমাণ করে দিলো।
আজ বিশ্ববিবেককে প্রশ্ন করার সময় এসেছে— সভ্যতার এই কথিত স্বর্ণযুগে প্রযুক্তির অগ্রগতি কি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে, নাকি তা ব্যবহৃত হবে নিরপরাধ শিশুদের নির্বিচারে শিকার করার জন্য?
ভেনিসের হলরুমের সেই ২৫ মিনিটের দীর্ঘ করতালি ছিল যুদ্ধোন্মাদনার বিরুদ্ধে মানবিকতার এক কাতর ও ঐক্যবদ্ধ আর্তনাদ।
হ্যাঁ, সত্য কখন কার হাত ধরে উন্মোচন হবে কেউ জানে না। নেতানিয়াহুর ঘৃণ্য অপরাধের জলজ্যান্ত প্রমাণ এভাবেই অমোচনীয় সেলুলয়েডে ধরা থাকল দুই ইসরাইলি তরুণ-তরুণীর হাতে।
ভেনিসে ছবিটি বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছে। কিন্তু ছবির সাথে জড়িতদের জীবন এখন কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি। নিজ দেশে তারা এখন ঘৃণিত চরিত্র। উগ্র ইহুদিবাদীরা এরই মধ্যে তাদের হত্যার হুমকি দিয়েছে।
ইসরাইলি মিডিয়া হারেৎস জানায়, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে ইয়ুভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জরের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হবে। তাদের বিচারের কাঠগড়ায় তোলার দাবি জানাচ্ছেন সরকারের মন্ত্রী, থেকে শুরু করে অনেকে। হামলার ঘটনাও শুরু হয়ে গেছে। গত বুধবার র্যাচেল জরের বাবা-মায়ের বাড়ি ঘেরাও করে তাদের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে স্লোগানের পাশাপাশি ইটপাটকেল ছুড়েছে স্থানীয় উগ্রবাদীরা।
সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ ইয়াল জমির (Eyal Zamir) নাজার দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই অসমসাহসী দুই মানবতাবাদী ইসরাইলির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
ছবিটি প্রযোজনায় দ্য গার্ডিয়ানের পাশাপাশি আরো ছিল ব্রিটিশ চলচ্চিত্র প্রযোজক জেমস উইলসনের প্রযোজনা সংস্থা জেডব্লিউ ফিল্মসসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান। আর অস্কারজয়ী বিখ্যাত নির্মাতা জোনাথন গ্লেজার এই চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান নির্বাহী প্রযোজকের দায়িত্বে ছিলেন। এতে স্পষ্ট, ইহুদিদের প্রতি পাশ্চাত্যের যে দরদ এতদিন উথলে উঠত, গত তিন বছরে নেতানিয়াহুর পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে তা শুকিয়ে এসেছে।
আশা করতে চাই, তথাকথিত হলোকাস্টের বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে পাশ্চাত্য বিশ্ব অচিরেই সত্যের আলোকিত বারান্দায় দাঁড়াবে এবং উপলব্ধি করবে ফিলিস্তিনি বা মুসলিমরা নয়; বরং উগ্রবাদী ইহুদিরাই বিশ্বশান্তির সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
লেখক : সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, নয়া দিগন্ত
mujta42@gmail








