মতামত
মতামত ছবি: নয়া দিগন্ত

বিদ্যুৎ হচ্ছে সভ্যতার প্রাণ, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, অর্থনীতি ও অগ্রগতির চালিকাশক্তি। আজকের দিনে বিদ্যুৎ ছাড়া সভ্যতা অচল এবং জীবন অসহনীয়। বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। পানি, কয়লা, গ্যাস, তেল ও পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করি। এ ছাড়া সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে এবং বর্জ্য পুড়িয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। দেশে একাধিক কয়লা, গ্যাস ও এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপিত হচ্ছে। কাপ্তাইয়ে রয়েছে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ঈশ্বরদীতে নির্মিত হচ্ছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা এখন উৎপাদনের অপেক্ষায় আছে। এসবের পাশাপাশি সরকার এখন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা দেশের বিদ্যুৎ সেক্টরের উন্নয়নে একটি যুগান্তকারী এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। একই সাথে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বর্জ্য সমস্যার টেকসই ও স্থায়ী সমাধান।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পদ্ধতি : বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ওয়েস্ট- টু-এনার্জি বলা হয়। বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যকে (ময়লা, কাগজ, প্লাস্টিক ইত্যাদি) পুড়িয়েই মূলতপক্ষে এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। প্রথমেই শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় এবং তা প্রকল্পের নির্দিষ্ট স্থানে জমা করা হয়। ক্রেন বা মেশিনের সাহায্যে বর্জ্যগুলোকে উচ্চ তাপমাত্রার বড় কম্বাশন চেম্বারে পোড়ানো হয়। বর্জ্য পোড়ানোর ফলে যে প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হয়, তা দিয়ে বয়লারের পাইপের পানি ফুটিয়ে উচ্চচাপের বাষ্প তৈরি করা হয়। এই বাষ্পের বেগে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা জেনারেটেরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এভাবে বর্জ্য পোড়ানো হয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এখানে কোনো ধরনের জ্বালানি যেমন এইচএফও (তেল), কয়লা ও গ্যাস লাগে না। ফলে এখানে জ্বালানি খরচ নেই। 
চীনের সাথে চুক্তি : গত ২৭ আগস্ট বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সাথে তার সচিবালয়ে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যকার বৈঠক শেষে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চীন কর্তৃক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান। আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের (বর্জ্য রাখার স্থান) বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা নর্থ সিটি করপোরেশন, পরিবেশ বিভাগ এবং চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (সিএমইসি) সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চায়না রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিএমইসি আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে, যেখানে ৪২ থেকে ৪২.৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। প্রকল্পটিতে প্রতিদিন তিন হাজার টন বর্জ্য পোড়ানো হবে। প্রকল্পটি থেকে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দামে বিদ্যুৎ কিনবে। 
প্রকল্পটির বাজেট ও অর্থায়ন : চীনের কোম্পানি সিএমইসি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পুরো অর্থই চীন বিনিয়োগ করবে। চীনের সরাসরি বিনিয়োগ হবে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ডিবিএস, এনডিবি ও ব্যাংক অব চায়না প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ করবে। এ প্রকল্পে বাংলাদেশকে কোনো টাকা বিনিয়োগ করতে হবে না; অর্থাৎ পুরো প্রকল্পটিই চীনা প্রতিষ্ঠান সিএমইসি বাস্তবায়ন করবে এবং বিনিয়োগও তারাই করবে। প্রকল্পটি তারাই পরিচালনা করবে। তারা বাংলাদেশের জমি ও বর্জ্য ব্যবহার করবে। বাংলাদেশ প্রকল্পটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে নেবে এবং প্রজেক্ট ল্যান্ড ব্যবহারের জন্য কোম্পানির পক্ষ থেকে ঢাকা নর্থ সিটি করপোরেশন বছরে দুই কোটি টাকা ভাড়া পাবে। 
বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য মোটেও বেশি নয় : বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি) প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দামে বিদ্যুৎ কিনবে। ফলে অনেকেই এই দাম অনেক বেশি বলে এর সমালোচনা করছেন। কিন্তু বাস্তবে এই বিদ্যুতের দাম অনেক কম। প্রকল্পটির বিদ্যুৎ উপাদন ক্ষমতা ৪২ মেগাওয়াট ঘণ্টা হলে এক বছরে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ হবে তিন লাখ ৬৭ হাজার ৯২০ মেগাওয়াট ঘণ্টা বা ৩৬ কোটি ৭৯ লাখ ২০ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা বা ইউনিট। এখন প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বা ইউনিটের মূল্য ২৫ টাকা হলে এক বছরে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য হবে ৯১৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বর্তমানে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনকে বছরে ৫২০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করায় কার্বন নিঃসরণ কম হবে এবং এ জন্য বাংলাদেশ প্রতি বছর ৮৮ কোটি টাকা কার্বন ক্রেডিট পাবে। অন্য দিকে ভাড়া পাবে বছরে দুই কোটি টাকা। সুতরাং বিদ্যুৎ ক্রয়ে মোট ব্যয় হচ্ছে ৩০৯.৮০ কোটি টাকা। সুতরাং প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য হবে ৮.৪২ টাকা; অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য আপাত দৃষ্টিতে ২৫ টাকা হলেও এর প্রকৃত মূল্য হচ্ছে ৮.৪২ টাকা। মোটকথা, প্রতি ইউনিটের মূল্য ১০ টাকার কম হবে। বর্তমানে দেশীয় গ্যাসের মাধ্যমে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় সাত টাকা এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ১৪ টাকা। বিপিডিবি বেসরকারি উৎপাদক থেকে প্রতি ইউনিট ১৪.৪৫ টাকা দরে কিনে থাকে। বিভিন্ন উৎস থেকে বিভিন্ন দামে কেনা বিদ্যুৎ সরকার গড়ে ইউনিট প্রতি ৮.৩৯ টাকা করে বিক্রি করে। সুতরাং বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য মোটেও বেশি নয়।  
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আর্থসামাজিক অবদান : বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল্য শুধু আর্থিক মানদণ্ডে বিচার করলে হবে না। এর আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য অবশ্যই হিসাব করতে হবে। প্রতিদিন বাসাবাড়ি, দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও অফিস-আদালত থেকে বিপুল বর্জ্য সৃষ্ট হয়। এসব বর্জ্য বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করে এক জায়গায় জমা করা হয়, যাকে আমরা ল্যান্ডফিল বলি। এসব বর্জ্য থেকে উৎকট দুর্গন্ধ বের হয়, যা পরিবেশের ক্ষতি করে। এসব বর্জ্য বাতাসের পাশাপাশি পুকুর, জলাশয়, খাল এবং নদীর পানিও দূষিত করে। সার্বিকভাবে পুরো পরিবেশকেই দূষিত করে, যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। এ অবস্থায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে বর্জ্যগুলো পুড়ে শেষ হয়ে যাবে এবং বর্জ্য স্তূপ আকারে জমা থাকবে না। এ ছাড়া রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে। ফলে কার্বন নিঃসরণ কমে যাবে। বাতাস ও পানি দূষণ থেকে রক্ষা পাবে এবং বায়ুর মান উন্নত হবে। সুতরাং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতেই হবে।  
সব শহরে এ ধরনের প্রকল্প স্থাপন করা হোক : দেশের সব সিটি করপোরেশন ও জেলা শহরে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করা হোক। এর মাধ্যমে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে বড় অবদান রাখবে। সার্বিকভাবে পরিবেশ উন্নত হবে। চীন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করেছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ঢাকা নর্থ সিটি করপোরেশনের সাথে চীনের একটি চুক্তি স¤পাদিত হয়েছে। সুতরাং ঢাকা সাউথ সিটিসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশন তাদের এলাকায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে চীনের সাথে দ্রুতই চুক্তি করতে পারে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনই মূলতপক্ষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যথাযথ সমাধান। 


লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক

omar_ctg123@yahoo.com