পার্টনার প্রকল্প
পার্টনার প্রকল্পের গতি ফেরাতে মাসিক কর্মপরিকল্পনা দাখিলের নির্দেশ নতুন পিডির। নয়া দিগন্ত

কৃষি খাতের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প পার্টনারে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে তিন বছর তিন মাসে বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ২২ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকার তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৮ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। 

Advertisement

এ অবস্থায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সিনিয়র মনিটরিং অফিসারদের মাসিক কর্মপরিকল্পনা দাখিলের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সমস্যা নিরসন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ডিডিও ক্ষমতা প্রদানের উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পার্টনার প্রকল্পের নবনিযুক্ত প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (পিসি) ড. মো: সাখাওয়াত হোসেন শরীফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায় এসব নির্দেশনা ও আশ্বাস দেয়া হয়।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সিনিয়র মনিটরিং অফিসারদের নিজ নিজ অঞ্চলের মাসিক কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে হবে। এসব পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই সাথে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ও কৌশলগত সহযোগী সংস্থাগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর।

এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন ও গতিশীল করতে সিনিয়র মনিটরিং অফিসারদের ডিডিও ক্ষমতা প্রদানের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।

প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ (পার্টনার) প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ সাতটি সরকারি সংস্থা যুক্ত রয়েছে।

দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলের ৬৪ জেলা ও ৪৯৫ উপজেলায় প্রকল্পটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কৃষিকে আরো বাণিজ্যিক, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা, কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা জোরদার করা এর প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি ফসলের বহুমুখীকরণ, কৃষকদের ডিজিটাল সেবা প্রদান, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি-খাদ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় উত্তম কৃষিচর্চা (জিএপি) সম্প্রসারণ, কৃষিপণ্যের মানোন্নয়ন, কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদন ও আয় বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে অগ্রগতি

প্রকল্পের আওতায় ২৮ হাজার ৫৯৭টি কৃষক মাঠ স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০টির কার্যক্রম চলছে। উত্তম কৃষিচর্চা বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত ২০ হাজার ব্যাচের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার ব্যাচের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত ৩০টি প্রশিক্ষণ ব্যাচের মধ্যে ২৭টি শেষ হয়েছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ১১২টি কর্মশালা আয়োজনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩১টি।

প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের ডিজিটাল কৃষিসেবায় অন্তর্ভুক্ত করা। এর মাধ্যমে সরকারি ভর্তুকি, ঋণ, প্রণোদনা ও অন্যান্য কৃষিসেবা সহজে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের উত্তম কৃষিচর্চার সনদ প্রদান, নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো, কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ এবং কৃষি তথ্যসেবা সম্প্রসারণের কার্যক্রমও রয়েছে।

তবে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রমে অগ্রগতির হার এক নয়। মাঠপর্যায়ে কিছু প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম এগোলেও সামগ্রিক বাস্তবায়নের গতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত ফলাফলভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬৫ শতাংশের বেশি অগ্রগতি হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ।

নতুন নেতৃত্বে গতি বাড়ানোর উদ্যোগ

প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গত ৬ অক্টোবর প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করে ড. মো: সাখাওয়াত হোসেন শরীফকে দায়িত্ব দেয়া হয়। এর আগে আবুল কালাম আজাদ প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্পটির প্রথম পরিচালক মিজানুর রহমানও দায়িত্বে ছিলেন; পরে তিনি অপসারিত হন। প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতি, জনবল নিয়োগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নতুন নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় মাসিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে আরো জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কোন অঞ্চলে কী কাজ হবে, কতটুকু অগ্রগতি অর্জিত হলো এবং কোথায় সমস্যা রয়েছে—এসব বিষয় পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন, নিয়মিত পরিবীক্ষণ এবং চিহ্নিত সমস্যার দ্রুত সমাধানের ওপর।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ডিডিও ক্ষমতা প্রদানের বিষয়টিতেও এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব রয়েছে। এ ক্ষমতা দেয়া হলে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের আওতায় কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন, দায়িত্বের সীমা এবং আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হতে এখনো সময় থাকলেও অবশিষ্ট সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা কার্যক্রম চিহ্নিত করা, সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং ফলাফল মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল কৃষকের কাছে পৌঁছাতে নতুন নেতৃত্বের অধীনে বাস্তবায়নের গতি কতটা বাড়ে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।