
এস এম মিন্টু
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজধানীজুড়ে ২৭৬টি চেকপোস্ট বসানো, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের মধ্যেও বিচ্ছিন্নভাবে নাশকতার ঘটনা ঘটায় প্রশ্ন উঠেছে- আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন সব ঘটনা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি- কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ দেশে ও বিদেশে অবস্থান করে অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের নির্দেশনা এবং অর্থায়নে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় নাশকতা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই সম্ভব হয়নি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে বিদেশ থেকে অর্থায়ন এবং নির্দেশনার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোল্লা মো: শাহীন গতকাল বলেন, ভারত থেকে আওয়ামী লীগের পলাতক কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনায় এবং হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থের সহায়তায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণসহ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
তিন দিনে একের পর এক ঘটনা
গত তিন দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও মশাল মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার এক দিনেই রাজধানীর সাতটি স্থানে ১৪টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই দিনে কাফরুল থানার সামনে একটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে।
শনিবার রাতে কমলাপুর রেলস্টেশন, সচিবালয়ের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের এলাকা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। মিরপুর-১, কেরানীগঞ্জ ও কাফরুলসহ কয়েকটি এলাকায় বাস ও পিকআপভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
গতকাল দুপুরে মিরপুর-১২ নম্বরে একটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। একই এলাকায় সন্ধ্যায় কলেজ রোডের সিরামিকস কারখানার গেটের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনেও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনায় কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে ঘটনাগুলোর প্রকৃত সংখ্যা, ক্ষয়ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
আগাম সতর্কতা ছিল
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রায়কে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে- এমন আশঙ্কার কথা আগেই জানানো হয়েছিল। সম্ভাব্য নাশকতা মোকাবেলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়।
বিশেষ শাখার (এসবি) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রায়কে কেন্দ্র করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে- এ বিষয়ে সরকারকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তার দাবি- গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল না।
এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে এসেছে- তথ্য থাকা সত্ত্বেও নাশকতা ঠেকানো গেল না কেন?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিষয়টি কেবল গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না; সংগৃহীত তথ্য মাঠপর্যায়ে কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা কতটুকু- সেসব বিষয়ও পর্যালোচনা প্রয়োজন।
‘পুলিশিং ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে প্রশ্ন উঠছে’
ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, আগাম সতর্কতার কথা জানার পরও একের পর এক ঘটনা ঘটায় পুলিশের গোয়েন্দা সক্ষমতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, এক দিনে প্রায় ১৪টি ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। আগাম তথ্য থাকার পরও যদি এমন ঘটনা ঠেকানো না যায়, তাহলে তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিশ্লেষণ, মাঠপর্যায়ে তা পৌঁছানো এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
পুলিশ সদস্যদের কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের প্রতি নয়, রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, পুলিশের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অন্যতম ভিত্তি। দীর্ঘমেয়াদে বাহিনীর পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও জবাবদিহি প্রয়োজন।
‘দুই-তিনটি বিস্ফোরণ গোয়েন্দা ব্যর্থতা নয়’
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাকে সরাসরি গোয়েন্দা ব্যর্থতা হিসেবে দেখার বিষয়ে ভিন্ন মত রয়েছে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে।
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, দুই-তিনটি ককটেল বিস্ফোরণকে গোয়েন্দা ব্যর্থতা বলা যায় না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরো বড় অনেক ঘটনা উন্মোচন করছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ককটেল বিস্ফোরণ বা অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা সাধারণত কয়েকজনের ছোট ছোট দলে দ্রুত সংঘটিত হয়। ফলে কোনো একটি এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করেও প্রতিটি ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে ঠেকানো কঠিন। একই সাথে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলেও ঘটনাস্থল, সময় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে আগাম গ্রেফতার বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ সীমিত থাকে।
ডিএমপির অপরাধ বিভাগের একজন ডিসি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুধু শুক্রবারের ঘটনাগুলো দিয়ে গোয়েন্দা ব্যর্থতার সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। নাশকতার ধরন, ঘটনাগুলোর বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেয়া প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা- সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
২৭৬ চেকপোস্ট, তল্লাশি জোরদার
ডিএমপির তথ্য মতে, রাজধানীজুড়ে ২৭৬টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি, মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। নাশকতায় মোটরসাইকেল ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকায় এ ধরনের যানবাহনের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারাও জানান, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহন থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করা হচ্ছে।
শনিবার ট্রেনে ঢাকায় আসা পাবনার বাসিন্দা মো: রাশিদুল ইসলাম বলেন, ট্রেনে সন্দেহভাজন কয়েকজন যাত্রীর ব্যাগ তল্লাশি করতে দেখা গেছে। তার স্ত্রী সাথে থাকায় ব্যাগ তল্লাশি না করলেও পুলিশ তার পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে জানতে চেয়েছে।
একাধিক গোয়েন্দা ইউনিটের সমন্বয়
রাজধানীতে সম্ভাব্য অপরাধ ও নাশকতা সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণের জন্য পুলিশের একাধিক বিশেষায়িত ইউনিট রয়েছে। ডিএমপির ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ডিভিশন বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। বিশেষ শাখাও আগাম তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট ইউনিট ও থানাগুলোকে সতর্ক করে। এ ছাড়া অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকেও পুলিশ তথ্য পেয়ে থাকে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ সশরীরে এবং অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সব ধরনের তৎপরতার আগাম তথ্য সব সময় পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্য পাওয়া গেলেও জনবল ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বাহিনীর ভেতর থেকে তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনাও তদন্তে কখনো কখনো সামনে এসেছে বলে কর্মকর্তারা জানান।
সমন্বয়ের ঘাটতি কতটা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, বারবার বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও ঝটিকা মিছিল ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতার সতর্কসঙ্কেত হতে পারে। ব্যর্থতা কোথায় হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে তা চিহ্নিত করতে হবে।
তার মতে, মূল প্রশ্ন হলো- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছে নাকি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া এবং নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। কারণ যেখানেই সমস্যা থাকুক তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করে সংশোধন করা জরুরি।
তবে পুরো দায় পুলিশের ওপর চাপানোর বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সাথে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে বাহিনীর মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
রায়ের পর উত্তেজনা
গত ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের ফটকের বাইরে একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এরপর রাজধানীতে বিচ্ছিন্নভাবে ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা বাড়তে থাকে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঘোষিত বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সতর্ক অবস্থান নেয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের সামনে দু’টি চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- এক দিকে সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধ করা, অন্য দিকে সাধারণ মানুষের চলাচল ও নাগরিক নিরাপত্তা স্বাভাবিক রাখা। ফলে শুধু চেকপোস্ট বাড়ানো নয়, আগাম তথ্যের মান, তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা, মাঠপর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়- সবকিছুর কার্যকারিতাই এখন পরীক্ষার মুখে।







