
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে ইরানে সামরিক অভিযান চালানো বন্ধ করতে একটি ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজুলিউশন’ বা যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস করেছে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ট্রাম্প যেন আর স্বাধীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্যই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এটি নিয়ে তৃতীয়বারের মতো এমন প্রস্তাব পাস করল প্রতিনিধি পরিষদ। খবর রয়টার্সের।
মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটি ২২০-২০৪ ভোটে পাস হয়। এতে সব ডেমোক্র্যাট সদস্যের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যও সমর্থন জানান। আইওয়ার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান জ্যাক নান বলেন, আলোচনার সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযান চালাতে হলে কংগ্রেসের অনুমতি নেয়া জরুরি। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, তিনি কোনো অন্তহীন যুদ্ধের পক্ষে নন। তবে ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি ব্রায়ান মাস্টার এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, ইরান আমেরিকার জন্য এখনো বড় হুমকি এবং ট্রাম্প এই দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসান ঘটাতে চান।
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিনিধি পরিষদে এটিই হয়তো ইরান যুদ্ধ নিয়ে শেষ ভোট। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, যা প্রায় সাত মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। কংগ্রেসের বাজেট অফিসের (সিবিও) তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে এই যুদ্ধের পেছনে খরচ হয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা প্রতি মাসে আরো তিন বিলিয়ন ডলার করে বাড়ছে। তা ছাড়া এই যুদ্ধের কারণে আগামীতে পণ্যের দাম ও মুদ্রাস্ফীতি আরো বেড়ে যেতে পারে।
চলতি বছরের জুলাই মাসের একটি জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মার্কিনিই মনে করেন এই যুদ্ধ কোনো কাজের নয়।
যদিও মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেসের হাতে, তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কিছু বিশেষ সামরিক ক্ষমতা রয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া আইন অনুযায়ী, ৬০ থেকে ৯০ দিনের বেশি সময় ধরে কোনো বড় সামরিক অভিযান চালাতে হলে প্রেসিডেন্টের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক।
ইরানের হামলায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ‘ব্যাপক ক্ষতি’
সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের সশস্ত্রবাহিনী মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে বলে দাবি করেছেন দেশটির সশস্ত্রবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিউমার্স হায়দারি। তার দাবি, ইরানের সামরিক বাহিনী এখন যুদ্ধের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে যেতে বাধ্য করেছে। খবর : প্রেসটিভির। বুধবার ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ মূল্যবোধ সংরক্ষণ ও প্রকাশনাবিষয়ক কাউন্সিল’-এর এক সভায় বক্তব্য দেন হায়দারি। তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের সশস্ত্রবাহিনী বিজয়ী অবস্থানে রয়েছে। হায়দারি বলেন, কোনো রক্ষণশীল পক্ষ যদি আক্রমণকারীকে নির্ধারিত সময় ও স্থানে তার লক্ষ্য অর্জনে বাধা দিতে পারে, তাহলে সেই পক্ষকেই বিজয়ী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, যে শত্রু ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থা উৎখাতের স্বপ্ন দেখেছিল, তারা এখন যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় বা প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকায় রয়েছে। অর্থাৎ, তারা কোনো পদক্ষেপ নিলে তা ইরানের পদক্ষেপের জবাব হিসেবেই নিতে হচ্ছে। ইরানের এই জ্যেষ্ঠ কমান্ডার দাবি করেন, সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতে দেশটির সামরিক সক্ষমতা মার্কিন নৌ-শক্তির দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার অন্যতম প্রধান শক্তি তাদের নৌবাহিনী ও যুদ্ধজাহাজ; কিন্তু কয়েক রক্ষা ত আগে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন ভারী যুদ্ধজাহাজ ও ফ্রিগেটগুলোতে আঘাত হেনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। হায়দারির দাবি, ইরানের হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাহিনীকে ইরান থেকে অন্তত ৫০০ কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় পায় এবং সামরিক সঙ্ঘাত তো দূরের কথা, দেশটির নাম উচ্চারণ করতেও দ্বিধাবোধ করে। কিন্তু ইরান এমন পরিস্থিতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে ইসরাইল ও আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ইরান সামরিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে।
ইরানের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতার বিষয়টিও তুলে ধরেন হায়দারি। তিনি বলেন, কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশটির সশস্ত্রবাহিনী নিজস্ব প্রযুক্তি ও সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তিনি আরো দাবি করেন, শত্রুর প্রতিটি ‘উদ্ধত পদক্ষেপের’ জবাবে ইরান ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং এতে দেশটির সামরিক সক্ষমতা প্রতিপক্ষকে বিস্মিত করেছে।
হায়দারি বলেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর সামনে দু’টি পথ খোলা থাকবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে মার্কিন সেনাদের একটি অংশ যুদ্ধজাহাজে করে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হবে, আর অন্যদের সমুদ্রের তলদেশে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির নতুন ছবি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ। খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কর্মরত কয়েকজন সদস্য পরিচয় গোপন রেখে এসব ছবি সরবরাহ করেছেন। তাদের দাবি, হামলায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হলেও সেই তথ্য পুরোপুরি জনসমক্ষে আসেনি। খবর মেহের নিউজ এজেন্সির। ছবি প্রকাশের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সামরিক সদস্যরা জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনীতে গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছবিগুলো দিয়েছেন। মার্কিন এক সেনাসদস্য বলেন, ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ঘাঁটি উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে এই ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো মার্কিন জনগণের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
সংবাদমাধ্যমটির প্রকাশিত ছবিগুলোর একটি সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে তোলা বলে দাবি করা হয়েছে। ছবিতে একটি চার ইঞ্জিনবিশিষ্ট সামরিক বিমানে সরাসরি আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। হামলার ফলে বিমানটির পেছনের অংশ মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকাশিত ছবিগুলোর সত্যতা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ (পেন্টাগন) তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। নতুন প্রকাশিত এসব ছবি সেই হামলাগুলোর প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
কেশম দ্বীপে মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কেশম দ্বীপের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বুধবার ভোরে কেশম দ্বীপের আকাশসীমায় ড্রোনটি শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয় বলে জানিয়েছে আইআরজিসির জনসংযোগ দফতর। খবর আলজাজিরার। আইআরজিসি জানিয়েছে, তাদের অ্যারোস্পেস ফোর্সের পরিচালিত অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ড্রোনটি প্রতিহত করে। পুরো অভিযানটি ইরানের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া তৃতীয় যুদ্ধ বা ‘রমজান যুদ্ধ’-এর সময় ধ্বংস করা ৫২তম এমকিউ-৯ ড্রোন। এ সময় ইরানের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ‘লুকাস’, ‘হার্মিস’, ‘এমকিউ-১’ ও ‘এমকিউ-৯’সহ বিভিন্ন ধরনের শত শত ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে বাহিনীটি। এর কয়েক দিন আগে কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর প্রবেশমুখে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি মানববিহীন জলযান (ইউএসভি) ধ্বংস করার দাবিও জানিয়েছিল আইআরজিসি। আইআরজিসি বলেছে, দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এই অভিযান ছিল একটি ‘নির্ভুল, বুদ্ধিদীপ্ত ও সময়োপযোগী’ পদক্ষেপ।







