
বিশেষ সংবাদদাতা
ক্যাশ থেকে ক্রিপ্টো ক্রিপ্টো থেকে সম্পদ -> দেশে ক্যাশ ওপারে ওয়ালেট -> ব্লকচেইনেই মিলতে পারে পাচারের সূত্র
সাবেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী কিংবা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ নতুন নয়। কখনো আমদানি-রফতানির জালিয়াতি, কখনো হুন্ডি, আবার কখনো বেনামি কোম্পানি বা বিদেশে সম্পদ কেনার মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেয়ার অভিযোগ সামনে আসে। কিন্তু অর্থ পাচারের জগৎ এখন আর শুধু ব্যাংক, এলসি, হুন্ডি বা অফশোর কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সাথে এর সাথে যুক্ত হয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি- বিশেষ করে স্টেবলকয়েন, পিটুপি লেনদেন, আনহোস্টেড ওয়ালেট ও ওটিসি নেটওয়ার্ক।
বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, অপরাধীরা অর্থপাচার, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং অন্যান্য অবৈধ অর্থপ্রবাহে স্টেবলকয়েন ব্যবহার করছে। বিশেষ করে আনহোস্টেড ওয়ালেট ও পিটুপি লেনদেন বর্তমানে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন সম্পূর্ণ অবৈধ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ভার্চুয়াল সম্পদ ও ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেন, বিনিময়, স্থানান্তর বা এ-সংক্রান্ত কার্যক্রমে সহায়তা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। একই সাথে ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে বিদেশী ভিএএসপির মাধ্যমে ক্রিপ্টো ও পিটুপি লেনদেন বন্ধে নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে; অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্নটি
শুধু ‘ক্রিপ্টো কী’ তা নয়; বরং মূল প্রশ্ন হলো- নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও দেশ কীভাবে ডিজিটাল অ্যাসেটে রূপান্তরিত হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করছে এবং সেই অর্থের প্রকৃত মালিককে কীভাবে শনাক্ত করা সম্ভব?
১. প্রচলিত পথের সাথে যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল স্তর
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার (টিবিএমএল), হুন্ডি, আমদানি-রফতানিতে মূল্য কারসাজি, ওভার-ইনভয়েসিং, আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং বিদেশে বেনামি সম্পদ অর্জন। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) গোএমএল ব্যবস্থায় সন্দেহভাজন টিবিএমএল নামে পৃথক রিপোর্টিং ক্যাটাগরি চালুর মাধ্যমে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের ঝুঁকিকে প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব দিয়েছে। এখন এই প্রচলিত চেইনের সাথে যুক্ত হয়েছে একটি নতুন ও আধুনিক স্তর : ব্যাংকিং চ্যানেল ম স্থানীয় পিটুপি/ওটিসি লেনদেন ম ক্রিপ্টোকারেন্সি/মার্কিন ডলারটি ম একাধিক ডিজিটাল ওয়ালেটে স্থানান্তর ম বিদেশি এক্সচেঞ্জ বা ওটিসি নেটওয়ার্ক ম ফিয়াট মুদ্রায় রূপান্তর ম বিদেশে সম্পদ বা ব্যবসায় বিনিয়োগ
এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বাংলাদেশে সংঘটিত নির্দিষ্ট কোনো পাচারকাণ্ডের প্রমাণিত দলিল নয়; বরং আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত মানিলন্ডারিং টাইপোলজির আলোকে একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির কাঠামো মাত্র।
২. মার্কিন ডলার টেথার (টঝউঞ) কেন পাচারকারীদের পছন্দ?
বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টো সম্পদের দাম ওঠানামা করলেও, ইউএসডিটির মতো স্টেবলকয়েনের মূল্য মার্কিন ডলারের সাথে প্রায় ১:১ অনুপাতে স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি। ফলে অর্থ স্থানান্তরের সময় মূল্য-অস্থিরতার ঝুঁকি থাকে না।
তারল্য ও গতি : আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে দ্রুত স্থানান্তরের সুবিধার কারণে এটি অপরাধীদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
অবৈধ লেনদেনের চিত্র : চেইনএনালাইসিসর তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়া অবৈধ ক্রিপ্টো লেনদেনের বড় একটি অংশ স্টেবলকয়েন-ভিত্তিক। তবে ক্রিপ্টো অর্থনীতির সামগ্রিক লেনদেনের তুলনায় অবৈধ লেনদেনের অংশ অত্যন্ত কম; অর্থাৎ ক্রিপ্টো নিজে অপরাধের সমার্থক নয়; মূল ঝুঁকিটি হলো বৈধ অবকাঠামোর অপব্যবহার।
৩. ব্যাংকের বাইরে ‘ডিজিটাল সেতু’ ও ভুল ধারণা
প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুইফট (ঝডওঋঞ) মেসেজিং সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্লকচেইনভিত্তিক সম্পদ স্থানান্তরে ব্যাংক-টু-ব্যাংক সুইফট মেসেজের প্রয়োজন হয় না; একটি ওয়ালেট থেকে সরাসরি অন্য ওয়ালেটে ডিজিটাল সম্পদ পাঠানো যায়।
এখানেই একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে : অনেকে মনে করেন ক্রিপ্টো ওয়ালেট কেবল কিছু অক্ষর ও সংখ্যার দীর্ঘ ঠিকানা হওয়ায় এর মালিককে কখনোই চেনা যায় না।
বাস্তবতা হলো, ওয়ালেটের মালিকের নাম সরাসরি ব্লকচেইনে লেখা না থাকলেও লেনদেনের ইতিহাস প্রকাশ্য ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকে। সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ক্রিপ্টোর লেনদেনের ডিজিটাল পদচিহ্ন নগদ অর্থের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
৪. ‘ডিজিটাল ভূত’ ধরার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি : অন-চেইন অ্যানালিটিক্স
ক্রিপ্টো অপরাধ তদন্তের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো অনচেইন ব্লকচেইন এনালাইটিক্স। একটি নির্দিষ্ট ওয়ালেট শনাক্ত হলে তদন্তকারীরা খুব সহজেই ট্রেস করতে পারেন : অর্থ কোত্থেকে এসেছে এবং কোথায় গেছে? কতবার ব্লকচেইন পরিবর্তন বা লেয়ারিং করা হয়েছে? কোন এক্সচেঞ্জে বা ক্যাশ-আউট পয়েন্টে এটি প্রবেশ করেছে? অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো সরাসরি এক্সচেঞ্জে অর্থ না পাঠিয়ে এখন একাধিক ওয়ালেটের মাধ্যমে স্তর তৈরি করে। এতে তদন্ত কিছুটা জটিল হলেও অসম্ভব হয় না।
৫. বাংলাদেশের পিটুপি বাজার ও তদন্তের নতুন দরজা
বাংলাদেশে ক্রিপ্টো নিষিদ্ধ হলেও ব্যাংক ও এমএফএস চ্যানেলে সন্দেহজনক লেনদেন বা পিটুপি মার্জেন্টের মাধ্যমে অর্থ হাতবদলের নানা তথ্য বিএফআইইউর নজরে আসে। তদন্তের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নগুলো হওয়া উচিত-
১. কার ব্যাংক বা এমএফএস হিসাব ব্যবহার করে টাকা পাঠানো হয়েছে?
২. কোন পিটুপি মার্চেন্ট বা ক্যাশ এজেন্টের সাথে জড়িত?
৩. সমপরিমাণ ইউএসডিটি কোন ওয়ালেটে ট্রান্সফার হয়েছে?
কোনো পিটুপি মার্চেন্ট বা ওটিসি ব্যবসায়ীকে কেবল ক্রিপ্টো লেনদেনের অভিযোগে সরাসরি পাচারকারী বলা যাবে না। তবে এমএফএস অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক নগদ লেনদেন এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেটের সংযোগ পেলে সেটি নিশ্চিতভাবেই একটি বড় সতর্কবার্তা।
৬. হুন্ডি ও ক্রিপ্টো : আলাদা জগৎ নয়, ‘হুন্ডি প্লাস ক্রিপ্টো’ মডেল
ঐতিহ্যবাহী হুন্ডি মডেলে দেশ থেকে টাকা দিয়ে বিদেশে পরিশোধ নেয়া হতো। কিন্তু বর্তমান যুগে হুন্ডি এবং ক্রিপ্টো আলাদা কোনো জগৎ নয়, বরং এগুলো পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে: হুন্ডি নেটওয়ার্ক ম ডিজিটাল সম্পদ/ইউএসডিটি ম সীমান্তপারের স্থানান্তর ম বিদেশে নগদ অর্থ/ব্যাংক হিসাব/সম্পদ তদন্তের স্বার্থে তাই শুধু হুন্ডি বা শুধু ক্রিপ্টো না ভেবে উভয়ের সমন্বিত রূপটিকেই বিবেচনায় নিতে হবে।
৭. দেশের ভেতরের ছায়া অর্থনীতি : ‘ক্যাশ’ কেন এখনো রাজত্ব করছে?
বিদেশে টাকা পাচার বলতেই মানুষ দুবাই, সিঙ্গাপুর বা সুইজারল্যান্ডের অফশোর অ্যাকাউন্ট খোঁজে। কিন্তু পাচার করা বা অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ দেশের ভেতরেও বিভিন্ন ছদ্মাবরণে থেকে যেতে পারে, যেমন : জমি ও রিয়েল এস্টেট; নগদনির্ভর ব্যবসা (যেমন- ইটভাটা, হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন); বেনামি কোম্পানি ও কম অডিট-স্বচ্ছতার প্রতিষ্ঠান।
ডিজিটাল যুগেও নগদ অর্থের আকর্ষণ কমেনি, কারণ ক্যাশ লেনদেনে কোনো অন-চেইন লেজার বা তাৎক্ষণিক কেওয়াইসি (গ্রাহক পরিচিতি) থাকে না। তাই বড় কোনো দুর্নীতির তদন্তে ‘মাস্টার অ্যাকাউন্ট’ বা ক্যাশের উৎস খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।
৮. দুদক ও বিএফআইইউর নতুন তদন্ত কাঠামো
কার্যকর তদন্তের জন্য বহুমুখী সমন্বয় প্রয়োজন :
১. দেশীয় আর্থিক তথ্য : বিএফআইইউর মাধ্যমে ব্যাংক এসটিআর/এসএআর,এমএফএস ট্রানজ্যাকশন, পিটুপি অস্বাভাবিক লেনদেন এবং এনআইডি/কেওয়াইসি যাচাই করা।
২. ব্লকচেইন ফরেনসিক : ওয়ালেট ক্লাস্টারিং, ক্রস-চেইন মুভমেন্ট এবং ক্যাশ-আউট পয়েন্ট বিশ্লেষণ করা।
৩. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা : বিদেশী এক্সচেঞ্জ, ঋওট এবং রিয়েল এস্টেট কর্তৃপক্ষের সাথে আইনি প্রক্রিয়ায় তথ্যবিনিময় করা।
শেষ কথা
বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ, এফএটিএফ ও চেইন এনালাইসিসর প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ অনুসারে বাংলাদেশের অর্থপাচার তদন্তের ভবিষ্যৎ শুধু দুবাইয়ের ব্যাংক হিসাব বা সুইজারল্যান্ডের অ্যাকাউন্ট খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এমএফএসের ছোট অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে ব্লকচেইনের বড় ওয়ালেট, স্থানীয় ওটিসি দালাল থেকে বিদেশী এক্সচেঞ্জ- সব কিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তহবিল প্রবাহ ম্যাপ তৈরি করতে হবে।
ডিজিটাল টাকা যতই দ্রুত সীমান্ত পেরোক না কেন, বাস্তব অর্থনীতিতে ফেরার মুহূর্তে তার পদচিহ্ন ঠিকই রেখে যায়। এখন দেখার বিষয়, আমাদের তদন্ত সংস্থাগুলো এই ডিজিটাল পদচিহ্ন পড়ার সক্ষমতা কত দ্রুত অর্জন করতে পারে।







