
শাহ আলম নূর
আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ২৯-৩০ ডলার প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট দরে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে সরকার। যুদ্ধের আগে যে দরে স্পট এলএনজি কেনা হতো, তার তুলনায় বর্তমান দাম দ্বিগুণেরও বেশি। প্রতি ইউনিটের দাম ১০ ডলার ধরে তুলনা করলে একটি কার্গোতেই অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৮২৭ কোটি টাকা।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ২৮.৯৫ ডলার ও ২৯.৭৯৫ ডলার প্রতি ইউনিট দরে দু’টি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছে। প্রতিটি কার্গোতে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার ইউনিট এলএনজি থাকে। ফলে প্রায় ৩০ ডলার দরে একটি কার্গোর আমদানি মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০ কোটি আট লাখ ডলার বা ১২৩ টাকা ডলার হিসাবে প্রায় এক হাজার ২৪০ কোটি টাকা।
অন্য দিকে, প্রতি ইউনিট ১০ ডলার দরে একই পরিমাণ এলএনজি কিনলে কার্গোটির মূল্য হতো প্রায় তিন কোটি ৩৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ ১০ ডলারের পরিবর্তে ৩০ ডলার দরে কিনলে অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে প্রায় ছয় কোটি ৭২ লাখ ডলার। ১২৩ টাকা বিনিময় হার ধরলে এর পরিমাণ প্রায় ৮২৭ কোটি টাকা।
তবে তুলনার ভিত্তি হিসেবে যুদ্ধের আগের ১০-১২ ডলারের বাজারদর ধরলে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ কিছুটা কম হবে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের যুদ্ধপূর্ব স্পট এলএনজি ক্রয়মূল্য ১০-১২ ডলার প্রতি ইউনিট বলা হয়েছে। অর্থাৎ ৩০ ডলারের এলএনজি বাংলাদেশের জন্য শুধু আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির বিষয় নয়; এর সাথে যুক্ত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার বাড়তি চাপ।
একাধিক কার্গোতে বাড়তি ব্যয় হাজার কোটি টাকা
সরকারের সাম্প্রতিক ক্রয়চিত্রেই সঙ্কটের মাত্রা স্পষ্ট। ১৪ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত দু’টি কার্গোর একটির দাম ২৮.৯৫ ডলার এবং অন্যটির দাম ২৯.৭৯৫ ডলার প্রতি ইউনিট। একই বৈঠকে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে দু’টি কার্গো ১৭ ডলার এবং আরো দু’টি ১৯ ডলার দরে কেনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে সরবরাহের ধরন ও চুক্তির ভিত্তি অনুযায়ী দামের বড় পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে। এর আগে সেপ্টেম্বরের জন্য অনুমোদিত আরো তিনটি কার্গোর দাম ছিল ২৬.৬৬৮৮ থেকে ২৮.০৩ ডলার এবং একটি কার্গোর দাম ছিল ২৩.৯৮ ডলার প্রতি ইউনিট।
ফলে ২৫-৩০ ডলারের আশপাশে ধারাবাহিকভাবে একাধিক কার্গো কিনতে হলে মাসে অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এর সাথে উচ্চমূল্যের গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাড়তি খরচ এবং শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আর্থিক ক্ষতি যুক্ত হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ আরো বাড়বে।
কাতারের সরবরাহ কমায় স্পট মার্কেটনির্ভরতা
এলএনজির দাম বাড়ার পেছনে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা আন্তর্জাতিক সরবরাহ সঙ্কট বড় ভূমিকা রাখছে। কাতার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত ও হরমুজ প্রণালীর সরবরাহব্যবস্থায় বিঘেœর কারণে কাতার এ বছর বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার কথা জানিয়েছে। ফলে ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় বেশি দামে স্পট কার্গো কিনতে হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
এক বছরে এলএনজি বিল বেড়েছে ৮৫৫ মিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশের এলএনজি-নির্ভরতার আর্থিক চাপের আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় গত বছরের আমদানি হিসাবে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ৩৮৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। ২০২৪ সালে ৮৬টি কার্গোর জন্য ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩০২ কোটি ২৩ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে কার্গোর সংখ্যা ২৩টি এবং আমদানি ব্যয় প্রায় ৮৫ কোটি ৫৪ লাখ ডলার বেড়েছে।
২০২৫ সালে আমদানি করা এলএনজির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ কোটি সাত লাখ ইউনিট। সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত না হওয়ায় আমদানি বাড়াতে হয়েছে।
ভর্তুকির হিসাবেও বড় ধাক্কা : এলএনজির উচ্চমূল্যের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের ভর্তুকিতে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলএনজি আমদানির জন্য ১১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম দেড় মাসেই এর ৪২ দশমিক ৭৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় চার হাজার ৭০০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ খাতে ছাড়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
এর আগের অর্থবছরের চিত্র আরো উদ্বেগজনক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকির জন্য ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বছর শেষে ব্যয় প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ বরাদ্দের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সিপিডির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও এই হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বর্তমান বাজারদর দীর্ঘ সময় বহাল থাকলে চলতি অর্থবছরের ১১ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দও পর্যাপ্ত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও দ্বিমুখী চাপ : এলএনজির দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু আমদানি ব্যয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। আমদানি করা এলএনজি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজিনির্ভর। উচ্চমূল্যের এলএনজি শিল্প উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা তৈরি করছে এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ বাড়াচ্ছে।
গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমাতে হয়। তখন চাহিদা পূরণে তুলনামূলক ব্যয়বহুল তরল জ্বালানি বা অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্র চালানোর প্রয়োজন হয়। ফলে একদিকে এলএনজির দাম বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি মিশ্রণও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
গত আগস্টে একটি এলএনজি টার্মিনাল আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের পর সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাস চাহিদা ৩,৮০০-৪,০০০ এমএমসিএফটি-এর বিপরীতে গড় সরবরাহ প্রায় ২,৬০০ এমএমসিএফটি ছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি চাপ শিল্পে : এলএনজি ও গ্যাস সঙ্কটের সবচেয়ে সরাসরি অভিঘাত পড়ছে শিল্পে। গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে গেলে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারে না। কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়, যার খরচ বেশি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে বর্তমান সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তার মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুদ ও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভরতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেই তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়ে।
তার মতে, এলএনজির উচ্চমূল্যের সাথে সরবরাহ সঙ্কট যুক্ত হওয়ায় তৈরী পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, ইস্পাত, কাচ, সারসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে কারখানার উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করা যায় না; বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাসসঙ্কটের কারণে অনেক কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদন করতে পারছে না। এতে সময়মতো রফতানিপণ্য সরবরাহ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। বিদেশী ক্রেতারা বিকল্প উৎসে চলে গেলে বাংলাদেশের রফতানি খাত দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে গেলে উৎপাদনযন্ত্র চালানো যায় না। তখন উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয় অথবা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণ, কারখানা পরিচালনা ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হয়।
বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ : এলএনজি আমদানি বাড়ার সাথে সাথে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও বাড়ছে। ২০২৫ সালে ১০৯টি কার্গোর জন্য প্রায় ৩.৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের তথ্যই এর মাত্রা বোঝায়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যদি দীর্ঘ সময় ২৫-৩০ ডলারের আশপাশে থাকে, তাহলে একই পরিমাণ গ্যাস আমদানির জন্য আগের তুলনায় অনেক বেশি ডলার প্রয়োজন হবে। এতে আমদানি ব্যালান্স, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এবং সরকারের জ্বালানি খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়তে পারে।
অন্য দিকে এই বাড়তি ব্যয় যদি ভর্তুকির মাধ্যমে সামাল দেয়া হয়, তাহলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে। আর ভর্তুকি কমাতে গ্যাস বা বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তার প্রভাব পড়তে পারে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও সাধারণ ভোক্তার ওপর।
সঙ্কটের শিক্ষা : বাংলাদেশের বর্তমান এলএনজি সঙ্কটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এটি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সমস্যা নয়; এর সাথে যুক্ত হয়েছে সরবরাহের ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়, ভর্তুকি এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতার প্রশ্ন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়াতে সময় লাগবে। স্বল্পমেয়াদে প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানির পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। ফলে প্রায় ৩০ ডলারের এলএনজি এখন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি ব্যয়বহুল আমদানি পণ্যের নাম নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, রফতানি, বৈদেশিক মুদ্রা, ভর্তুকি এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।







