মমেকে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা ৫ সিঁড়ির ৪টি ছিল ‘তালাবদ্ধ’

ময়মনসিংহ অফিস

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (মমেক) নতুন ভবনে অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট আতঙ্ক ও হুড়োহুড়িতে একাধিক ব্যক্তির মৃত্যুর দাবি উঠলেও এ নিয়ে হাসপাতাল ও প্রশাসনের বক্তব্যে স্পষ্ট গরমিল দেখা দিয়েছে। ঘটনার পর জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য জানালেও পরে বিভাগীয় কমিশনার জানান, কারো মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, পদদলনেই তাদের স্বজনদের মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলার লিফট কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগে। ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দীর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট প্রায় ৩০ মিনিটের চেষ্টায় তা নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রোগী, স্বজন ও কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং সিঁড়িতে ব্যাপক হুড়োহুড়ির সৃষ্টি হয়।
মৃত্যু নিয়ে বিরোধপূর্ণ তথ্য : জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রাথমিকভাবে হাজেরা বেগম, শাহজাহান  মনির, রমজান আলী, জাহানারা বেগম, কুলসুম আক্তার ও অজ্ঞাত পরিচয় এক শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য জানান। তবে রাত ১টার দিকে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ূন কবির সরকার সাংবাদিকদের জানান, অগ্নিকাণ্ডে কারো মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যদিও হুড়োহুড়িতে কয়েকজনের আহত হওয়ার তথ্য তিনি স্বীকার করেন।
হাসপাতালের একটি রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, চারজনকে ‘ব্রট ডেড’ (মৃত অবস্থায় আনা) হিসেবে লেখা হয়েছে, যাদের মৃত্যুর সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে সোয়া ৭টার মধ্যে বলে উল্লেখ আছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, পদদলিত হয়ে মৃত্যু হলে শরীরে যেসব চিহ্ন থাকার কথা, চিকিৎসকেরা তা পাননি এবং প্রকৃত মৃত্যুর কারণ তদন্তের আওতায় থাকবে। রেজিস্টারে ‘ফায়ার অ্যাকসিডেন্ট’ লেখার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি শুধু হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা নথিভুক্ত করার জন্য লেখা হয়েছিল, এর অর্থ এই নয় যে তারা আগুনে মারা গেছেন।
এ দিকে নিহত শাহজাহান মনিরের স্ত্রী হারিছা খাতুন দাবি করেন, সিঁড়িতে নামার সময় মানুষের ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারান তিনি এবং পরে জানতে পারেন তার স্বামী মারা গেছেন। মেরুদণ্ডের হাড়ে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত শাহজাহান গত বুধবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
সিঁড়ি তালাবদ্ধ থাকার অভিযোগ : হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আটতলা নতুন ভবনে সাতটি লিফট ও পাঁচটি সিঁড়ি থাকলেও নিয়মিত ব্যবহৃত হয় মাত্র একটি সিঁড়ি; বাকি চারটির বিভিন্ন তলার প্রবেশপথে গ্রিল দিয়ে তালা দেয়া থাকে। ঘটনার পরদিন সরেজমিনে দেখা যায়, তালাবদ্ধ গেটগুলোর কয়েকটি ভাঙার চেষ্টা হলেও ব্যর্থ হয়েছেন রোগী-স্বজনরা। বিভাগীয় কমিশনার জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখার কথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তবে এতে কোনো অনিয়ম ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারিও হাসপাতালের একই ভবনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছিল, তখনো সিঁড়িতে হুড়োহুড়িতে কয়েকজন আহত হন।
তদন্ত কমিটি গঠন : মঙ্গলবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে, যার প্রধান হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়া। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদফতরের দু’জন ও ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন এবং তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। মাইনউদ্দিন খান জানান, আগুন লাগার কারণ, সম্ভাব্য গাফিলতি ও সিঁড়ি বন্ধ রাখার বিষয়টি তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।