
ইসরাইলের এই পরাজয়ের ধারা শুরু হয় ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ায়।
ইসরাইলের অনুগত মিত্র আলেক্সান্ডার ভুচিচ এক মাস আগে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন এবং আগাম পার্লামেন্টারি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার জোট দুর্নীতিবিরোধী ছাত্র-সমর্থিত একটি আন্দোলনের কাছে নির্বাচনে হেরে যায়।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো সার্বিয়ার নির্বাচনে ইসরাইল কোনো মূল বিষয় ছিল না; বরং সেটি ছিল অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের ফল। ভুচিচ ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে হারেননি, তবে তার পরাজয়ের কারণে সেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অথচ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের পর সার্বিয়ার সাথে এই সম্পর্ক ইসরাইলের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
এমন এক সময়ে যখন ইসরাইলের কিছু পশ্চিমা মিত্র অস্ত্র বা অস্ত্রের যন্ত্রাংশ বিক্রি সীমিত করছিল, তখন সার্বিয়া এগিয়ে আসে। খবর অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবরের শুরুতেই ইসরাইল গোলাবারুদের অনুরোধ নিয়ে সার্বিয়ার সাথে যোগাযোগ করে। ভুচিচ তাতে সম্মত হন এবং শিগগিরই ১৫৫-মিমি আর্টিলারি শেল বিমানে করে ইসরাইলে পাঠানো শুরু হয়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সার্বিয়ার প্রধানের সাথে ফোনালাপের পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির ‘কথায় ও কাজে অবিচল সমর্থনের‘ প্রশংসা করেন এবং ভুচিচকে ‘ইসরাইলের সত্যিকারের বন্ধু‘ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
এখন সেই ‘সত্যিকারের বন্ধু‘ ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় প্রতিরক্ষা সম্পর্কের কী হবে?
এই অস্ত্রের বাণিজ্য দুই তরফেই চলত। ২০২৫ সালের আগস্টে সার্বিয়া ইসরাইলি ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের জন্য ১.৬ বিলিয়ন (১৬০ কোটি) ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। গত এপ্রিলে দুইটি দেশ একটি কৌশলগত সংলাপ শুরু করে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর বেলগ্রেডে ইসরাইলি নকশার ড্রোন তৈরির একটি কারখানা উদ্বোধন করেন ভুচিচ।
বিজয়ী ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ যুদ্ধাঞ্চলে অস্ত্র রফতানি বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছে, যা ইউক্রেনের প্রসঙ্গে প্রকাশ্যে আলোচনা করা হয়েছিল। সেই অঙ্গীকার ইসরাইলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে কি না এবং যৌথ ড্রোন প্রকল্পের কী হবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
তবে নির্বাচনের আগে এই ছাত্র জোটের ইশতেহারে গাজা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয়া হয়েছিল : ‘গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি জনগণকে ধ্বংস করার যে নিয়মতান্ত্রিক চেষ্টা ইসরাইল চালাচ্ছে, আমরা তাতে অংশীদার হবো না।’
যে রোববারে সার্বিয়ায় ভুচিচের জোট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়, ঠিক সেই একই দিনে ব্রাজিলের বামপন্থী ও ইসরাইল-বিরোধী প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা ডানপন্থী ও ইসরাইল-বান্ধব ফ্ল্যাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেন। এর মাধ্যমে জেরুসালেমের সেই আশা ভেঙে যায় যে কলম্বিয়া, পেরু, চিলি, বলিভিয়া এবং অন্যান্য লাতিন আমেরিকান দেশের মতো ব্রাজিলও হয়তো ইসরাইলের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ ডানপন্থী সরকার নির্বাচিত করবে।
অক্টোবরের শুরুতে প্রথম পর্বের ভোটে বলসোনারো লুলার চেয়ে এগিয়ে থাকার পর নেতানিয়াহু তাকে অভিনন্দন জানাতে ফোন করেছিলেন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তখন বলেছিল : ‘দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আসছে, তার অংশ হিসেবে দুই দেশ আবার গভীর বন্ধুত্ব পুনরুজ্জীবিত করতে চায়...’
এখন দেখা যাচ্ছে, সেই মন্তব্যটি একেবারেই বাস্তবসম্মত প্রমাণিত হয়নি।
ফ্ল্যাভিও বলসোনারোর বিজয় তার বাবা জাইর বলসোনারোর নীতি ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হয়েছিল। জাইর বলসোনারো ২০১৯ সালে জেরুসালেমে একটি বাণিজ্য কার্যালয় খোলেন, ইসরাইলের সাথে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা গভীর করেন এবং জাতিসঙ্ঘে ব্রাজিলের ভোটিং প্যাটার্ন পরিবর্তন করেন।
লুলা যখন ২০২২ সালে জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করেন, তখন তিনি ব্রাজিলকে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী মেরুতে নিয়ে যান। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলাকে সমর্থন জানায় ব্রাজিল।
লুলা গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘হলোকাস্ট’-এর সাথে তুলনা করেন এবং ইসরাইলে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করেন। তার এই পুনর্নির্বাচন জেরুসালেমের কূটনৈতিক আশা ভরসার দুয়ার পুরোপুরি বন্ধ করে দিলো।
আর এরপর এলো ইসরাইলের নিজস্ব নির্বাচন।
ইসরাইল এই নির্বাচনে কিভাবে হারল? শেষ পর্যন্ত আবারো এমন একটি অচলাবস্থায় উপনীত হয়ে, যাকে উভয়পক্ষই নিজেদের জয় বলে দাবি করতে পারে।
নেতানিয়াহু তার লিকুদ পার্টিকে একক বৃহত্তম দল হিসেবে তুলে ধরতে পারেন এবং বিরোধী পরিবর্তনকামী ব্লকের চেয়ে তার ব্লকের এগিয়ে থাকার কথা বলতে পারেন।
অন্যদিকে পরিবর্তনকামী ব্লকটি এই সত্যটি তুলে ধরতে পারে যে নেতানিয়াহুর শিবিরের বাইরের দলগুলো (আরব দলগুলোসহ) নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি যা দিয়ে তারা একা সরকার চালাতে পারে।
বিদেশে নানা চ্যালেঞ্জ এবং দেশের ভেতরে ৭ অক্টোবরের ক্ষত এখনো টাটকা থাকা অবস্থায় ইসরাইলের জন্য এমন একটি নির্বাচন দরকার ছিল যা একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল সরকার দিতে পারত। কিন্তু তার বদলে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের সেই পরিচিত পাঁচটি নির্বাচনী চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটল: ভোটের রাতে কোনো স্পষ্ট বিজয়ী নেই এবং মাসের পর মাস জোট গঠন আলোচনার সম্ভাবনা, যা সরকার গঠন করতেও পারে আবার নাও পারে।
আর যে সরকারই গঠিত হোক না কেন—আপস করার কারণে—প্রতি পদে তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। প্রাক-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যদি অতি-অর্থোডক্স (হ্যারাদি) দল ছাড়া সরকার গঠনের হয়ে থাকে, তবে সেই সরকারে হ্যারাদিরা কেন? আর যদি প্রাক-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকে যে আরব দলগুলোর সমর্থন কখনো নেয়া হবে না, তবে এখন তাদের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে কেন?
ইসরাইল এখন ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অনেকে আশা করেছিলেন নির্বাচন দ্রুত এমন এক নেতৃত্ব এনে দেবে যা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। কিন্তু তা হয়নি, অন্তত এখন পর্যন্ত নয়—আর এই দিক থেকে দেশটি হেরে গেছে।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইসরাইল-বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের আসন বৃদ্ধি
এবার আসা যাক মঙ্গলবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনে যারা যাচ্ছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মিশিগানের নবনির্বাচিত ইসরাইল-বিরোধী সিনেটর আব্দুল আল-সায়েদ। সেই দিনগুলোর কথা ভেবে এখন আফসোস হতে পারে যখন ইসরাইল-বিরোধী তথাকথিত ‘স্কোয়াড’-এর সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র চারজন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো মূলধারার ডেমোক্র্যাটরা আল-সাইয়িদের মতাদর্শের দিকে কতটা ঝুঁকে পড়বেন। একটি দলের মধ্যে একটি ছোট কিন্তু সোচ্চার গোষ্ঠী বিতর্কের সুর নির্ধারণ করে দিতে পারে, এমনকি তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো যথেষ্ট ভোট না থাকলেও। আর এটি তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন কংগ্রেস অস্ত্র বিক্রি, সামরিক সাহায্য এবং ইসরাইল নীতি পর্যবেক্ষণের মতো বিষয়গুলোতে নজর দেয়।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বার্নি স্যান্ডার্স ঘরানার ইসরাইল-বিরোধী অংশটি মঙ্গলবার উল্লেখযোগ্য সমর্থন ও শক্তি পেয়েছে।
তবে ইসরাইলের জন্য সমস্যা শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রিপাবলিকানদের মধ্যেও ইতোমধ্যেই এমন কিছু কণ্ঠস্বর উঠেছে যারা মঙ্গলবারের শোচনীয় পরাজয়ের জন্য ইসরাইলকে দায়ী করছে।
নিউ ইয়র্ক পোস্টের এই শিরোনামটি বিবেচনা করা যাক: ‘ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা জিওপি-র বিপর্যয়কর মধ্যবর্তী নির্বাচনী পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করছেন : আশা করি শুমার নেতানিয়াহুকে ফোন করে ধন্যবাদ জানাবেন।’
সকালে এটিই ছিল শিরোনাম। আর বিকালের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক্স (টুইটার)-এ একটি পোস্টে স্পষ্ট করে দেন। তিনি একজন ভোট বিশ্লেষককে উদ্ধৃত করে বলেন যে ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করা কিছু ভোটার মঙ্গলবার চারটি প্রাথমিক কারণে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন : ইরানের যুদ্ধ শেষ করা, জীবনযাত্রার ব্যয়ের দিকে নজর দেয়া, ‘আমেরিকা ফার্স্ট‘ নীতি বাস্তবায়িত করা এবং ইসরাইলের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের ধরন পরিবর্তন করা।
যুক্তিটি এইরকম : মূল্যস্ফীতি ও গ্যাসের দাম বেশি থাকার কারণে রিপাবলিকানরা হেরেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে গ্যাসের দাম বেড়েছিল। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে সেই যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছেন। তাই ইসরাইলকেই দোষ দিন।
রিপাবলিকানরা মঙ্গলবারের পরাজয়ের জন্য কাউকে দায়ী করার খোঁজে নামায় এই যুক্তির আওয়াজ আরো জোরালোভাবে শোনার প্রস্তুতি রাখা ভালো।
ট্রাম্প আগামী দুই বছর হোয়াইট হাউসেই থাকবেন। কিন্তু ইসরাইলকে একটি ডেমোক্র্যাটিক নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে, ঠিক এমন এক সময়ে যখন প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কিছু অনুসারী রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য ইসরাইলকে দায়ী করছেন।
ইসরাইল ততদিনে সরকার গঠন করতে পারুক আর না পারুক, ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ইসরাইলের নিজেদের অস্পষ্ট নির্বাচনের ঝুঁকি ঠিক এখানেই। জেরুসালেম কে সরকার পরিচালনা করবে তা স্থির করার আগেই হয়তো এক পুরোপুরি ভিন্ন ওয়াশিংটন সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করবে যে তারা ইসরাইলের সাথে কেমন সম্পর্ক রাখতে চায়।
ইসরাইলি রাজনীতিকরা যদি চান যে পরবর্তী সরকার শুরু থেকেই সেই বিতর্কে নিজেদের কথা বলার সুযোগ পাক, তবে দ্রুত একটি সরকার গঠন করার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ তাদের হাতে রয়েছে। সূত্র : জেরুসালেম পোস্ট
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








