
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ইসরাইলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রেকর্ডসংখ্যক অংশগ্রহণে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
দেশটির রাজনীতিবিদ ও কলামিস্টরা দাবি করেছেন, নির্বাচনের ফলাফল নস্যাৎ করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে নেতানিয়াহু ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’-কে ব্যবহার করছেন।
নির্বাচনের ফলাফলে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট বিরোধী ব্লকের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পার হলেও শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনির নেতৃত্বে ফিলিস্তিনিদের ভোট নিয়ে তদন্ত চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থাপন না করেই এসব অনুসন্ধানে ভোট কারচুপি, ঘুষ এবং বৈদেশিক হস্তক্ষেপের মতো অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
এই তদন্ত এমন এক সময়ে পরিচালিত হচ্ছে, যখন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দল ‘রাম’ ও ‘জয়েন্ট লিস্ট’-কে অবৈধ প্রমাণের জন্য প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন। দল দু’টি যৌথভাবে নেসেটে অভূতপূর্ব ১৯টি আসন নিশ্চিত করেছে। সমালোচকদের মতে, এই প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য যেকোনো মূল্যে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা।
মঙ্গলবার শিন বেত ‘নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তদন্তের’ অজুহাতে মিডল ইস্ট আইয়ের সহযোগী সাংবাদিক আব্দ আবু শাহাদাহকে গ্রেফতার করে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শিন বেতের প্রধান জিনি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতা আহমদ তিবি, সামি আবু শাহাদাহ, মনসুর আব্বাস ও আয়মান ওদেহকেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান।
বিরোধী দল ‘ডেমোক্র্যাটস’-এর নেতা ইয়ার গোলান বুধবার সতর্ক করে বলেছেন, ইসরাইলের গণতন্ত্র এখন মারাত্মক হুমকির মুখে।
তিনি বলেন, ‘পুলিশ পরোয়ানা ছাড়াই রাজনৈতিক কর্মীদের আটক করছে। শিন বেত কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করেই জ্যেষ্ঠ নির্বাচিত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করছে। আর বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ সরকার নির্বাচনের ফলাফল স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।’
পরে গোলান নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘অভ্যুত্থান ঘটিয়ে শক্তির জোরে ক্ষমতা দখলের চক্রান্তের’ অভিযোগ তোলেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর ল্যাপিড মঙ্গলবার একই ধরনের অভিযোগ তুলে বলেন, নেতানিয়াহু ‘নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে থাকা তার অনুগত ক্যাডারদের সহায়তায় গণতন্ত্রকে পিষে ফেলতে এবং নির্বাচন ছিনতাই করতে’ চক্রান্ত করছেন। তার এই বক্তব্য শিন বেতের প্রধান জিনির প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, জিনিকে নেতানিয়াহু নিজেই নিয়োগ দিয়েছিলেন।
বিরোধী ব্লকের নেতা গাদি আইজেনকোট অবশ্য কিছুটা মেপে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি নির্বাচিত কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে রাজপথে সহিংসতা উসকে দেয়া এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ভেঙে দেয়ার মাধ্যমে ‘ইসরাইলি গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টার’ নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নেতানিয়াহুকে অভিযুক্ত করেছেন।
ইসরাইলি সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরাও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানার অভিযোগ এনেছেন। তাদের কেউ কেউ তার এই পদক্ষেপকে অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
হাআরেৎজ-এর সাংবাদিক আমোস হারেল বুধবার লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, তার অভ্যন্তরীণ বলয় এবং নিরাপত্তা শাখা ও গণমাধ্যমের সহযোগীরা ইসরাইলকে তার ইতিহাসের সবচেয়ে সঙ্কটাপন্ন সাংবিধানিক সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।’
হারেল বলেন, নেতানিয়াহু একটি ‘শাসনব্যবস্থার অভ্যুত্থানের’ চেষ্টা করছেন, যেখানে তিনি ‘স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পরিচিত কৌশল’ ব্যবহার করছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি গোপন গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবহার, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উসকানি, সহিংসতার হুমকি এবং নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতির কথা উল্লেখ করেন।
ইসরাইলের মূলধারার অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যম ক্যালকালিস্ট-এর একটি মতামত কলামেও নেতানিয়াহু ও শিন বেতের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
সাংবাদিক মোশে গোরোালি লিখেছেন, ‘নির্বাচনের ফলাফল স্বীকার করতে অস্বীকার করা একটি বড় ধরনের উত্তেজনা ও সংকটের ইঙ্গিত।’ তিনি যুক্তি দেখান, সরকার একটি অনুগত গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেয়ার মাধ্যমে ‘পরিচিত স্বৈরাচারী-ফ্যাসিবাদী প্রটোকল’ অনুসরণ করছে।
ওয়াইনেট-এর সাংবাদিক রনেন বার্গম্যান বলেছেন, ইসরাইল এখন ‘একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’
শিন বেতের সম্পৃক্ততা
ব্যাপক নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ খারিজ করে ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের কাছে নির্বাচনের ফলাফল হস্তান্তর করেছে।
এদিকে সমালোচকদের মতে, নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রধানমন্ত্রীর যে অপচেষ্টা চলছে, তারই অংশ হিসেবে শিন বেত তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
শিন বেতের নির্বাচন-সংক্রান্ত তদন্তের বিষয়ে অবগত একটি সূত্র ওয়াইনেট-কে জানিয়েছে, এসব অনুসন্ধানের পক্ষে কোনো প্রাথমিক প্রমাণও নেই।
সূত্রটি জানায়, ‘আইন কী বলে বা আইনের সাথে তার সম্পর্ক কী—সে বিষয়ে জিনির কোনো ধারণাই নেই। একজন নেসেট সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে হলে কল্পনার চেয়েও বেশি কিছুর প্রয়োজন হয়।’
গত বছর নেতানিয়াহু জিনিকে শিন বেতের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তার অতি ডানপন্থী আদর্শের কারণে ওই নিয়োগ ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সেনাবাহিনীর সাবেক এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং অধিকৃত সিরীয় গোলান মালভূমির বাসিন্দা জিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের আন্দোলনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
খবর অনুযায়ী, তিনি এক সময় বলেছিলেন, শিন বেতের প্রধানদের ‘আইন অনুযায়ী কাজ করতে হবে, তবে সর্বোপরি তারা প্রধানমন্ত্রীর অধীনস্থ।’
ওয়াইনেট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন-সংক্রান্ত এক হাজারেরও বেশি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়েছে, যার একটিরও কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
হাআরেৎজ জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে মঙ্গলবার মাত্র একটি শিন বেত তদন্ত শুরু হয়েছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের জড়িত করে বাকি তদন্তগুলো শুরু করা হয় কেবল তখনই, যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে নেতানিয়াহুর জোট নির্বাচনে হেরে গেছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি সূত্র চ্যানেল ১৩ নিউজকে জানিয়েছে, জিনি ‘কোনো প্রমাণ ছাড়াই নাম ছুড়ে দিচ্ছেন এবং লিকুদ পার্টির তৈরি করা বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করছেন।’ সূত্রটি তার বিরুদ্ধে শিন বেতের প্রতি গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক আস্থার সঙ্কট তৈরি করার অভিযোগও এনেছে।
সূত্রটি আরো জানায়, ‘যদি এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে এসব বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই, তবে বিষয়টি সহজে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।’ এর মাধ্যমে তদন্তে কোনো প্রমাণ না মিললে জিনির পদের বৈধতা ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
নির্বাচনের রাত থেকে শিন বেতের তৎপরতার আরো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে চ্যানেল ১২ নিউজ। বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, এসব অনুসন্ধান পরিচালনা করছেন জিনির উপপ্রধান, যাকে ‘নেতানিয়াহুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই বলে আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা মনে করলেও ওই অজ্ঞাতনামা উপপ্রধান অনুসন্ধান কার্যক্রম তদারকি করছেন এবং তদন্তকারীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








