১০ দিন, চার নির্বাচন, ইসরাইল, গোত্তা খেল,  কূটনীতি,
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

সার্বিয়া, ব্রাজিল, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে চারটি নির্বাচন ইসরাইলের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল করে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সাথে সম্পর্ক নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সাথে প্রশ্ন উঠেছে, দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে যাচ্ছে।

Advertisement

জেরুজালেম পোস্ট (৫ নভেম্বর) জানায়, ইসরাইলের জন্য পরপর চারটি নির্বাচনের ফলাফলই হতাশার কারণ হয়েছে। এর মধ্যে একটি ছিল দেশটির নিজেদের নির্বাচন। সর্বশেষ ধাক্কাটি এসেছে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে।

এই পরাজয়ের ধারার শুরু ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ায়। ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুচিচ এক মাস আগে পদত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আগাম সংসদ নির্বাচনে তার জোটকে হারিয়ে দেয় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের সমর্থিত একটি জোট।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের মতো সার্বিয়ার ভোটে ইসরাইল কোনো বড় বিষয় ছিল না। সেখানে মূল ইস্যু ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ। ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ভুচিচ নির্বাচনে হারেননি। তবে ক্ষমতা হারানোর ফলে দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইলের জন্য সার্বিয়ার সহযোগিতা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

পশ্চিমা কয়েকটি মিত্র দেশ অস্ত্র ও অস্ত্রের যন্ত্রাংশ বিক্রি সীমিত করলেও সার্বিয়া ইসরাইলকে সহযোগিতা বাড়িয়েছিল। ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবরই ইসরাইল সার্বিয়ার কাছে গোলাবারুদ চেয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। ভুচিচ তাতে সম্মতি দেন। এরপর ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলা ইসরাইলে পাঠানো হয়।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভুচিচের সাথে ফোনালাপের পর সার্বিয়ার ‘কথায় ও কাজে অবিচল সমর্থনের’ প্রশংসা করেন। ভুচিচকে আখ্যা দেন ‘ইসরাইলের প্রকৃত বন্ধু’ হিসেবে। এখন সেই বন্ধু ক্ষমতায় না থাকায় দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৫ সালের আগস্টে সার্বিয়া ইসরাইলের কাছ থেকে ১৬০ কোটি ডলারের ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কেনার চুক্তি করে। চলতি বছরের এপ্রিলে দুই দেশ কৌশলগত সংলাপ শুরু করে। ১৭ সেপ্টেম্বর বেলগ্রেডে ইসরাইলের নকশায় তৈরি ড্রোন সংযোজনের একটি কারখানার উদ্বোধন করেন ভুচিচ। নির্বাচনে জয়ী শিক্ষার্থীদের জোট যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে তা ইসরাইলের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে কি না, কিংবা ড্রোন কারখানার ভবিষ্যৎ কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গাজা নিয়ে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অবশ্য স্পষ্ট অবস্থান ছিল। সেখানে বলা হয়, ‘গাজা উপত্যকায় ইসরাইল ফিলিস্তিনি জনগণকে পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিহ্ন করার যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তাতে আমরা সহযোগী হব না।’

সার্বিয়ায় ভুচিচের জোটের পরাজয়ের দিনই ব্রাজিলে জয় পান বামপন্থী ও ইসরাইলবিরোধী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। হারেন ডানপন্থী ও ইসরাইলপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। ব্রাজিলকে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ করে তোলার যে আশা জেরুজালেম করেছিল, তাতে বড় ধাক্কা লাগে।

ইসরাইলের আশা ছিল, কলম্বিয়া, পেরু, চিলি ও বলিভিয়ার মতো ব্রাজিলেও ডানপন্থীরা ক্ষমতায় আসবে। প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও এগিয়ে থাকার পর নেতানিয়াহু তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর দফতর তখন বলেছিল, দুই দেশের গভীর বন্ধুত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই নেতার আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু লুলার জয়ে সেই খোয়াব অধরাই দেখে গেল। 

ফ্লাভিওর জয় হলে তার বাবা জাইর বলসোনারোর নীতিতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। জাইর ২০১৯ সালে জেরুজালেমে বাণিজ্য দফতর খুলেছিলেন, ইসরাইলের সাথে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়িয়েছিলেন এবং জাতিসঙ্ঘে ব্রাজিলের ভোটদানের অবস্থানও বদলে দিয়েছিলেন। ২০২২ সালে লুলা তাকে হারিয়ে ক্ষমতায় এসে উল্টো পথে হাঁটেন। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার গণহত্যার মামলাকে সমর্থন করে ব্রাজিল। গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে হলোকাস্টের সাথে তুলনা করেন লুলা। ইসরাইল থেকে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতকেও ফিরিয়ে নেন তিনি।

এরপর ধাক্কা আসে ইসরাইলের নিজেদের নির্বাচন থেকে। সেখানে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। নেতানিয়াহু বলতে পারেন, তার লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হয়েছে এবং তার জোট পরিবর্তনপন্থী জোটের চেয়ে এগিয়ে। অন্যদিকে পরিবর্তনপন্থীরা বলতে পারে, আরব দলগুলোসহ নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো সংসদে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ফলে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে নেই।

৭ অক্টোবরের হামলার ক্ষত এখনো তাজা, একই সাথে বিদেশেও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে ইসরাইল। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির প্রয়োজন ছিল শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার। কিন্তু ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের পাঁচটি নির্বাচনের পর যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, আবারো সেই পরিস্থিতি ফিরে এসেছে। সরকার গঠনে কয়েক মাস ধরে জোট আলোচনা চলতে পারে। শেষ পর্যন্ত যে সরকারই গঠিত হোক, শরিকদের সাথে সমঝোতার কারণে তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

সর্বশেষ ধাক্কাটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে জয় পেয়েছে। নতুন নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন মিশিগানের ইসরাইলবিরোধী সিনেটর আবদুল আল-সাইয়্যেদ। ডেমোক্র্যাট দলে ইসরাইলবিরোধী অবস্থান আরো জোরালো হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অস্ত্র বিক্রি, সামরিক সহায়তা এবং ইসরাইল বিষয়ে মার্কিন নীতির ওপর কংগ্রেসের নজরদারির ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে ইসরাইলের জন্য উদ্বেগ শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রিপাবলিকানদের মধ্যেও কেউ কেউ নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করছেন। নিউইয়র্ক পোস্টের এক শিরোনামে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের মিত্ররা রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করছেন। তাদের একজনের মন্তব্য, ‘আশা করি, সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা শুমার নেতানিয়াহুকে ফোন করে ধন্যবাদ জানাবেন।’

মঙ্গলবার এক্সে দেওয়া পোস্টে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এ বিষয়ে একটি জনমত জরিপের কথা তুলে ধরেন। তাতে বলা হয়, ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দেয়া কিছু মানুষ এবার চারটি কারণে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। কারণগুলো হলো ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ, আমেরিকার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং ইসরাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পরিবর্তন।

যুক্তিটি হলো, জ্বালানির দাম বেশি থাকায় রিপাবলিকানরা হেরেছেন। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ওই যুদ্ধে টেনে এনেছেন। তাই দায় ইসরাইলের। রিপাবলিকানরা পরাজয়ের জন্য কাউকে দায়ী করার চেষ্টা করলে এ যুক্তি আরো জোরালোভাবে সামনে আসতে পারে।

আগামী দুই বছর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে থাকবেন। কিন্তু ইসরাইলকে এখন এমন একটি ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে হবে, যেখানে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কেউ কেউ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য ইসরাইলকে দায়ী করছেন।

আগামী ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসের যাত্রা শুরু হবে। তখন পর্যন্ত ইসরাইল সরকার গঠন করতে পারবে কি না, তা অনিশ্চিত। দেশটিতে সরকার গঠন যত দেরি হবে, ওয়াশিংটনে ততই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে তাদের। সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কংগ্রেস যখন আলোচনা শুরু করবে, তখন ইসরাইলের নতুন সরকার আদৌ সেই আলোচনায় শুরু থেকে প্রভাব রাখতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।