
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার (৪ নভেম্বর) আরো জোরালোভাবে গত সপ্তাহের নির্বাচনে বিদেশী হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে ধরলেও দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগ রাজনৈতিক সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরাইলে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনের এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর প্রেসিডেন্ট হারজগ দলগুলোর নেতাদের সাথে আলোচনা শুরু করেছেন।
গভীরভাবে বিভক্ত দেশটিতে সরকার গঠনের জন্য প্রথমে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নাকি তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটকে সুযোগ দেয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি।
একটি প্রধান আরব দলের সমর্থন পাওয়া আইজেনকট প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অংশীদারিত্ব আরো গভীর করার অঙ্গীকার করেছেন।
একইসাথে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন, ‘ইসরাইলের নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে বিদেশী রাষ্ট্রগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে বলে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে।’
আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন নেতানিয়াহু। এসব দল একজোট হলে আইজেনকোটের সরকার গঠনের পথ খুলে যেতে পারে।
নির্বাচনের দিন নগদ অর্থভর্তি খামসহ কয়েকজনকে গ্রেফতারের ঘটনা তুলে ধরেছেন নেতানিয়াহু। কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনাকে স্থানীয় পর্যায়ের বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উল্লেখ করেছে।
নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন, কয়েকজন নেতা কাতারের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন। তার নিজের সহযোগীদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর ১২০ আসনের পার্লামেন্টে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
এ অবস্থায় হারজগ বলেছেন, উভয় পক্ষকেই মেনে নিতে হবে যে ‘সব প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব নয়’। একইসাথে তিনি নতুন নির্বাচন এড়ানোর আহ্বান জানান।
হারজগ বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচনের পর যখন কোনো স্পষ্ট বিজয়ী নেই, তখন আমি সৃজনশীল ও ব্যতিক্রমী চিন্তা, সাহস এবং সদিচ্ছার আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে ইসরাইল রাষ্ট্রই বিজয়ী হয়।’
নির্বাচনে আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর ফিলিস্তিনিদের যারা সেখানে থেকে গিয়েছিলেন, তাদের বংশধররাই দেশটির আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বড় অংশ। নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী সরকারের কঠোর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে তারা প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
কোনো নেতার নাম উল্লেখ না করে সাধারণত আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনকারী প্রেসিডেন্ট হারজগ ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি তার ‘গভীর শ্রদ্ধা’ রয়েছে বলে জানান।
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা যে অশালীন ও বর্ণবাদী বক্তব্য শুনেছি, আমি তার নিন্দা জানাই।’
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অংশীদারিত্ব
নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের বিভাজনমূলক শাসনের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করা সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরাইলের অংশীদারিত্ব ‘নতুন করে গড়ে তোলা ও আরো গভীর’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
একইসাথে দীর্ঘদিন ধরে এ সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে কাজ করা দ্বিদলীয় সমর্থন জোরদারের কথা বলেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলকভাবে কাজ করার প্রত্যাশা করছি। একসাথে আমরা অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থ এগিয়ে নিতে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের সমৃদ্ধির নতুন পথ খুলে দিতে পারি।’
বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তা চলতি বছরের শেষ নাগাদ বন্ধ করতে নেতানিয়াহুর সাথে একমত হওয়ার ট্রাম্পের ঘোষণার পর এ বিষয়ে সমালোচনার মধ্যে আইজেনকোটের এই বক্তব্য এলো।
প্রধান আরব-ইসরাইলি দল রা’আম আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সরকার গঠনের জন্য আইজেনকটকে সমর্থন দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট হারজগের সাথে বৈঠকের আগেই দলটি এ ঘোষণা দেয়।
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সাথে মিলে নেতানিয়াহুকে নতুন যুদ্ধ শুরু না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন আইজেনকোট। তার মতে, এ ধরনের যুদ্ধ নেতানিয়াহুকে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সুযোগ করে দিতে পারে অথবা নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সময়ক্ষেপণের পথ খুলে দিতে পারে।
বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রয়োজনীয়তা আরো জোরালো করেছে।
গাজা যুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় ক্ষোভের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ইসরাইলের প্রতি আরো কঠোর অবস্থান নেয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
বিরোধী জোটের সবচেয়ে বামপন্থী দলটির প্রধান ইয়ার গোলান বলেন, ‘নেতানিয়াহু ও (ইতামার) বেন-গভিরের ক্ষমতায় থাকা অব্যাহত থাকলে ইসরাইল আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংঘাতের পথে যেতে পারে।’
নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ মেলেনি
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জানিয়েছে, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তারা নয় হাজার ৬৯টি ভোটকেন্দ্রের ভোটের হিসাব নিরীক্ষা করেছে। এতে নির্বাচনের ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিদায়ী পার্লামেন্টের গঠন অনুযায়ী প্রতিনিধিত্বকারী নির্বাচন কমিটি ১৫-২ ভোটে ফলাফল অনুমোদন করেছে। তবে ১৪ জন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন।
ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ বাড়ানোর পক্ষে উসকানিমূলক বক্তব্যের জন্য পরিচিত অতি জাতীয়তাবাদী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভির বলেছেন, তার দল নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি। তিনি আরব-ইসরাইলি দলের নেতাদের গ্রেফতারেরও আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসরাইলের কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিদেশী অর্থ গ্রহণের অভিযোগে আরব আইনপ্রণেতা আয়মান ওদেহর বিরুদ্ধে তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ। তিনি বৃহত্তম আরব রাজনৈতিক জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর সদস্য। এক বিবৃতিতে জোটটি এ ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক হয়রানি’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।
আইজেনকোট অভিযোগ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী ইসরাইলের গণতন্ত্রকে ‘দুর্বল করার’ চেষ্টা করছেন এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে জনমনে বিদ্বেষ উসকে দিচ্ছেন।
১৯৯৫ সালে নিহত প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক রবিনের হত্যাকাণ্ডের বার্ষিকী স্মরণ করে আইজেনকোট বলেন, ‘ইসরাইল রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক আচরণের সীমার অনেক বাইরে এক অন্ধকার অতল গহ্বরে টেনে নেয়ার সুযোগ আমরা দেবো না।’
প্রেসিডেন্ট হারজগ প্রাথমিকভাবে দুই দিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করবেন। এরপর সরকার গঠনের জন্য একজন প্রার্থীকে ২৮ দিন সময় দেবেন। প্রয়োজনে এ সময় আরো ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
সূত্র : বাসস
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








