ডা: শফিকুর রহমান, জামায়াতে ইসলামী, ১১ দলীয় ঐক্য
শনিবার রাতে ঝিনাইদহ চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে বক্তব্য প্রদান করছেন জামায়াত আমির। নয়া দিগন্ত

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের দেয়া রায় অগ্রাহ্য করার কোনো অধিকার সরকারের নেই। সংসদ নির্বাচন বৈধ হলে গণভোটের রায়ও মানতে হবে। আর গণভোটের রায় অবৈধ হলে সংসদ নির্বাচনও বৈধ হতে পারে না।

Advertisement

তিনি বলেন, ‘জনগণ বাংলাদেশে একটা পরিবর্তন চেয়েছিল, রাষ্ট্র মেরামত ও সংস্কার চেয়েছিল। আমরা সেই মেরামত এবং রাষ্ট্র সংস্কার চাই। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতেই হবে। আমরা সরকারকে বলছি, দেশের জন্য কাজ করুন, আমরা সহযোগিতা করব। কিন্তু জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলে তা মেনে নেয়া হবে না। সরকারকে জনগণের দাবি মানতে বাধ্য করব, ইনশাআল্লাহ।’

শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৯টায় ঝিনাইদহ চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা চাই না দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হোক। এখন পর্যন্ত কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকার দাবি মেনে নিলে কোনো সঙ্ঘাতের প্রয়োজন হবে না। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হব।’

আরো পড়ুন—৫৬ বছর বয়সে বিয়ে করলেন কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী, পাত্রী সাংবাদিক

পথসভায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, সরকার আসবে, সরকার যাবে। কিন্তু আমরা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে চাঁদাবাজি, মাস্তানি, দুর্নীতি ও জবরদখল থাকবে না। দেশে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদায়ন করা হবে। দলীয় বিবেচনায় কাউকে নিয়োগ দেয়া হবে না এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করা হবে না।

বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার দেশকে একদলীয় ও বাকশালী শাসনব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নে অদক্ষ, অযোগ্য ও অকর্মণ্য ব্যক্তিদের পদায়ন করা হয়েছে। সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও অনেক ঋণখেলাপি রয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব কারণেই দেশের বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন এলডিপি চেয়ারম্যান।

যোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে অলি আহমদ বলেন, ‘আমরা চাই না পঞ্চম শ্রেণি পাস করা কেউ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কিংবা অষ্টম শ্রেণি পাস করা কেউ সংসদ সদস্য হোক। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে।’

জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নকাজের জন্য জমি অধিগ্রহণে তাদের আপত্তি নেই। তবে অধিগ্রহণ করা জমির জন্য বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ২০১৮ সালের মূল্য ধরে এখন ক্ষতিপূরণ দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। কোনোভাবেই মানুষের ওপর জুলুম করা যাবে না।

তিনি আরো বলেন, আমরা কোনো দেশ বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নই; বরং জনগণের ওপর জুলুম বন্ধ, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সব ধর্মের মানুষের সমানভাবে বসবাস নিশ্চিত করতে চাই। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশকে সঠিক পথে পরিচালনার দায়িত্ব পালনে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

একই পথসভায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের দাবি মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘গণভোটের গণরায় না মেনে যে সঙ্কটকে আপনারা রাজপথে ঠেলে দিচ্ছেন, নিশ্চিত এই সঙ্কট একটি রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের জন্ম দিতে পারে। তার আগে সংসদে বিরোধী দলকে আপনারা আহ্বান জানান যে—আসুন, আমরা একসাথে বসে কিভাবে সংবিধান সংস্কার করা যায়, তার পথ বের করি।’

তিনি জানান, সংসদে সমাধান না হলে তারা রাজপথে যেতে বাধ্য হবেন এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায় করবেন।

নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল হান্নান মাসউদ বিএনপির অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সেই বিএনপির কথা বলছি, যারা ২০১৮ সালের রাতের ভোটে অংশগ্রহণ করে ভোট কারচুপি হতে পারে বলেও নির্লজ্জের মতো সংসদে গিয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপি শক্তিশালী সংগঠন ও বিপুলসংখ্যক নেতা থাকা সত্ত্বেও দলটির নেতৃত্বের ওপর চাপের সময় তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। অথচ এখন তারা বিরোধী দলকে হুমকি দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সিন্ডিকেটের অভিযোগ তুলে হান্নান মাসুদ বলেন, চাল, ডাল ও মাছসহ বিভিন্ন পণ্যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। জনগণের কাঁধে বিভিন্ন কার্ডের বোঝা চাপানো হলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। সরকারকে দেশের জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যায় হলে তারা প্রতিবাদ করবেন।

পথসভায় ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার এবং সাত দফা দাবি মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। দাবি আদায় না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তারা।