হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা
হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করছেন জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান, এমপি। নয়া দিগন্ত

ছোটখাটো মতভিন্নতা দূরে রেখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কোরআন ও রাসুলুল্লাহ সা:-এর সুন্নাহর আলোকে সমাজ গঠনে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান, এমপি। 

Advertisement

তিনি বলেন, ‘মহান আল্লাহ তায়ালা এই কোরআন যাদের বুকের মধ্যে ধারণ করার শক্তি দিয়েছেন, তারা যেন কোরআনের শিক্ষাকে সমাজে বাস্তবায়নের জন্য নেতৃত্ব দিতে পারেন। আমরা মেহরাব থেকে নেতৃত্বের আসনে আপনাদের দেখতে চাই।’

Jamaat-Amir2

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নগর উন্নয়ন ফোরামের উদ্যোগে এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতায় ৫ মাসব্যাপী আয়োজিত ‘হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনাল ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।

রাজধানীর মিরপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। 

অনুষ্ঠানে দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ, বিশিষ্ট আলেম-ওলামা, হাফেজে কোরআন, প্রতিযোগী ও তাদের অভিভাবকেরা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব অর্জনকারী প্রতিযোগীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের বিরল আয়োজন আগে কোথাও হয়নি।’ এ আয়োজন বাস্তবায়নে নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান সেলিম উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

প্রতিযোগিতায় ১০ পারায় প্রথম স্থান অর্জনকারী ছোট্ট রিদওয়ান বিন আলীকে অভিনন্দন জানিয়ে জামায়াত আমির ঘোষণা করেন, তার বাবা, মা ও উস্তাদকে আমার পক্ষ থেকে ওমরাহ করানো হবে, ইনশাআল্লাহ।

এ সময় ঢাকা মহানগরী উত্তরের জনপদের জন্য মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে আল্লাহ যেন কবুল করেন এবং তাকে সেই তাওফিক দান করেন—এ দোয়া করেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, এমপি বলেন, ‘এ আয়োজনে অংশগ্রহণ করতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। পবিত্র আল-কোরআন সমগ্র মুসলিম জাতির জীবনবিধান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার হাফেজে কোরআন তৈরি হচ্ছেন। আলহামদুলিল্লাহ।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, এমপি বলেন, ‘আজ একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কোরআনকে যারা সংরক্ষণ করেন, তাদের নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ মাসব্যাপী কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ আয়োজন নতুন একটি সূচনা সৃষ্টি করেছে।’ 

তিনি বলেন, ‘কিয়ামত পর্যন্ত কেউ আল-কোরআনকে মুছে ফেলতে পারবে না। এটি মহান আল্লাহর বাণী এবং তিনিই এর সংরক্ষক।’

কোরআনের শিক্ষার আলোকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘কোরআনের শিক্ষা সমাজে প্রতিষ্ঠার জন্য হাফেজদের প্রস্তুত করতে হবে। ভবিষ্যতে আলেমরা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে ভূমিকা রাখবেন’ উল্লেখ করে তিনি এ আয়োজনের বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা পুরস্কার দেয়ার আর নেয়ার জন্য আজ এখানে আসিনি। আমরা এসেছি কোরআনের আলোয় সমাজকে আলোকিত করতে এবং সমাজে কোরআনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করতে।’ 

তিনি বলেন, ‘কোরআনকে ধারণ করে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দাঈ ইলাল্লাহর দায়িত্ব পালন করবেন হাফেজে কোরআনরা—এটাই তাদের প্রত্যাশা।’ মতামতের ক্ষেত্রে বিভেদ থাকলেও পবিত্র কোরআনের প্রশ্নে সবাই এক ও অভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কোরআন প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’

সেলিম উদ্দিন আরো বলেন, ‘পাঁচ মাসব্যাপী এ প্রতিযোগিতায় আট শতাধিক কওমি ও আলিয়া মাদরাসার লক্ষাধিক হাফেজ অংশগ্রহণ করেছেন। কওমি, আলিয়া কিংবা অন্য কোনো নেসাব ও পরিচয়ের ভিন্নতা থাকলেও পবিত্র কোরআনের প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ। কোরআনের শিক্ষা ও আদর্শ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা করে একটি আদর্শভিত্তিক, ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা যায়নুল আবেদীন বলেন, ‘যারা কোরআনকে জানেন, কোরআনকে মানেন এবং কোরআনের সব হুকুম-আহকাম মেনে চলেন, তাদের সম্মানিত করতে হবে। এই সমাজকে কোরআনের আলোয় আলোকিত করতে হবে, ইনশাআল্লাহ।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মুফতি আলী হাসান ওসামা বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে আজকের আয়োজন যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, ইনশাআল্লাহ।’ 

তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, দেশে হাফেজ ও আলেমদের কদর বাড়ছে।’ এ প্রতিযোগিতার আয়োজক ও পৃষ্ঠপোষক নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। 

তিনি আরো বলেন, ‘এ আয়োজনের সার্থকতা তখনই আসবে, যখন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, জাতীয় মসজিদের নেতৃত্বসহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে হাফেজ ও আলেমরা দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।’

প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক হুফফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শায়েখ হাফেজ আব্দুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক প্রতিযোগিতার আয়োজন হলেও নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের উদ্যোগে পাঁচ মাসব্যাপী এ কোরআন প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।’

নগর উন্নয়ন ফোরামের সদস্য সচিব, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম এবং হাফেজ খালিদ সাইফুল্লাহ বকসির সঞ্চালনায় এতে আরো বক্তৃতা করেন ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা, কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন, এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, নাজিম উদ্দীন মোল্লা, ডা: ফখরুদ্দিন মানিক, ইয়াসিন আরাফাত প্রমুখ।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ১৬ জুলাই শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতায় ঢাকার ৮০০টি মাদরাসার প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। প্রতিযোগিতাটি পবিত্র কোরআনের ১০, ২০ ও ৩০ পারা—এই তিনটি পৃথক ক্যাটাগরিতে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি ক্যাটাগরি থেকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী তিনজন করে মোট ৯ জনসহ মোট ২৪৩ জন প্রতিযোগীকে বিজয়ী নির্বাচিত করে পুরস্কার বিতরণ করা হয়েছে।

আয়োজকরা আরো জানান, পবিত্র কোরআনের হিফজ চর্চায় উৎসাহ প্রদান, হাফেজে কোরআনদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ এবং কোরআনের শিক্ষা ও আদর্শ সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কোরআন মুখস্থ করা, শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করা এবং কোরআন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।

প্রতিযোগিতার পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, বিজয়ীদের মধ্যে ওমরাহ পালনের সুযোগ, ল্যাপটপ, সাইকেল ও অর্ধকোটি নগদ অর্থসহ বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণ করা হয়। চূড়ান্ত মূল্যায়ন ও পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে পাঁচ মাসব্যাপী এ আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।