
অবশেষে থেমে গেলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। বিদায় বলে দিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলকে। পর্তুগালের জার্সিতে ২৩ বছরের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অধ্যায়ের ইতি টানলেন মিনিট পাঁচেকের ছোট্ট একটি ভিডিওতে। জানিয়ে দিলেন, জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামবেন না তিনি, পর্তুগিজ জার্সিতে আর কখনোই দেখা যাবে না তাকে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন রোনালদো। পর্তুগালের ৭ নম্বর জার্সি ফিরিয়ে দেয়ার সময় হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কখনো মনে করিনি জার্সিটি শুধু আমারই। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, রক্ষা করার ও বিশ্বের নানা প্রান্তের মাঠে প্রতিনিধিত্ব করার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব পেয়েছি।’
অথচ বিদায়টা অন্যভাবেও হতে পারতো। দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসির মতোই হয়তো রাজসিক বিদায় পেতে পারতেন তিনিও। কিন্তু বরাবরের মতোই সে সব রীতিনীতির ধার ধারলেন না তিনি, আপোষ করলেন না নিজের সাথে। দূর থেকেই বলে দিলেন বিদায়। হয়তো নীরব অভিমানেই আর জাতীয় দলে ফিরতে চাইলেন না তিনি।
২০০৩ সালের ২০ আগস্ট কাজাখস্তানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে পর্তুগালের হয়ে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। তখন তার বয়স মাত্র ১৮। আর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলেছেন গত ২৪ সেপ্টেম্বর, উয়েফা নেশনস লিগে ওয়েলসের বিপক্ষে। লিসবনের সেই ম্যাচে ১-০ গোলে জিতেছিল পর্তুগাল।
পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর পরিসংখ্যানই বলে দেয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার অবস্থান কতটা অনন্য। ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন তিনি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ও সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড—দুটিই তার দখলে।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা লিওনেল মেসির চেয়ে রোনালদো ২৬ ম্যাচ বেশি খেলেছেন, গোলও করেছেন ২০টি বেশি। জাতীয় দলের হয়ে ১০টি হ্যাটট্রিকও আছে তার। ২০০৪ থেকে ২০২৬—টানা ২৩টি পঞ্জিকাবর্ষে অন্তত একটি করে আন্তর্জাতিক গোল করেছেন তিনি।
গোলের সংখ্যায় যেমন এগিয়ে, তেমনি বড় টুর্নামেন্টেও রোনালদোর উপস্থিতি ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি—২০০৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিটি আসরেই। ছয়টি বিশ্বকাপেই গোল করা একমাত্র ফুটবলারও রোনালদো। বিশ্বকাপে তার গোল ১১টি।
২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ করেছিলেন চার গোল। তবে বিশ্বকাপের শিরোপা জেতা হয়নি তার। ২০০৬ সালে পর্তুগাল সেমিফাইনালে উঠেছিল, ২০২২ সালে বিদায় নেয় কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। ২০২৬ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতেই থেমেছে তাদের পথ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ না জেতাই তার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ।
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে রোনালদোর অভিষেক ২০০৪ সালে। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত সেই আসরের ফাইনালে গ্রিসের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল পর্তুগাল। এরপর ২০০৮ ও ২০১২ সালে সেমিফাইনাল, ২০১৬ সালে এসে প্রথমবার শিরোপার স্বাদ।
ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে ম্যাচের শুরুতেই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল রোনালদোকে। তবে তার অনুপস্থিতিতেও অতিরিক্ত সময়ে এদেরের গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে প্রথমবার ইউরোপসেরা হয় পর্তুগাল।
ইউরোতে রোনালদোর গোল ১৪টি, যা প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ছয়টি আসরে খেলেছেন তিনি, ফাইনাল পর্বে ম্যাচ খেলেছেন ৩০টি—দুটিই রেকর্ড। ২০১৯ সালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবার নেশনস লিগ জেতে পর্তুগাল।
২০২৫ সালে স্পেনকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতার দলেও ছিলেন অধিনায়ক রোনালদো। নির্ধারিত সময়ে ২-২ গোলে শেষ হওয়া ফাইনালে একটি গোল করেছিলেন তিনি; পরে টাইব্রেকারে জয় পায় পর্তুগাল।
সব মিলিয়ে পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর অর্জনের তালিকায় আছে একটি ইউরো ও দুটি নেশনস লিগ শিরোপা। ব্যক্তিগত রেকর্ডের সংখ্যাও কম নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোল ও ম্যাচ খেলার পাশাপাশি ছয়টি বিশ্বকাপে গোল, ইউরোতে সর্বোচ্চ গোল ও টানা ২৩ বছর গোল করার কীর্তি গড়েছেন তিনি।
পর্তুগালের হয়ে তার শেষ হিসাব এমন—২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোল, ৪৬ অ্যাসিস্ট ও তিনটি আন্তর্জাতিক শিরোপা। জাতীয় দলের হয়ে মাঠে কাটিয়েছেন ১৮ হাজার ৬০৪ মিনিট। আছে ৩২টি হলুদ কার্ড ও একটি লাল কার্ডও দেখেছেন।
সংখ্যাগুলো একদিন অন্য কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড নিয়ে বিদায় নেয়া রোনালদোর ২৩ বছরের ক্যারিয়ার পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।
অবশ্য দেশের জার্সিতে আরো খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল রোনালদোর। কিন্তু কোচ জেজুসের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে গত ফিফা উইন্ডোর মাঝপথে ক্যাম্প ছাড়ার পর বদলে যেতে থাকে সবকিছু। ওই ঘটনার পর, বিশাল এক বার্তায় কোচের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন তিনি।
ক্যাম্প ছাড়ার পর থেকেই জাতীয় দলে রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। নভেম্বরের উইন্ডোতে তিনি ডাক পাবেন কিনা তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে। সেই অপেক্ষা আর করলেন না তিনি। ইতি টেনে দিলেন সব আলোচনার।
জাতীয় দলের হয়ে তার শেষ অধ্যায় শেষ হলেও ক্লাব ফুটবলে খেলা চালিয়ে যাবেন আল নাসরের হয়ে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








