আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংগৃহীত

বাংলাদেশসহ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারিবারিক ভোগব্যয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, বয়স্কদের পেনশন সুবিধা বাড়ানো, আয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা পরিবারকে শর্তসাপেক্ষে নগদ সহায়তা দেয়া এবং শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর মতো সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে মানুষের ভোগব্যয় বাড়বে। একইসাথে এসব উদ্যোগের আর্থিক ব্যয়ও সরকারের জন্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব।

Advertisement

আজ বৃহস্পতিবার আইএমএফের প্রকাশিত ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক- এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ প্রতিবেদনে এ ধরনের সংস্কারের সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিনিয়োগ ও বৈদেশিক চাহিদার বড় ভূমিকা থাকলেও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে পারিবারিক ভোগব্যয় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করতে পরিবারগুলোর আয় ও সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে ভোগব্যয় বাড়াতে দুটি সংস্কার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমটিতে বয়স্ক মানুষের দারিদ্র্যের ঝুঁকি কমাতে সরকারি পেনশন সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে আয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য শর্তসাপেক্ষে নগদ সহায়তা এবং শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

পেনশন বাড়ালে বাড়বে ভোগব্যয়
আইএমএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে অবসরকালীন পেনশনের প্রতিস্থাপন হার বাড়িয়ে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সাথে ব্যবধানের প্রায় অর্ধেক কমানো যেতে পারে। প্রতিস্থাপন হার বলতে অবসরের আগে পাওয়া আয়ের তুলনায় পেনশন থেকে পাওয়া আয়ের অনুপাত বোঝায়। এ সংস্কারের ফলে উদীয়মান এশিয়ার দেশগুলোতে এ হার প্রায় ৫৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।

পাশাপাশি যেসব দেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়লেও কর্মজীবনের তুলনায় অবসরের সময়সীমার ব্যবধান বেশি, সেখানে অবসরের বয়স বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। এসব সংস্কারের অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত কর আদায় এবং সরকারের বিবেচনাধীন ব্যয় কমানোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।

আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, পেনশন সুবিধা বাড়লে মানুষকে বৃদ্ধ বয়সের নিরাপত্তার জন্য আগের মতো বেশি সঞ্চয় করতে হবে না। ফলে ২০১৬ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ভোগব্যয় বছরে গড়ে ০.৫ থেকে ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অবসরের বয়সও বাড়ানো হলে দীর্ঘ সময় কর্মজীবনে থাকার কারণে শ্রম সরবরাহ ও আয় বাড়বে। এতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

এ সংস্কারের আর্থিক ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৪ শতাংশের সমান সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির পর্যায়ে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দেশভেদে এর প্রভাব ভিন্ন হবে।

নগদ সহায়তা ও নারীর কর্মসংস্থানে জোর
দ্বিতীয় সংস্কার পরিস্থিতিতে আয় কমে গেলে যেসব পরিবার দৈনন্দিন ভোগব্যয় ধরে রাখতে সমস্যায় পড়ে, তাদের জন্য শর্তসাপেক্ষে নগদ সহায়তা চালুর কথা বলা হয়েছে। কোনো পরিবারের আয় অর্থনীতির আয়-বণ্টনের নিচের ১৫ শতাংশের সীমার নিচে নেমে গেলে এ কর্মসূচির আওতায় সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ কর্মসূচিতে ব্যয় হতে পারে জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ।

এর পাশাপাশি পুরুষ ও নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ব্যবধান অর্ধেক কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব সংস্কার একসাথে বাস্তবায়ন করা হলে সংস্কার না করার পরিস্থিতির তুলনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উৎপাদন গড়ে ৬.৪ শতাংশ বেশি হতে পারে।

আইএমএফ বলছে, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সাধারণত বাড়তি আয়ের বড় অংশই ভোগব্যয়ে ব্যবহার করে। ফলে তাদের লক্ষ্য করে সহায়তা দেয়া হলে সামগ্রিক চাহিদা বাড়ানোর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশে নারীর কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ থাকায় এ ধরনের সংস্কার থেকে উল্লেখযোগ্য সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বিদ্যমান সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ এবং ব্যয়ের দক্ষতা বাড়িয়ে এসব কর্মসূচির অর্থায়ন করা সম্ভব। অর্থাৎ নতুন কর্মসূচির জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না বাড়িয়ে চলমান ব্যয়ের মধ্যেও অর্থের সংস্থান করা যেতে পারে।

আইএমএফের মতে, এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে শুধু বিনিয়োগ ও রফতানির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। পরিবারগুলোর আয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করাও জরুরি। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে হলে আর্থিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উপযোগী সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।