আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংগৃহীত

বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এ প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি এবং ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়া নতুন অর্থনৈতিক সঙ্কটের ঝুঁকি তৈরি করছে। একইসাথে এআই খাতে প্রত্যাশিত মুনাফা না এলে আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে উন্নয়নশীল দেশগুলো। যাদের বৈদেশিক অর্থায়ন ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এমনিতেই সীমিত বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

Advertisement

বুধবার আইএমএফ প্রকাশিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও আর্থিক স্থিতিশীলতা শীর্ষক প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা ঘিরে প্রকাশিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও আর্থিক স্থিতিশীলতা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকি গুরুত্ব পেয়েছে।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাসের আড়ালে রয়েছে একাধিক অনিশ্চয়তা।

জুবিলি ইউএসএ নেটওয়ার্কের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক এরিক লেকম্পটে বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির সামনে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আশাবাদী। তার মতে, এআই বিনিয়োগ নিয়ে প্রত্যাশা অতিরিক্ত আশাবাদী হলে বিনিয়োগ ও আর্থিক বাজারের পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এআই বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি, কিন্তু বাড়ছে অনিশ্চয়তা
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার এবং ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রযুক্তি খাতের এই সম্প্রসারণ বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও বাণিজ্যে গতি আনছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আইএমএফের উদ্বেগ হলো, এআই খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত আয় ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি না ঘটলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে। তখন প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের মূল্য কমে যাওয়া, বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এআইভিত্তিক প্রবৃদ্ধির সুবিধাও সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল অবকাঠামো রয়েছে- এমন দেশগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছে। বিপরীতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বিনিয়োগের ঘাটতি থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলো পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ঋণের সুদ বাড়লে বাড়বে অর্থায়নের সঙ্কট
বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো সরকারি ঋণ ও ঋণ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে বিনিয়োগকারীরা সরকারকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বেশি সুদ দাবি করলে নতুন ঋণ নেয়া এবং পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন- দুটিই ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এর প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজেটে সরাসরি পড়তে পারে। ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়ে। যেসব দেশের রাজস্ব আয় কম এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি, তাদের পরিস্থিতি আরো কঠিন হতে পারে।

জুবিলি ইউএসএ নেটওয়ার্কের বক্তব্য অনুযায়ী, ঋণবাজারের অস্থিরতা এবং সরকারগুলোর ঋণ গ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধি বর্তমান অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর আর্থিক চাপ আরো বাড়তে পারে।

খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের চাপ
ঋণ ও সুদের পাশাপাশি খাদ্য এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য বিশ্ব অর্থনীতির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়ে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সাথে আয় বৃদ্ধির অসামঞ্জস্য থাকলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। একইসাথে সরকারকে জ্বালানি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতে পারে। অথচ ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়লে এসব কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।

এরিক লেকম্পটের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ ঋণ, মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্য ও জ্বালানির বাড়তি দাম মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি করছে।

বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা
বৈশ্বিক অর্থনীতির এই ঝুঁকিগুলো বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণের সুদ ও পুনঃঅর্থায়ন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি দেশের আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সরকারি বাজেট ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর দিকে নজর দিলেই হবে না; প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াচ্ছে এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা জোরদার করছে- সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
একইসাথে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, সাইবার নিরাপত্তা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতার ঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।

সব মিলিয়ে, ব্যাংককের বার্ষিক সভা ঘিরে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো- এআই বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি করছে, কিন্তু সেই সুযোগকে নিশ্চিত প্রবৃদ্ধি হিসেবে ধরে নেয়ার অবকাশ নেই। ঋণের চাপ, খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং আর্থিক বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ করা না গেলে প্রবৃদ্ধির সুফল সীমিত হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।