
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি দেশে আসতে শুরু করেছে। রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম ফুয়েল অ্যাসেম্বলি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি এখন নির্মাণপর্ব পেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও কমিশনিং পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি পৌঁছানো মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু নয়। প্রথম ইউনিটকে নিরাপদে ক্রিটিক্যালিটিতে নেয়া, জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা এবং ধাপে ধাপে পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতায় নিয়ে যাওয়ার আগে আরো বেশ কিছু কারিগরি ও নিয়ন্ত্রক ধাপ অতিক্রম করতে হবে। সর্বশেষ সরকারি উপস্থাপনা অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটের কমিশনিং অগ্রগতি ৯৮ শতাংশ। ইতোমধ্যে প্রাথমিক কমিশনিংয়ের বড় অংশ শেষ হয়েছে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-সংক্রান্ত ধাপও সম্পন্ন হয়েছে। ফলে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ গ্রিডে দেয়ার প্রস্তুতি এখন অনেকটাই এগিয়ে।
রূপপুরের একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্পে ৯৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এরপর গত দেড় বছরে মোট খরচের আর কোনো হিসাব করা হয়নি। এর মধ্যে রূপপুরের বিদ্যুৎ গ্রিডে সঞ্চালনের কথা থাকলেও ঠিক কবে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে তা কেউ এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না।
এই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, যার লক্ষ্য ছিল দুই ইউনিটে ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন। প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। একই সাথে মোট অনুমোদিত ব্যয় ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে— প্রায় ২৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বেশি। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মতে, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নই ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ; রাশিয়ার সাথে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের মূল চুক্তিমূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, বিপুল ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির পরও বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নিয়মিত সরবরাহে আসছে না কেন। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের সময়ে এ বিলম্বের অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। উৎপাদন পিছিয়ে গেলে প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না, অথচ ঋণের সুদ ও প্রকল্প পরিচালনার ব্যয় চলতেই থাকে। ফলে রূপপুরের বিলম্ব এখন শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয় নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৃত বিদ্যুৎব্যয় এখন প্রাক্কলনের চেয়ে দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শুধু উৎপাদন খরচ দিয়ে নির্ধারণ করলে এর পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। ২০২৬ সালের একটি পিউর-রিভিউড গবেষণায় মূলধন, অর্থায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ডিকমিশনিংসহ জীবনচক্র ব্যয় ধরে গড় এলসিওই প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৮৪ ডলার বা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ১০.৩৪ টাকা/ইউনিট। ব্রেক-ইভেন ব্যয় প্রায় ৯৭ ডলার বা ১১.৯৪ টাকা/ইউনিট। বিপিডিবির প্রাথমিক প্রক্ষেপণ ৬.৭২ টাকা হলেও এতে দীর্ঘমেয়াদি সব ব্যয় পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত নয়। রাশিয়ার ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও এর সুদও গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে সরাসরি উৎপাদন ব্যয় ৪.৩১ টাকা থেকে জীবনচক্র ব্যয় বিবেচনায় প্রকৃত খরচভিত্তিক বাল্ক ট্যারিফ প্রায় ১০ থেকে ১২ টাকা/ইউনিট হতে পারে। তবে এটি প্রাক্কলন, চূড়ান্ত সরকারি ট্যারিফ নয়। যদিও শেষ পর্যন্ত নানা কারণে এটি আরো বেড়ে যেতে পারে।
৩০০ মেগাওয়াট দিয়ে শুরু
রূপপুরের প্রথম ইউনিটের ক্ষেত্রে গ্রিডে বিদ্যুৎ দেয়ার পরিকল্পনাটি একবারে ১২০০ মেগাওয়াটের নয়। সরকারি স্টিয়ারিং কমিটির উপস্থাপনায় ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়ানোর একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেয়া হয়েছে : প্রথমে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াটের প্রাথমিক গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন করা হবে। এরপর প্রায় চার-ছয় সপ্তাহের অনুমানিক সময়ের মধ্যে ক্ষমতা বাড়িয়ে নেয়া হবে। কমিশনিং পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করে শেষ পর্যন্ত ইউনিটটিকে জাতীয় গ্রিডে স্থিতিশীলভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি, ইউনিট-১-এর বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ শেষ হয়েছে এবং ইউনিট-২-এর লাইনের কাজ ২০২৭ সালের মাঝামাঝি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ১২০০ মেগাওয়াটের একটি পারমাণবিক ইউনিটকে হঠাৎ করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যায় না; তাই রিয়্যাক্টর, টারবাইন, প্রোটেকশন সিস্টেম এবং গ্রিডের সমন্বিত স্থিতিশীলতা পরীক্ষার জন্য ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়াতে হয়।
শেষ ধাপে ইউনিট-১ : দ্বিতীয় ইউনিটও পিছিয়ে নেই
সরকারি উপস্থাপনায় ইউনিট-১-এর কমিশনিং প্রক্রিয়াকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে— প্রাক-কমিশনিং, উষ্ণ কমিশনিং, ক্রিটিক্যালিটি ও নিম্নক্ষমতা পরীক্ষা এবং পরিশেষে গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন। প্রথম দু’টি পর্যায় সম্পন্ন হওয়ার পর এখন তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের কাজ চলছে। ফুয়েল লোডিং থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক উৎপাদন পর্যন্ত ধারাটি হলো : জ্বালানি ভর্তি? ক্রিটিক্যালিটি? স্বল্প-ক্ষমতার পরীক্ষা? গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন? বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি ? বাণিজ্যিক কার্যক্রম— এই ধারার কোনো একটি ধাপকে সরাসরি ‘বাণিজ্যিক উৎপাদন’ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
প্রথম ইউনিটের তুলনায় দ্বিতীয় ইউনিট কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও কাজ থেমে নেই। দ্বিতীয় ইউনিটের সিভিল কাজের অগ্রগতি ৯১ শতাংশ এবং ইনস্টলেশন কাজের অগ্রগতি ৮২ শতাংশ। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, ইউনিট-২-এর প্রাথমিক প্রাক-কমিশনিং কার্যক্রম গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে এবং সিস্টেম ও যন্ত্রপাতির পরীক্ষার পরবর্তী সময়সূচি নিয়ে কার্যক্রম চলছে। এর মাধ্যমে নির্মাণ, ইনস্টলেশন, কমিশনিং এবং ট্রান্সমিশন— সব কাজ একই সাথে এগোচ্ছে।
গ্রিড প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা যাচাই
রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নেয়ার জন্য বড় ধরনের ট্রান্সমিশন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে গ্রিড প্রস্তুতির কাজ শুধু লাইন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের সাথে ইন্টিগ্রেশনের কাজ চলছে। ফ্রিকোয়েন্সি কন্ট্রোল, প্রটেকশন সিস্টেম ও ইমার্জেন্সি রেসপন্সের মতো বিষয়গুলো এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি, রূপপুরের কমিশনিং কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তা মানদণ্ডও এখানে সমানভাবে প্রযোজ্য। সরকারি উপস্থাপনায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিশনের সময়সূচি নির্ধারিত রয়েছে : আইএইএ প্রি-ওসার্ট মিশন : আগস্ট ২০২৫; বায়েরা/ভিও নিরাপত্তা/রুশ নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিদর্শন : নভেম্বর ২০২৫; আইএইএ আইপিপিএএস মিশন : নভেম্বর ২০২৫; আইএইএ ইপিআরইভি মিশন : নভেম্বর ২০২৬; আইএইএ আইএনআইআর মিশন পর্যায় ৩ : ডিসেম্বর ২০২৬।
এ ছাড়া রূপপুরের নিরাপদ পরিচালনার জন্য ওয়াটার ইনটেক স্ট্রাকচার এবং নদীর নাব্যতা রক্ষার্থে বিআইডব্লিউটিএ-র সাথেও সমন্বয় করা হচ্ছে।
জনবল ও রাশিয়ার সাথে অপারেশন চুক্তি
পারমাণবিক কেন্দ্র চালুর জন্য দক্ষ জনবল অপরিহার্য। রূপপুরের জন্য ২,৯০০ জন অনুমোদিত জনবলের বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ১,৯২৮ জন কর্মরত আছেন এবং ১,২৯০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল প্রস্তুত রয়েছে। প্রকল্পের নির্মাণপর্বে কর্মী সংখ্যা ২৪ হাজারে দাঁড়ালেও বর্তমানে তা প্রায় ১২ হাজারে নেমে এসেছে, যা নির্মাণ থেকে অপারেশন পর্যায়ে রূপান্তরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
অন্য দিকে কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য রাশিয়ার সাথে তিনটি সার্ভিস চুক্তি প্রস্তাব করা হয়েছে: ১. পরিচলায়ন সহায়তা : অপারেটিং লাইসেন্সের শর্ত পূরণ ও প্রশিক্ষিত অপারেটরের মাধ্যমে প্ল্যান্ট অপারেশন নিশ্চিত করা। ২. রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত : প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সিস্টেমের দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখা। ৩. দীর্ঘমেয়াদি স্পেয়ার পার্টস সরবরাহ : নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন নিশ্চিত করা।
সংশোধিত প্রস্তাবিত প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা (মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা)। তবে রাশিয়ার ঠিকাদারের সাথে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের জেনারেল কন্ট্রাক্ট মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে; মূলত স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণেই হিসাবের এই পরিবর্তন।
রূপপুরের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে তিনটি বিষয় আলাদা রাখা জরুরি— জেনারেল কন্ট্রাক্ট কস্ট, মোট প্রকল্প ব্যয় এবং ঋণের সুদ ও রিপেমেন্টসহ লাইফসাইকেল কস্ট। রুশ ঋণের শর্ত ও রিপেমেন্ট শিডিউল পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি এখন আলোচনায় রয়েছে। কেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার পরপরই ঋণ পরিশোধের বড় চাপ সামনে আসবে।
বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম ও রূপপুরের মূল চ্যালেঞ্জ
বিদ্যুতের সরাসরি জেনারেশন খরচ প্রায় ৪.৩১ টাকা/ইউনিট এবং পিডিবির প্রাথমিক ট্যারিফ প্রজেকশন প্রায় ৬.৭২ টাকা/ইউনিট হলেও, প্রকৃত বাল্ক ট্যারিফে পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, নিউক্লিয়ার ফুয়েল, স্পেয়ার পার্টস, ঋণের সুদ, ইন্স্যুরেন্স এবং ডিকমিশনিংয়ের ব্যয় যুক্ত হবে।
সব মিলিয়ে রূপপুরের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ তিনটি : ১. নিরাপত্তা : ক্রিটিক্যালিটি ও গ্রিড সিনক্রোনাইজেশনের আগে ও পরে সব সেফটি সিস্টেম সফলভাবে পরীক্ষা করা। ২. নির্ভরযোগ্যতা : ৩০০ মেগাওয়াট থেকে ধাপে ধাপে ১২০০ মেগাওয়াটে গিয়ে কেন্দ্রটির স্থিতিশীল অপারেশন নিশ্চিত করা। ৩. অর্থনীতি : প্রকৃত ট্যারিফ, ঋণ পরিশোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি লাইফসাইকেল কস্টের ভারসাম্য রক্ষা করা।
বিদ্যুতের প্রকৃত হিসাবটা কিভাবে দাঁড়ায়?
২০২৬ সালের একটি পিউরিভিউড গবেষণায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দু’টি ভিভিইআর-১২০০ ইউনিটের সব প্রধান ব্যয়ের খাত— মূলধন ব্যয়, অর্থায়ন, স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, পারমাণবিক জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ফি ও ডিকমিশনিং— বিবেচনা করে গড় লেভেলাইজড কস্ট অব ইলেকট্রিসিটি ধরা হয়েছে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৮৪ ডলার। গবেষণায় ব্রেক-ইভেন ট্যারিফ দেখানো হয়েছে প্রায় ৯৭ ডলার প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা ।
১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্কিন ডলারের ভারিত গড় বিনিময় হার ছিল প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ১০ পয়সা। এই হারে হিসাব করলে চিত্রটি দাঁড়ায় এমন :
আর্থিক সূচক ডলারের হিসাব বর্তমান টাকায় রূপান্তরিত
গড় এলসিওই ৮৪ ডলার/মেগাওয়াট ঘণ্টা প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ১০ টাকা ৩৪ পয়সা
ব্রেক-ইভেন লেভেল ৯৭ ডলার/মেগাওয়াট ঘণ্টা প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ১১ টাকা ৯৪ পয়সা
বিপিডিবির প্রাথমিক প্রক্ষেপণ —প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৬ টাকা ৭২ পয়সা
অর্থাৎ, লাইফসাইকেল বা জীবনচক্রের সব ব্যয় যুক্ত করলে একটি বাস্তবসম্মত খরচভিত্তিক বাল্ক ট্যারিফ প্রতি ইউনিটে প্রায় ১০.৩ থেকে ১২.০ টাকার পরিসরে হতে পারে। এটি প্রতিবেদকের নিজস্ব হিসাবভিত্তিক প্রাক্কলন, সরকারের চূড়ান্ত ট্যারিফ নয়।
ঋণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
রাশিয়ার মূল ঋণ প্রায় ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করে। সংশোধিত চুক্তি অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এবং ৩৮টি অর্ধবার্ষিক কিস্তিতে আসল পরিশোধের কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে।
১৯ বছরে সমানভাবে ধরলে শুধু আসলের পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৫৯৯ মিলিয়ন ডলার। ৮৫ শতাংশ ক্যাপাসিটি ফ্যাক্টরে দুই ইউনিটের ২,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা থেকে যদি বছরে প্রায় ১৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তবে কেবল আসলের সমতুল্য চাপই দাঁড়ায় প্রতি ইউনিটে প্রায় ৪ টাকা ১০ পয়সা। এর সাথে অতিরিক্ত যুক্ত হবে সুদের বোঝা।
অবশ্য এই ৪ টাকা ১০ পয়সা সরাসরি ট্যারিফের সাথে সরাসরি যোগ করা যায় না, কারণ এলসিওই পদ্ধতিতে অর্থায়ন ব্যয় কিভাবে গণনা করা হয়েছে এবং ডেট সার্ভিস কিভাবে ট্যারিফে পাস-থ্রু হবে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি হিসাব।
৬.৭২ টাকা থেকে দাম কোথায় গিয়ে ঠেকে?
রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক এর আগে সরাসরি উৎপাদন ব্যয় প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৪ টাকা ৩১ পয়সা উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন যে, ওঅ্যান্ডএম এবং স্পেন্ট ফুয়েল ম্যানেজমেন্টের হিসাব যোগ না করা পর্যন্ত চূড়ান্ত ট্যারিফ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতায় দামের একটি যৌক্তিক স্তরবিন্যাস এমন হতে পারে : ৪.৩১ টাকা : সরাসরি উৎপাদন ব্যয়; ৬.৭২ টাকা: বিপিডিবির প্রাথমিক ট্যারিফ প্রক্ষেপণ; ১০.৩ টাকার আশপাশ : লাইফসাইকেল ব্যয়ের গবেষণাভিত্তিক গড় প্রাক্কলন; ১১.৯ টাকার আশপাশ: ব্রেক-ইভেন ধরনের উচ্চতর ব্যয়ের দৃশ্যপট।
পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য যে, সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী রূপপুরের মোট অনুমোদিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায়, যা মূল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি; আর এই বর্ধিত ব্যয়ের বড় অংশই ঋণনির্ভর।
এতে সার কথা দাঁড়ায়— রূপপুরের চূড়ান্ত বাল্ক ট্যারিফ এখনো নির্ধারিত হয়নি। বিপিডিবির প্রাথমিক হিসাব ৬.৭২ টাকা/ইউনিট হলেও এতে প্রকল্পের পূর্ণ ওঅ্যান্ডএম, নিউক্লিয়ার ফুয়েল, স্পেন্ট-ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো প্রতিফলিত হয়নি। ২০২৬ সালের একটি পিউরিভিউড টেকনো-ইকোনমিক গবেষণায় ক্যাপিটাল, ফাইন্যান্সিং, ওঅ্যান্ডএম, ফুয়েল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডিকমিশনিংসহ লাইফসাইকেল কস্ট ধরে রূপপুরের গড় বিদ্যুৎ ব্যয় ৮৪ ডলার/এমডব্লিউএইচ, অর্থাৎ বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ১০.৩ টাকা/ইউনিট; এবং গবেষণার ব্রেক-ইভেন লেভেল প্রায় ৯৭ ডলার/এমডব্লিউএইচ বা ১১.৯ টাকা/ইউনিট। ফলে প্রকৃত খরচভিত্তিক বাল্ক ট্যারিফ প্রতি ইউনিটে ১০ থেকে ১২ টাকার পরিসরে পড়তে পারে— যদিও এটি সরকারের চূড়ান্ত ট্যারিফ নয়।
রূপপুর প্রকল্প এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোড হওয়া এবং ৯৮ শতাংশ কমিশনিং কাজ শেষ হওয়া একটি বিশাল মাইলফলক। তবে প্রকৃত সাফল্যের পরীক্ষা শুরু হবে যখন কেন্দ্রটি সমস্ত নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিরাপদে ও নিয়মিত জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








