
১৯৯৮ সালে ম্যাকাওয়ের একটি জুয়া কেন্দ্রিক বিনোদন-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অদ্ভুত এক জাহাজ কিনেছিল। সেটি কোনো সাদামাটা জাহাজ নয়। রীতিমত একটি বিমানবাহী রণতরি। সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য তৈরি করার কথা ছিল জাহাজটির। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ইউক্রেনের একটি জাহাজ কারখানায় পড়ে ছিল। পরিত্যক্ত অবস্থায় মরিচা ধরেছিল। নতুন চীনা মালিকদের দাবি, ২ কোটি ডলারে কেনা জাহাজটিকে ভাসমান ক্যাসিনোতে পরিণত করা হবে।
কথাটা আসলে একটি নিছক চাতুরি। ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল ও এনডিটিভি জানায়, তখনো বিমানবাহী রণতরি তৈরি কিংবা পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল না চীনের নৌবাহিনীর। তাই পরিত্যক্ত জাহাজটি দিয়েই শুরু হয় তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার যাত্রা। ভেতরের অনেক সাজ-সরঞ্জাম খুলে ফেলা, মরিচা ধরা এবং দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা জাহাজটিকে কার্যকর বিমানবাহী রণতরিতে রূপান্তর করতে সময় লেগেছিল ১৫ বছর। একই সাথে এর ডেক থেকে কীভাবে যুদ্ধবিমান উড়ানো যায়, সেই কৌশলও আয়ত্ত করতে হয়েছে চীনকে। তখন অনেক সামরিক বিশ্লেষক চীনের এই উদ্যোগ নিয়ে মশকরা করতে ছাড়েনি।
কিন্তু সেই হাসি-মশকরার দিন শেষ। এ সে জায়গায় স্থান করে নিয়েছে উদ্বেগ। চীনের হাতে বর্তমানে তিনটি বিমানবাহী রণতরি। চতুর্থটির নির্মাণকাজ চলছে। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নতুন রণতরিটি হবে পারমাণবিক শক্তিচালিত। সব মিলিয়ে চীনের নৌবাহিনীতে যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাহাজের সংখ্যার হিসাবে চীনের নৌবহর এখন মার্কিন নৌবাহিনীর চেয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ বড়। আধুনিক ইতিহাসে শান্তিকালে কোনো দেশের নৌবাহিনী গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় উদ্যোগগুলোর অন্যতম এটি।
প্রতিদিন চীনের নৌবাহিনীর প্রায় ১০০টি জাহাজ এশিয়ার ব্যস্ততম বাণিজ্য ও নৌপরিবহন পথগুলোতে চলাচল করছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে জাপান ও তাইওয়ানের আশপাশের পানিসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের তৎপরতা। এসব জাহাজ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে নিয়মিত সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। চীনের বড় ও আধুনিক যুদ্ধজাহাজগুলো এমন সব সাগরেও উপস্থিত হচ্ছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নৌবাহিনীর আধিপত্য ছিল। এডেন উপসাগরেও নিয়মিত মোতায়েন করা হচ্ছে চীনা যুদ্ধজাহাজ।
তাইওয়ানের আশপাশের পানিসীমায় চীনা নৌবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন একদল নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তাদের হিসাব অনুযায়ী, যেকোনো সময় সেখানে চীনের প্রায় ছয়টি যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করে। সামরিক মহড়ার সময় এই সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি এর প্রায় তিন গুণ। এ অঞ্চলে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের সাথে চীনের দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়েছে।
চীনের লক্ষ্য শুধু যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বাড়ানো নয়। উপকূলবর্তী পানিসীমায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিতর্কিত ভূখণ্ডের ওপর নিজেদের দাবি জোরদার এবং ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত বাধলে সেখানে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ কঠিন করে তোলাও বেইজিংয়ের পরিকল্পনার অংশ।
সমুদ্রশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে জাহাজ নির্মাণশিল্প
চীনের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে দেশটির বিশাল জাহাজ নির্মাণশিল্প। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ নির্মাতা দেশ চীন প্রতিবছর বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরি করে। বিশাল জাহাজ কারখানাগুলোতে তৈরি হয় প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ থেকে শুরু করে দৈত্যাকার কনটেইনারবাহী জাহাজ। একই শিল্প অবকাঠামো ব্যবহার করে এখন দ্রুতগতিতে তৈরি হচ্ছে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ।
চীনের সমুদ্রশক্তি বৃদ্ধির পেছনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের একটি মৌলিক বিশ্বাস কাজ করছে। তাঁর ধারণা, কোনো দেশের উত্থান-পতনের সাথে সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের তিনি বলেছিলেন, চীনকে একটি ‘সমুদ্রশক্তিতে পরিণত’ হতে হবে।
শি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে সমুদ্রপথ ব্যবহার করে পশ্চিমা দেশগুলো নতুন বাণিজ্যপথ খুলেছে, উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং বিশ্ববাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। চীনের ইতিহাস থেকেও উদাহরণ টেনেছিলেন তিনি। পঞ্চদশ শতকে অ্যাডমিরাল ঝেং হের সমুদ্র অভিযান এবং তাঁর বিশাল নৌবহরের কথা তুলে ধরেন। সেই নৌবহর হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত গিয়ে চীনা পণ্য পৌঁছে দিয়েছিল। আফ্রিকার পূর্ব উপকূল থেকে ফিরেছিল জিরাফসহ নানা সামগ্রী নিয়ে। পরে চীন সমুদ্রাভিযান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বিচ্ছিন্নতার পথে হাঁটে। উনিশ শতকের আফিম যুদ্ধের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন শি। ওই যুদ্ধে পশ্চিমা শক্তিগুলো সমুদ্রপথে এসে চীনে হামলা চালিয়েছিল।
চীনের বাণিজ্যিক সমুদ্রস্বার্থের সাথে সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে একসূত্রে বেঁধেছেন শি। তাঁর সেই পরিকল্পনা এখন বাস্তব রূপ নিচ্ছে। শ্রীলঙ্কা থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিন বা ইসরাইল, পেরু পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বন্দর নির্মাণ ও উন্নয়নে অর্থায়ন করেছে বেইজিং। চীনের উপকূলরক্ষী বাহিনী ও মাছ ধরার নৌবহর বিশ্বের বৃহত্তম। একই সাথে দেশটির গবেষণা জাহাজগুলো মারিয়ানা খাত থেকে শুরু করে উত্তর মেরু পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশ ও পানিসীমা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জরিপ করছে। প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাংশে অবস্থিত পৃথিবীর গভীরতম সামুদ্রিক খাদ মারিয়ানা খাত। এর গভীরতম অংশ প্রায় ১১ হাজার মিটার।
শতাব্দীর পর শতাব্দী চীন ছিল মূলত স্থলভিত্তিক শক্তি। সেই দেশটির হঠাৎ করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমুদ্রশক্তি হয়ে উঠছে। সাথে সাথেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম এসে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান মাইকেল স্টুডেম্যানের মতে, শি জিনপিংয়ের সমুদ্রশক্তি সম্পর্কে ধারণা এক শতাব্দীরও বেশি আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী নৌকৌশলবিদ আলফ্রেড থেয়ার মাহানের চিন্তার সাথে মিলে যায়। ২০২৩ সালে অবসরে যাওয়ার আগে মার্কিন নৌবাহিনীতে ৩৫ বছর কাজ করেছেন স্টুডেম্যান। তাঁর ভাষায়, ‘সম্ভবত থিওডোর রুজভেল্টের পর যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো নেতার চেয়ে শি জিনপিংয়ের চিন্তাভাবনা মাহানের ধারণার বেশি কাছাকাছি। ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত প্রতিটি বৃহৎ শক্তিকেই বৈশ্বিক সমুদ্রশক্তি হয়ে উঠতে হয়।’
স্টুডেম্যান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন এক ধরনের ‘সমুদ্রবিমুখতায়’ ভুগছে। দেশটি নৌসামরিক শক্তি হলেও প্রকৃত অর্থে আর সমুদ্রশক্তি নয়। বর্তমানে মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজে খুব সামান্য পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়। দুর্বল হয়ে পড়েছে দেশটির জাহাজ নির্মাণশিল্প। গভীর সমুদ্রে চলাচল করতে পারে, এমন বাণিজ্যিক জাহাজও খুব কম তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ২৯০টি জাহাজের নৌবহর সম্প্রসারণেও হিমশিম খাচ্ছে দেশটি। নতুন ফ্রিগেট নির্মাণ, পুরোনো ক্রুজারগুলোর আয়ু বাড়ানো এবং উপকূলীয় যুদ্ধজাহাজের বড় বহর পরিচালনার একাধিক পরিকল্পনা বাধার মুখে পড়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে জাহাজ নির্মাণের বাজেট দ্বিগুণ হলেও ২০০৩ সালের তুলনায় এখন যুক্তরাষ্ট্রের নৌযুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বাড়েনি। অথচ এ সময়ে প্রতিপক্ষ দেশগুলো তীব্র গতিতে নৌবহর গড়ে তুলেছে। কয়েক প্রজন্মে এমন গতি দেখা যায়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, চীনের দ্রুত নৌবাহিনী সম্প্রসারণ বেইজিংয়ের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে। সামুদ্রিক সক্ষমতা ব্যবহার করে চীন সামরিক শক্তি প্রদর্শন, বিস্তৃত ভূখণ্ডগত দাবি প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিবেশীদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তবে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা এবং মিত্র ও অংশীদারদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ওয়াশিংটন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা ফিরিয়ে আনছে। একই সাথে কর্মীদের প্রশিক্ষণব্যবস্থায় সংস্কার এবং অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ দূর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো করে এর আগে আর কোনো প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্য পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেননি।’ চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
বড়, দ্রুততর, শক্তিশালী
চীনের নৌবাহিনী শুধু আকারেই বাড়ছে না, তাদের অভিযান ও প্রশিক্ষণের পরিধিও নজিরবিহীনভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। গত বছরের শুরুর দিকে চীনা যুদ্ধজাহাজ জুনই অস্ট্রেলিয়াকে ঘিরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। চীনের উপকূল থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মাইল দূরে সরাসরি গোলাবর্ষণের মহড়াও চালায় জাহাজটি। এতে বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের পথ পরিবর্তন করতে হয়েছিল। কয়েক মাস পর ১৩ হাজার টন ওজনের জাহাজটি বিমানবাহী রণতরির একটি বহরের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক মহড়ায় অংশ নেয়। সমুদ্রে ২০০ দিন কাটিয়ে এবং ৫০ হাজার নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডুবোজাহাজ শিকারের অনুশীলনে নামে সেটি।
জুনইয়ের মতো যুদ্ধজাহাজগুলো বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক নৌযানের মধ্যে পড়ে। চীনের লক্ষ্য এমন একটি ‘ব্লু ওয়াটার নেভি’ গড়ে তোলা, যা নিজ দেশের উপকূল থেকে বহু দূরে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে এবং বিদেশে থাকা স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। চীন এসব জাহাজকে ডেস্ট্রয়ার বা বিধ্বংসী জাহাজ হিসেবে দাবি করে। কিন্তু আকার ও অস্ত্রসজ্জার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এগুলোকে গাইডেড মিসাইল ক্রুজারের কাতারে ফেলছে।
২০২০ সালে প্রথম জাহাজটি নৌবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পর দ্রুত একই শ্রেণির আরো নয়টি জাহাজ তৈরি করেছে চীন। গত ডিসেম্বরে এ ধরনের একটি জাহাজ চারটি যুদ্ধজাহাজের বহরের অংশ হিসেবে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে যায়। ওই বহরে ছিল ৩৫ হাজার টন ওজনের একটি বিশাল উভচর আক্রমণকারী জাহাজ, যাতে ৩০টি হেলিকপ্টার বহন করা যায়। চীনা জাহাজগুলোর গতিবিধি নজরে রাখতে অস্ট্রেলিয়া একটি টহল বিমান পাঠায়।
মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ডুবোজাহাজ কর্মকর্তা ও সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ গবেষক টমাস শুগার্ট বলেন, ‘তারা মুঠোভর্তি ছোট ছোট করভেট তৈরি করছে না। তারা বিশ্বমানের একটি নৌবাহিনী গড়ে তুলছে।’
মোট ওজনের হিসাবে এখনো মার্কিন নৌবাহিনী এগিয়ে। অর্থাৎ গড়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো চীনা জাহাজের চেয়ে বড়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন আরো বড় ও উন্নত যুদ্ধজাহাজ ধারাবাহিকভাবে তৈরি শুরু করেছে। বিপুল সংখ্যায় নির্মাণাদেশ দিচ্ছে এবং দ্রুত কাজ শেষ করছে। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের দেখা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চীন ৭১টি বড় যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজ নৌবহরে যুক্ত করেছে। এর মধ্যে শুধু গত বছরই যুক্ত হয়েছে ১৯টি।
সাংহাইয়ের বিপরীতে ছাংসিং দ্বীপে পাশাপাশি অবস্থিত দুটি বিশাল জাহাজ কারখানায় তৈরি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ ও বড় কনটেইনারবাহী জাহাজ। একই কারখানায় তৈরি হচ্ছে চীনের নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজও। চলতি বছরের মে মাসের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একই সময়ে সেখানে দুটি উভচর জাহাজ, দুটি ক্রুজার, তিনটি ডেস্ট্রয়ার, দুটি ফ্রিগেট এবং আরো কয়েকটি ছোট যুদ্ধজাহাজ বানানোর কিংবা মেরামতের কাজ চলছিল।
মাত্র পাঁচ বছর আগেও দ্বীপটির যে অংশে এখন এসব জাহাজ তৈরি হচ্ছে, সেখানে ছিল খোলা মাঠ। নতুন একটি জাহাজ কারখানার নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরপরই ২০২৩ সালে সেখানে শুরু হয় বিশ্বের বৃহত্তম উভচর আক্রমণকারী জাহাজগুলোর একটি সিচুয়ানের নির্মাণ। ৪০ হাজার টন ওজনের জাহাজটিকে বলা হচ্ছে ‘ড্রোনবাহী রণতরি’। চীনের নৌবাহিনী এর মাত্র দুই বছর আগে যে উভচর জাহাজগুলো হাতে পেয়েছিল, সেগুলোর চেয়ে সিচুয়ান অনেক বড় ও উন্নত। এ কারণে জাহাজটির আবির্ভাব সামরিক বিশ্লেষকদের বিস্মিত করেছিল।
এরপর চলতি বছরের জুনে ছাংসিং দ্বীপের জিয়াংনান জাহাজ কারখানায় দেখা যায় আরো বড় চমক। সেখানে নতুন ধরনের একটি ডুবোজাহাজের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, যেটি সম্ভবত পারমাণবিক শক্তিচালিত। শুগার্ট বলেন, ‘আমরা সবাই কমবেশি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।’ এত দিন জিয়াংনান কারখানাটি পারমাণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ তৈরির জন্য পরিচিত ছিল না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, নীরবে এই দায়িত্বও কারখানাটিকে দেয়া হয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, চীনের জাহাজ কারখানাগুলোর সম্প্রসারণ দেশটির ডুবোজাহাজ উৎপাদন সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সাথে ডিজেল-বিদ্যুৎচালিত ডুবোজাহাজ থেকে পারমাণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজের দিকে ঝুঁকছে বেইজিং। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ২০৪০ সালের মধ্যে চীনা ডুবোজাহাজগুলো নিয়মিত ভারত মহাসাগর, উত্তর মেরু অঞ্চলের প্রবেশপথ এবং সম্ভবত আটলান্টিক মহাসাগরেও চলাচল করবে।
বিমানবাহী রণতরির বহরেও এগোচ্ছে চীন
ওয়াশিংটনের ধারণা, বিমানবাহী রণতরি নির্মাণেও বড় ধরনের সম্প্রসারণের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে চীন। পেন্টাগনের গত বছরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটির বিমানবাহী রণতরির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে নয়টিতে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি রণতরির বহরের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে চীন। ওই সময়ের মধ্যে মার্কিন রণতরির সংখ্যা বাড়বে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। যে দেশ দুই দশক আগেও কোনো বিমানবাহী রণতরি পরিচালনা করত না, তার জন্য এমন অগ্রগতি বিস্ময়কর।
২০০০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি পরিদর্শনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল চীনা সামরিক প্রতিনিধিদলকে। প্রতিটি দলে ছয় থেকে ১০ জন কর্মকর্তা থাকতেন। তাঁরা জাহাজের বিভিন্ন ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, তা খুঁটিয়ে দেখতেন এবং নানা প্রশ্ন করতেন। স্টুডেম্যানের স্মৃতিচারণ, ‘তখন আমাদের ধারণা ছিল, নিজেদের সক্ষমতা দেখাতে পারলে তারা ভয় পাবে এবং কখনো আমাদের চ্যালেঞ্জ করার কথা ভাববে না।’ কিন্তু তিনি ওই সফরের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর মতে, ‘তারা আসলে শিখছিল, আমরা কীভাবে বিমানবাহী রণতরি পরিচালনা করি, যাতে নিজেরাও একই কাজ করতে পারে।’
বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় এখনো যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের মানদণ্ড। তবে চীনের রণতরিগুলোর অভিযান ক্রমেই দূরবর্তী সমুদ্রের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজরদারিতে পাওয়া এবং ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের হাতে আসা জাহাজ চলাচলের তথ্যেও এ কথাই স্পষ্টহয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের জুনে চীনের একটি বিমানবাহী রণতরি কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে জাপানের পূর্ব দিকের সমুদ্রে ঢোকে। সেখানে চীনের দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরির বহরের সাথে মুখোমুখি অবস্থানে থেকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মহড়া চালায়। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তৃত এলাকায় একই সময়ে দুটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর ঘটনা ছিল সেটিই প্রথম। একটি রণতরি থেকে উড্ডয়ন করা জে-১৫ যুদ্ধবিমান ৪০ মিনিট ধরে জাপানের একটি টহল জাহাজকে অনুসরণ করে। একপর্যায়ে দুই যানের মধ্যে আড়াআড়ি দূরত্ব কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৫০ ফুটে।
গত বছরই প্রথমবারের মতো চীনের একটি বিমানবাহী রণতরি প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জের এমন একটি সীমা অতিক্রম করে, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি গুয়াম। রণতরির ডেক থেকে শত শতবার যুদ্ধবিমান ওঠানামার অনুশীলন চলছে। প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, ‘টপ গান’ চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরা নাবিকেরা হাতের ইশারায় যুদ্ধবিমানকে ওড়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।
নভেম্বরে চীনের সর্বশেষ বিমানবাহী রণতরি ফুজিয়ান নৌবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পর দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘তিন রণতরির যুগ’ শুরু হওয়ার ঘোষণা দেয়। একে বৈশ্বিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফুজিয়ানে রয়েছে যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের জন্য তড়িৎচৌম্বকীয় ক্যাটাপল্ট ব্যবস্থা। ক্যাটাপল্ট হলো রণতরির ডেকের ওপর বসানো বিশেষ উৎক্ষেপণযন্ত্র। অনেকটা গুলতির মতো কাজ করে এটি। তবে গুলতির বদলে এখানে শক্তিশালী তড়িৎচৌম্বকীয় শক্তি ব্যবহার করে যুদ্ধবিমানকে ডেকের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে সামনে ঠেলে দেয়া হয়। ফলে অল্প জায়গা থেকেই বিমানটি প্রয়োজনীয় গতি অর্জন করে আকাশে উড়তে পারে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কোনো দেশের বিমানবাহী রণতরিতে এই প্রযুক্তি ছিল না। অথচ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন নৌবাহিনীকে ভবিষ্যতের বিমানবাহী রণতরিতে এই ব্যবস্থা বাদ দিয়ে পুরোনো বাষ্পচালিত ক্যাটাপল্টে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে এমন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছেন।
চীনের এই দ্রুত উত্থান এখন শুধু নৌবহরের আকারের প্রতিযোগিতা নয়; প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্যের প্রশ্নেও নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। হলুদ সাগর থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পানিসীমা এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যপথগুলো এ অঞ্চলে অবস্থিত। চীন এসব পানিসীমায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একই সাথে তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং কোনো সংঘাতের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ কঠিন করে তোলাও তাদের লক্ষ্য।
ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য ঠিক উল্টো। এই পানিসীমায় চীন যেন একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। অঞ্চলটির গুরুত্ব আরো বেড়েছে জাপান, তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের মতো মার্কিন মিত্র ও অংশীদারদের অবস্থানের কারণে। সামরিক কৌশলবিদেরা এসব দ্বীপ ও ভূখণ্ডকে একত্রে ‘প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল’ বলে থাকেন। চীনকে মোকাবিলার পেন্টাগনের কৌশলে এই দ্বীপশৃঙ্খল সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বেইজিং এ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি ক্রমাগত বাড়াচ্ছে। শুধু যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা নয়, বড় বড় নৌবহর একসাথে পরিচালনা ও প্রশিক্ষণের সক্ষমতাও বাড়ছে। ফলে বিতর্কিত পানিসীমায় টহল দেয়া, প্রতিবেশীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি নেয়ার ক্ষেত্রে চীনের হাতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিকল্প। যে দেশ একসময় বিমানবাহী রণতরি কেনার কথা বলে ক্যাসিনো বানানোর গল্প শুনিয়েছিল, সেই দেশই এখন সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








