
প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত মহাকবি হোমারকে ঘিরে রহস্যের শেষ নেই। ধারণা, খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকের দিকে তিনি বেঁচে ছিলেন। তাঁর জীবনের অনেক তথ্যই রহস্যের ঘেরাটোপে বন্দি। এমনকি তিনি দৃষ্টিহীন ছিলেন কি না, তা নিয়েও তর্ক চলছেই। তাঁর অমর দুই মহাকাব্য ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডেসি’। তুরস্কের ইজমিরের কাছে একটি পাহাড়ি গুহাকে ঘিরে বহুদিন ধরে ধারণা প্রচলিত আছে, এখানেই নাকি ‘ওডেসি’ লিখেছিলেন হোমার।
পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন বুধবার (৭ অক্টোবর) জানায়, ইজমিরের বাইরে জলপাইগাছে ঢাকা পাহাড়ের ঢালে সেই গুহাটি আজও আছে। স্থানীয়রা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জায়গাটিকে ‘হোমারের উপত্যকা’ হিসেবে চেনে। তুরস্কের গবেষক আলতান আলতিন বলেন, দূরদূরান্তের মানুষ এই গুহা দেখতে আসেন। তাঁদের বিশ্বাস, এখানেই হোমার তাঁর কাহিনি লিখেছিলেন।
‘ওডেসি’ মূলত ‘ইলিয়াড’-এর ট্রয় যুদ্ধের পরের গল্প। ট্রয় ধ্বংসের পর গ্রিক বীর ওডিসিউস স্ত্রী পেনিলোপি ও ছেলে টেলেমেকাসের কাছে নিজের রাজ্য ইথাকায় ফেরার বাসনা জাগে। কিন্তু ট্রয় যুদ্ধে গ্রিকদের আচরণে সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন ক্ষুব্ধ হওয়ায় তাঁর সেই ফেরার পথ সহজ হয়নি। একচোখা দানব সাইক্লপসের সাথে লড়াই, মোহিনী ডাইনি সার্স ও জলপরী ক্যালিপসোর দ্বীপে আটকে পড়া এবং ভয়ংকর সামুদ্রিক দানব সিলা ও ক্যারিবডিসের মুখোমুখি হওয়ার পর একসময় সঙ্গীদেরও হারান তিনি। এথেনার সহায়তায় ছদ্মবেশে ইথাকায় ফিরে পরিবার ও রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। এর মধ্যে চলে গেছে ২০টি বছর।
তবে হোমার ঠিক কোথায় এই মহাকাব্যগুলো লিখেছিলেন, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। গুহাটিকে ঘিরে তাই কিংবদন্তিই বেশি। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডেসি’ সিনেমা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ায় সেই পুরোনো বিতর্কও আবার সামনে এসেছে।
হোমারের সাথে তুরস্কের এজিয়ান উপকূলের ইজমির অঞ্চলটির সম্পর্ক বহু পুরোনো। প্রাচীনকালে অঞ্চলটি স্মিরনা নামে পরিচিত ছিল। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের গ্রিক ইতিহাসবিদ ও ভূগোলবিদ পৌসানিয়াস লিখেছিলেন, স্মিরনার মেলেস নদীর উৎসমুখে একটি গুহা আছে, যেখানে হোমার তাঁর কবিতা রচনা করেছিলেন বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। তাঁর সেই লেখা থেকেই হোমারের জন্মস্থান ও সেই নদীর অবস্থান নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তর্কাতর্কি চলছে।
তুরস্কের বর্নোভা এলাকার সেই গুহায় যাওয়া সহজ নয়। ভেতরের দেয়ালে গ্রিক ভাষায় কিছু লেখা দেখা যায়। তবে সেগুলো কত পুরোনো, তা নিশ্চিত নয়। গ্রিক দ্বীপ খিওসও হোমারের জন্মস্থান বলে দাবি করে। কিন্তু বর্নোভা ও প্রাচীন স্মিরনা এখনো তাঁর সাথে গভীরভাবে যুক্ত।
গবেষক আলতিনের দাবি, হোমার বর্নোভারই মানুষ। তাঁর মতে, তিনি অন্তত আইওনিয়া অঞ্চলের মানুষ ছিলেন। তৃতীয় খ্রিস্টপূর্ব শতকের একটি ভাস্কর্যেও হোমারের দেবত্ব লাভের দৃশ্য রয়েছে। আলতিনের দাবি, সেখানে বর্নোভার গুহাটির সাথে আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়।
প্রত্নতাত্ত্বিক মেহমেত আকিফ এরদেমও বলেন, খননকাজে পাওয়া হোমারের প্রতিকৃতিযুক্ত মুদ্রা থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন স্মিরনার মানুষ তাঁকে নিজেদেরই একজন মনে করতেন। ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডেসি’তে ব্যবহৃত প্রাচীন গ্রিকের আইওনিক ও এওলিক উপভাষার সাথেও এই অঞ্চলের যোগ আছে।
বর্নোভায় এখন হোমারের উপস্থিতি সর্বত্র। ইয়েশিলোভা হোয়ুক নামের প্রাচীন বসতিতে তাঁর আবক্ষ মূর্তির নিচে লেখা, ‘এই ভূমিতে আমি ইলিয়াড ও ওডেসি মহাকাব্য সংকলন করেছি। আমি বর্নোভায় বসবাস করেছি।’
হোমারকে ঘিরে বইমেলাও হয় সেখানে। স্থানীয় একটি পার্কে ট্রয় যুদ্ধের বীর হেক্টরের মূর্তিও রয়েছে। নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ায় গুহাটি সংস্কার করে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়ার পরিকল্পনা করছে বর্নোভা পৌরসভা।
মেয়র ওমের এসকি বলেন, ‘হোমারের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা মানবতার প্রতি আমাদের দায়িত্ব। তিনি সাহিত্যের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।’ তাঁর কথায়, হোমারের গল্প এই ভূখণ্ডেরই গল্প। তাই হোমারকে নিজেদের বলে দাবি করা উচিত কি না, প্রশ্নটি তাঁর কাছে মুখ্য নয়। ‘তাঁর গল্পও আমাদের গল্প।’
তবে সবাই একমত নন। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়্যব এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন একেপি দলের পৌর কর্মকর্তারা হোমারের উপত্যকার নাম বদলে একজন তুর্কি যোদ্ধার নামে রাখার প্রস্তাব দেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, জায়গাটির নাম গ্রিক হওয়া উচিত নয়। এর জবাবে মেয়র বলেন, ‘বর্নোভায় হোমারের নাম মুছে ফেলা সবচেয়ে বাজে কাজগুলোর অন্যতম হবে।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








