নাটাই হাতে শরতের বিকেল: মিজান রাহমান
নাটাই হাতে শরতের বিকেল: মিজান রাহমান।


স্কুল থেকে ফিরেই খাবার খেয়ে যখন ঘুমানোর কথা, ঠিক তখন মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘুড়ি আর নাটাই নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমি। নদীর পাড়ে বটগাছের নিচে আমতা কড়া রোদে আমার আগেই হাজির রিহান, আরাফ, ইয়াসীন, দীবা, প্রান্ত, সিমন ও লাড্ডুরা। আজ বিকেলে আমাদের ঘুড়ি কাটাকাটির খেলা জমবে।
আমার ঘুড়িটা আমার মামা বানিয়ে দিয়েছেন। গাংচিলের মতো সাদা ঘুড়ির মাঝে রঙিন আলখেল্লা। এক নজর দেখলেই যে কারও চোখ আটকে যাবে নিমেষেই। রিহানের ঘুড়ি নয় যেন আস্ত একটা ইলিশ মাছ, তার দাদা বানিয়ে দিয়েছেন। ব্লেড দিয়ে ঘুড়ি বানাতে গিয়ে ডান হাতের আঙুল কেটে গিয়েছে রিহানের। ডাক্তারের কাছে গিয়ে পাঁচ পাঁচটি  সেলাইও লেগেছে তার। ঘুড়ির জন্য তার কান্না থামাতে গিয়ে পাশে বসিয়ে তার দাদা বানিয়ে দিয়েছেন চমৎকার এক ঘুড়ি। রিহানের দাদা ঘুড়ি বানাতে ওস্তাদ। আমরা বন্ধুরা সবাই তার কাছে বায়না ধরে ঘুড়ি বানিয়ে আনি।
রাহুল, আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে হাবাগোবা ও বুদ্ধিমান। চশমা পরে থাকে সবসময়। বাতাসের বেগে গাংচিলের মতো পেখম মেলে যখন আকাশে আমাদের ঘুড়ি উড়াচ্ছি, ঠিক তখন রাহুল হাজির। প্যান্টের পকেট থেকে বের করে একটা একটা করে তালের বড়া দিচ্ছে আমাদের সবার হাতে। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এসে দেখে ওর মা নাকি বড়া বানাচ্ছেন। আমাদের জন্য নিয়ে আসবে বলতে মায়ের কাছে আবদার করায় মা রাজি হয়েছেন। এজন্য আসতে দেরি হয়েছে রাহুলের। আমার সাথে আলগা খাতির থাকায় সবার চেয়ে বেশি তালের বড়া আমি গপগপ করে গিলে নিয়েছি সবার অলক্ষ্যে। মনু নদীর তীর ঘেঁষে বাতাসে দোল খাচ্ছে সাদা সাদা কাশফুল। দূর থেকে ছেড়ে আসা ট্রেন তখন আশ্বিনের সবুজাভ মাঠের মাঝ দিয়ে সাপের ফণার মতো মাথা উঁচিয়ে ছুটে চলছে বাতাসের বেগে। রেললাইনের পাশ দিয়ে কাশফুলেরা দোল খাচ্ছে কৃত্রিম বাতাসে। অপর পাশে আকাশে ওড়া বালকদলের ঘুড়ি, অন্য পাশে সারি সারি বকের দল ছুটে চলছে আপন ঠিকানায়।
এবার শুরু হলো আসল খেলা। ‘লাগাও নাটাই!’-চিৎকার করে বলল আরাফ। এক এক করে সবার ঘুড়ি আকাশে ভেসে উঠল। কারো ঘুড়ি চিল হয়ে উড়ছে, কারো ঘুড়ি প্রজাপতির মতো দুলছে। ইয়াসীনের ঘুড়ি হঠাৎ বাতাসে পাক খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল, দিবা চিৎকার করে হাসিতে ফেটে পড়ল। লাড্ডু নাটাই ঘুরিয়ে সুতো ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আজ আমার ঘুড়িই থাকবে সবচেয়ে উঁচুতে!’
আমার সাদা ঘুড়িটা তখন মেঘের কাছাকাছি, বাতাসে পতপত করে উড়ছে। ঠিক তখনই রিহানের ইলিশ ঘুড়ি আমার ঘুড়ির সুতোয় প্যাঁচ লাগানোর জন্য এগিয়ে এলো। ‘কাটাকাটি শুরু!’ সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল। আমি নাটাই টেনে সুতো ছাড়লাম, আবার হঠাৎ টান দিলাম। রিহানও কম যায় না, তার দাদার শেখানো কায়দায় সুতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমার ঘুড়ির দিকে তাক করল। দুই সুতোয় প্যাঁচ লাগল, বাতাসে টানাটানি, সবার নিঃশ্বাস আটকে গেল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর হঠাৎ-ঝুপ করে একটা ঘুড়ি কাত হয়ে দুলতে দুলতে নেমে যেতে শুরু করল আকাশ থেকে। রিহানের ইলিশ ঘুড়িটা সুতো ছিঁড়ে ভেসে চলে গেল মনু নদীর ওপারে!
‘জিতে গেছি! জিতে গেছি!’ আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম আমি। সবাই হাততালি দিয়ে আমাকে ঘিরে ধরে ‘আদনান! আদনান!’ বলে উল্লাস করতে লাগল। রিহান একটু মন খারাপ করলেও হাসিমুখে বলল, ‘আদনান, তোর মামার হাতের কাজ সত্যিই অসাধারণ! আগামীবার আমিও নতুন ঘুড়ি দাদার কাছ থেকে শিখে বানাব।’ সিমন আর লাড্ডু তখনো নিজেদের ঘুড়ি নিয়ে ব্যস্ত, আর দিবা রাহুলের কাছ থেকে আরেকটা তালের বড়া চেয়ে নিল পুরস্কার হিসেবে।
এভাবে হাসি-আনন্দ-দৌড়াদৌড়িতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সূর্য কাশবনের ওপারে হেলে পড়েছে, কেউ টেরই পাইনি। আকাশের রংটা হঠাৎ কমলা হয়ে উঠতেই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল এতক্ষণে নিশ্চয়ই মা খুঁজতে খুঁজতে অস্থির হয়ে গেছেন! নাটাই আর ঘুড়ি গুটিয়ে আমরা সবাই দৌড় লাগালাম যে যার বাড়ির দিকে। যাওয়ার আগে রিহান বলে গেল, ‘কাল আবার আসবি তো?’ আমি হাসতে হাসতে মাথা নেড়ে বললাম, ‘অবশ্যই!’