
দুর্বল গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুলিশ বাহিনী মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে। সরকার এই বাহিনী দিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের চেয়েও রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একে। আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে এমন সংস্কৃতি চর্চা করে আসছেন। সর্বশেষ ফ্যাসিবাদী সরকার এর নির্লজ্জ ব্যবহার করে, পরিণামে শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে গণ-আন্দোলনের মুখে পালিয়ে যেতে হয়। এ অবস্থায় পুলিশ বাহিনীর কাছে পেশাদারত্ব ও সাবধানতা আশা করেন দেশের মানুষ।
একটি ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো: আলী হোসেন ফকির বলেছেন, ‘ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, আমরা সেটাই করব’। তার এ মন্তব্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিকসমাজ।
পরে পুলিশ সদর দফতর থেকে ওই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে জানানো হয়েছে— আইজিপি আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যার উদ্দেশ্যে কিছু বলেননি। কিন্তু পুলিশপ্রধানের এ ধরনের মন্তব্য আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার মৌলিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেই সাথে সরকারকে জনগণের কাছে বিতর্কিত করে তোলে।
আইজিপি মো: আলী হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার যদি চায়, তাহলে ‘ক্রসফায়ারে’ প্রস্তুত পুলিশ। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রধানের মুখ থেকে এমন বক্তব্য ভয়ের সংস্কৃতির সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বাংলাদেশ দীর্ঘ এক ফ্যাসিবাদী জমানার শিকার হয়েছে। যেখানে সরকারি বাহিনীর জন্য কোনো আইন প্রযোজ্য ছিল না। তাদের এক ধরনের সীমাহীন স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল। বাহিনীর প্রধান যখন এ ধরনের কথা বলেন, সেটি পুরো বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ করে দেয়।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ‘ক্রসফায়ার’ ও কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মোট দুই হাজার ৯৫৭ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে পুলিশের হাতে এক হাজার ৩৭১ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৬ শতাংশ। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের হাতে নিহত হন এক হাজার ২০০ জন। বিচারবহির্ভূত হত্যার পেছনে পুলিশের ভূমিকা বেশি। জুলাই বিপ্লবে তার প্রতিফলন দেখা গেছে। রাস্তায় গণহারে লাশ পড়েছে। এমন সহিংসতা সাধারণত যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় না। জুলাইয়ের ৩৬ দিনে দেড় হাজার মানুষ রাস্তায় হত্যা করা হয়েছে। গুরুতর আহত হয়েছেন ৩০ হাজার।
জুলাই বিপ্লব বিচ্ছিন্ন কোনো আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিনের মানুষের জমে থাকা তীব্র ক্ষোভ। এর পেছনের উল্লেখযোগ্য একটি কারণ ছিল সরকারি বাহিনীর বিচারবহির্ভূত যত কর্মকাণ্ড। ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ছাড়াও সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়া এবং মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হতো।
চব্বিশের বিপ্লবের পর আবার শেখ হাসিনা রেজিমের মতো পরিস্থিতি ফিরে আসুক, সেটি কারো কাম্য নয়। পুলিশপ্রধান প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে এক ধরনের ছাড় চাইলেন। এটি সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত। এতে করে হাসিনার পুলিশের মনস্তত্ত্বের অনুরণন দেখা গেল। জুলাইতে বিপুল আত্মত্যাগের পর এমন মনস্তত্ত্ব হতাশাজনক।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








