সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি কলঙ্কিত দিন ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। এদিন রাজধানীর পল্টনে লগি-বৈঠা দিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলের সন্ত্রাসীরা বিরোধী রাজনৈতিকপক্ষ বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, নরপশুরা লাশের ওপর নৃত্য করে। এটি ছিল মানবতার প্রতি চরম অবমাননা। এ ঘটনার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে বিরাজনীতিকরণ এবং আধিপত্যবাদী শক্তির কব্জায় তুলে দেয়ার নীলনকশা করা হয়েছিল।
২০০৬ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে পরবর্তী নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, তা নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যকার অনমনীয় অবস্থান দেশকে সাংবিধানিক সঙ্কটে ঠেলে দেয়। সেই সঙ্কট নিরসনে সংলাপ ও সমঝোতার পথ বেছে না নিয়ে রাজপথে শক্তি প্রদর্শন বেছে নেয়ায় পল্টনে ঘটেছিল ওই নৃশংস রক্তপাত।
রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে সহিংসতার আশ্রয় নেয়া এবং প্রতিপক্ষকে নির্মূলের এই মানসিকতা শুধু বেশ কয়েকজন তাজাপ্রাণ কেড়ে নেয়নি। এটি সেনাসমর্থিত এক-এগারোর জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষাপটও তৈরি করেছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের এমন ব্যর্থতা প্রমাণ করে, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় সমঝোতার পথ রুদ্ধ হলে পরিণতি কত ভয়াবহ হয়।
দেশী-বিদেশী চক্রান্তে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক বিবেচনায় ওই হত্যা মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। এতে জনমনে যে বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছায়, তা হলো— ক্ষমতার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে গুরুতর অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। আইনের শাসনের মূল নীতি পাশ কাটিয়ে যখন অপরাধের বিচার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়; তখন রাষ্ট্র তার নৈতিক ভিত্তি হারাতে শুরু করে। 
এই বিচারহীনতার ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করে। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতে, আর ২০২৪ সালে ডামি নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং দমন-পীড়নে সমগ্র দেশকে ভীতিকর জনপদে পরিণত করা হয়। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন পদদলিত করা হয়।
অতীতের রক্তাক্ত অধ্যায়গুলো থেকে যদি জাতি শিক্ষা না নেয়, তাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়। শুধু একটি সরকারের পতন প্রকৃত গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা দেয় না। ফের যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার হয়, দখলদারত্ব ও প্রতিহিংসার রাজনীতি ফিরে আসে, তা হবে চব্বিশের শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। তাই পল্টনের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে পরবর্তী সব গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ ও প্রমাণের ভিত্তিতে। নিশ্চয় তা রাজনৈতিক প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে নয়। এক্ষেত্রে একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা পরিহার করে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা, সংলাপ এবং গণতান্ত্রিক সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
পল্টন ট্র্যাজেডি আমাদের দেখিয়েছে, বিচারহীনতা কত ভয়াবহ হতে পারে। জুলাই অভ্যুত্থান দেখিয়েছে জন-অধিকার ও জনক্ষোভ কখনো দমিয়ে রাখা যায় না। এক সময় তা বিস্ফোরিত হবেই। 
আমরা মনে করি, একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রগঠন হতে পারে ভবিষ্যতের স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ার কার্যকর হাতিয়ার।

Advertisement