সয়াবিন তেলেও বিষাক্ত ধাতব
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

খাবারে ভেজাল আমাদের পুরনো সমস্যা। বাজারে এমন কোনো খাবার নেই যাতে ভেজাল দেয়া হয় না। মাঝে মধ্যে সরকারি দফতরের কর্মকর্তারা ভেজাল রোধে অভিযান চালান, কিছু জরিমানা করেন। তারপর সব সেই। কিন্তু ভেজালের চেয়েও গুরুতর বিষয় খাবারে বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি। এই বিষাক্ত উপাদান খাবারে আসে প্রাকৃতিকভাবে। তবে মানুষের কর্মকাণ্ডের সাথে এর সংশ্লিষ্টতা আছে। মাছে বিষাক্ত উপাদান আসে নদী ও জলাশয়ে ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের মতো ক্ষতিকর বস্তু থেকে। চাষের মাছ বা মুরগিতে ক্ষতিকর উপাদান আসে তাদের দেয়া অনিরাপদ খাবার থেকে। চাল ও অন্যান্য শস্যে আর্সেনিক এবং সিসার মতো উপাদান যোগ হয় ভূগর্ভের পানির যথেচ্ছ ব্যবহারসহ নানা কারণে। 
এবার জানা গেল, প্রতিদিনের খাবার তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত সয়াবিন তেলেও পাওয়া গেছে বিষাক্ত ধাতব বস্তু। গতকাল প্রায় সব দৈনিকে প্রকাশিত একটি সংস্থার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে প্রচলিত সয়াবিন তেলের ২১টি নমুনা পরীক্ষা করে ২০টিতেই মিলেছে সিসা, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, পারদ ও নিকেলের মতো বিষাক্ত মৌল। সব নমুনায় প্রতি কেজিতে ক্রোমিয়ামের ঘনত্ব পাওয়া গেছে ১.১১ থেকে ৫.৬৪। আর্সেনিকের পরিমাণও নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মাত্রার চেয়ে বেশি। বেশির ভাগ নমুনায় নিকেলের মাত্রা এবং কয়েকটিতে তামার ঘনত্ব সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়েছে। 
গবেষকরা উন্নত পদ্ধতিতে আটটি বিষাক্ত মৌল— সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, পারদ, ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল ও তামার পরিমাপ করেন। গবেষণায় প্রতি কেজি সয়াবিনে সিসার ঘনত্ব পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ০৪৮ থেকে ১ দশমিক ৫২৯ মিলিগ্রাম, যা আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত মাত্রার বেশি। সয়াবিন তেলের ২১টি নমুনার মধ্যে ২০টিতেই সিসার মাত্রা আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা নির্দেশনার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়েছে। প্রতি কেজি সয়াবিনে আর্সেনিকের ঘনত্ব পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ১৫৫ থেকে শূন্য দশমিক ২৭৬ মিলিগ্রাম, যার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ০.১ মিলিগ্রাম। ২১টি নমুনার সব ক’টির মাত্রাই তার উপরে। পারদের মাত্রা পাওয়া গেছে ০.১২২ থেকে ০.২৬৪ মিলিগ্রাম। আর ক্রোমিয়াম ১.১১ থেকে ৫.৬৪৩ মিলিগ্রাম।
ঘটনাটি উদ্বেগজনক। রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণে বিষাক্ত উপাদান থাকার অর্থ— গোটা জাতিই প্রতিদিন বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। এর ফলে শুধু রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে এমন নয়, শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে গুরুতর পরিণতি নিয়ে আসতে পারে।  
সিসার দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ স্নায়ুতন্ত্র, কিডনির ক্ষতি হয়। শিশুর স্বাভাবিক বিকাশেও এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গবেষণায় সয়াবিন তেল খাওয়ার কারণে কারো নির্দিষ্ট রোগ হয়েছে এমন তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি। তবে সম্ভাব্য ক্ষতির দিকগুলো উঠে এসেছে। তারা সবধরনের বাণিজ্যিক সয়াবিন তেলের নিয়মিত ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা, মাননিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে দূষণের উৎস অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছেন।
আমরা আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ বিষয়ে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। সেই সাথে জনসচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি।

Advertisement