মানবপাচার বন্ধে ন্যূনতম অর্জন নেই 
মানবপাচার বন্ধে ন্যূনতম অর্জন নেই । সংগৃহীত

উন্নত জীবনের স্বপ্ন আছে মানুষের। এই স্বপ্নকে পুঁজি করে মানুষকে জিম্মি করছে পাচারকারী চক্র। এই চক্রের হাতে প্রতি বছর প্রতারিত হচ্ছে নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার মানুষ। প্রবাসে কারো ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে জবরদস্তিমূলক শ্রম। করা হচ্ছে যৌন নির্যাতন। পরিণত করা হচ্ছে আধুনিক দাসে।

Advertisement

বৈশ্বিক মানবপাচার নিয়ে প্রতি বছর প্রতিবেদন প্রকাশ করে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর। তাদের ওয়েবসাইটে এ বছরের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় গত বৃহস্পতিবার। এতে বাংলাদেশের অবস্থান আগের মতো দ্বিতীয় ধাপেই থেকে গেছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশীদের মধ্যে এই ধাপে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ মানবপাচার বন্ধের ন্যূনতম মানও পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। তবে সরকারের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা বেড়েছে। মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে ২০২৬ সালে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। তদন্ত ও বিচারের পরিধি বেড়েছে। পাচারের অপরাধ ও ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। অভিবাসী শ্রমিকদের মানবপাচারের ঝুঁকি কমাতে সুরক্ষাব্যবস্থাও জোরদার করেছে সরকার। তবে এ ক্ষেত্রে যেসব ঘাটতি তুলে ধরা হয়েছে, তা উদ্বেগজনক।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানবপাচারের মামলা তদন্তের সংখ্যা বিগত বছরের ৮১১টি থেকে বেড়ে ৯৬১টিতে এবং বিচারে অভিযুক্তের সংখ্যা ৪৫২ জন থেকে বেড়ে এক হাজার ৭৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। মামলায় অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত করার হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৩ সালে ৪০৭ জন এবং ২০২৪ সালে ১০৩ জন পাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে আদালত মাত্র ৭৬ জনকে দোষী সাব্যস্ত করতে পেরেছে। অনেক ক্ষেত্রে কেবল জরিমানা করেই ইতি টানা হয়েছে। এতে অপরাধ দমন ও প্রতিরোধমূলক প্রভাব দুর্বল হচ্ছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় এবার শনাক্ত করা ভুক্তভোগীর সংখ্যা এক হাজার ৪৬২ জন থেকে কমে এক হাজার ১৩৫ জনে নেমে এসেছে। বাস্তবিক অর্থে সেবাপ্রাপ্তের সংখ্যা ৮৮৩ জন থেকে কমে মাত্র ১১১ জনে নেমেছে। বিশেষ করে জোরপূর্বক শ্রমের শিকার মানুষ, দেশে ফিরে আসা অভিবাসী শ্রমিক এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব দেখা যাচ্ছে। তা ছাড়া অভ্যন্তরীণভাবে সংঘটিত মানবপাচার দমনেও সমন্বিত উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

বিদেশগামী শ্রমিকদের অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় একটি বড় সঙ্কট। বাস্তবে সরকার-নির্ধারিত ফি’র চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ গুনতে হয় শ্রমিকদের। এই অর্থ তাদের জোগাড় করতে হয় ঋণ করে বা জমিজমা বিক্রি করে। এই ঋণের বোঝাই তাদের জবরদস্তিমূলক শ্রমের দিকে ঠেলে দেয়। বিদেশ যাওয়ার খরচ বাঁচাতে পাচারকারীর খপ্পরে পড়েন অনেকে।

কেবল নতুন আইন করে মানবপাচারের মতো অপরাধ মোকাবেলা সম্ভব নয়। পাচারকারীদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ পাচার রোধে সীমান্ত ও অঞ্চলভিত্তিক কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। আশা করি, এসব কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা হলেই কেবল বাংলাদেশ  আন্তর্জাতিক মান অর্জন করবে। ঝুঁকিমুক্ত হবে বিদেশ গমনে ইচ্ছুক শ্রমিকদের জীবন।