
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করে সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় পড়েছে নির্বাচন কমিশন-ইসি। গত সোমবার সময়সূচি ঘোষণা করে ইসি। পরদিন মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা তাদের আছে। তবে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে সরকারের সাথে আলোচনা করে প্রস্তুতিমূলক সভা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে বৈঠকের পর নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন কমিশন আগে সরকারের সাথে কোনো আলোচনা করেনি।
সরকারের প্রতিক্রিয়ায় অস্বস্তিতে পড়ে ইসি অবস্থান পাল্টেছে। ইসি সচিব বলেছেন, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য ‘শিরোধার্য’। তিনি আরো বলেন, ঘোষিত সময়সূচি চূড়ান্ত নয়, এটি সম্ভাব্য সময়সূচি। আজ বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।
বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে এটিকে সরকার ও ইসির মধ্যে সমন্বয়হীনতার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। কেউ বা সরকারের চাপের কাছে ইসির নতিস্বীকার হিসেবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে যা কিছু বলা হোক, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এর এখতিয়ার ও কার্যপদ্ধতি সংবিধানে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা আছে। বলা আছে— রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে ইসি। এ ছাড়া সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো দায়িত্বও কমিশন পালন করবে। সংশ্লিষ্ট আইনে স্থানীয় সরকার তথা ইউপি বা উপজেলা নির্বাচনে ভোটগ্রহণের তারিখ, সময়, স্থান ও নির্বাচন পরিচালনা-সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে বিধান করতে পারবে ইসি।
ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২০ ধারায় বলা হয়েছে— নির্বাচন কমিশন প্রণীত বিধি অনুসারে ইসি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচনের আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পাদন করবে। সুতরাং ইসির এখতিয়ার নিয়ে যেমন কোনো অস্পষ্টতা নেই, তেমনি ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণায় ইসি তার এখতিয়ারের সীমা লঙ্ঘন করেনি। সরকারের সাথে আলোচনা বা সমন্বয়ের রীতি ইসির জন্য বাধ্যবাধকতা নয়। ইসির ঘোষণার পর সরকারের পক্ষ থেকেও আলোচনা বা সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়া যেত। সেটি হতো গণতান্ত্রিক আচরণের শোভন দৃষ্টান্ত।
সরকার বা নির্বাহী বিভাগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অযাচিত খবরদারি করলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। ফ্যাসিবাদী জমানায় সাড়ে ১৫ বছরে জাতি হাড়ে হাড়ে তা টের পেয়েছে। সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে ধ্বংস হয়েছে তা দেশবাসী দেখেছেন। ইসি ও সরকারের বর্তমান টানাপড়েন যেন সেই একই প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘শিরোধার্য’ মেনে ইসি সচিবের চুপসে যাওয়া বলে দেয়— কমিশন স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে পারছে না। সাংবিধানিক সংস্থাটি এখনো সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হয়ে আছে, যা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তায় অন্তরায়।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নেও সরকারের নীতিগত ও বাস্তব অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট, যা জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রায় এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।







