ইমামদের সমাজের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে
প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। নয়া দিগন্ত

সিলেট -১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ইমামদের সমাজের প্রকৃত নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘শুধু নামাজ পড়ানো নয়, সমাজের নেতা হিসেবে ইমামদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

Advertisement

শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে সিলেটে জাতীয় ইমাম সমিতির সম্মেলন ও ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। নগরীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপি এ সম্মেলনে সিলেট জেলার তিন শতাধিক ইমাম অংশ নেন। 

সমিতির জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ এহসান উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জালাল উদ্দিন ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় সম্মেলনে বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন,
 বর্তমান সরকার ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের কল্যাণে কাজ করছে। ইমামরা সমাজের নেতা। তাাঁরা মানুষকে সত্য-সুন্দরের পথের দিকে পরিচালিত করেন। কিন্তু তাদের স্বাভাবিক জীবন অনেকসময় অর্থনৈতিক কারণে ব্যাহত হয়। সরকার তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

Advertisement

মন্ত্রী সিলেটের উন্নয়ন নিয়েও এসময় কথা বলেন। তিনি জানান, সিলেট -ঢাকা রেলপথে ইলেকট্রিক ট্রেন চালু করার একটা প্রকল্পের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। এটা হবে দেশের দ্বিতীয় ইলেকট্রিক ট্রেন প্রকল্প। এটা চালু হলে সিলেট-ঢাকা রেলপথে তিন ঘণ্টায় ঢাকা পৌঁছানো সম্ভব হবে। সিলেটের লোকজন সকালে ঢাকায় গিয়ে কাজ কর্ম সেরে দিনেই ফিরে আসতে পারবেন। 

মন্ত্রী বলেন, ইমাম মুয়াজ্জিনদের জীবন মান উন্নয়নে সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে। শিগগিরই এই পরিকল্পনা দৃশ্যমান হবে। 

সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন  বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব মাওলানা শাহ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি মসজিদের মিম্বর হলো নৈতিকতা ও সুশাসন শিক্ষা দেওয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র। তিনি দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় ইমামদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, হক কথা বলা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা আলেম সমাজের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। তিনি তাঁর বক্তব্যে সরকারের কাছে  বেশ কয়েকটি দাবি-দাওয়া পেশ করেন

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য এমএ মালিক বলেন, অর্থনৈতিক সুশাসন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনয়ন কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব নয়, এর জন্য সামাজিক সম্প্রীতি ও নৈতিক জাগরণ জরুরি। তিনি বলেন, ইমামগণ সমাজের সম্মানিত পথপ্রদর্শক হিসেবে সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের বার্তা প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারেন।


সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, একটি পরিচ্ছন্ন, দুর্নীতিমুক্ত ও সুশৃঙ্খল নগরী গড়তে ধর্মীয় নেতাদের নৈতিক প্রভাব অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, নাগরিক অধিকার রক্ষায় এবং সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি দূর করতে সিটি কর্পোরেশন ওলামায়ে কেরামের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করতে আগ্রহী। ইমামদের এই মিলনমেলা সিলেট নগরীতে সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিশেষ অতিথি সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন,সিলেট শহর একসময় মক্তবের শহর ছিল। ভোর বিহানে মসজিদে মসজিদে কোরআনের সুললিত আওয়াজ সারা শহরে ছড়িয়ে পড়তো। সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে তিনি ইমামদের প্রতি আহ্বান জানান। 

তিনি বলেন, সিলেটের পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের পাশাপাশি মননশীল সমাজ গঠনে নৈতিক শিক্ষার প্রচার অপরিহার্য। তিনি বলেন, উন্নয়নের সঠিক সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে সুশাসন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই মহৎ উদ্যোগে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ইমাম সমাজের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করে তিনি একটি আধুনিক ও সম্প্রীতিপূর্ণ সিলেট গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল প্রফেসর মাওলানা মাহমুদুল হাসান বলেন, যুগোপযোগী ও নৈতিকতাসম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরি করতে মাদ্রাসাশিক্ষা এবং মসজিদের মিম্বরের ভূমিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বলেন, বর্তমান সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে তরুণ প্রজন্মকে নৈতিকতার মূলে ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে ইমাম ও শিক্ষকদের যৌথ প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি।

সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রশাসন এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের পারস্পরিক সহযোগিতায় সমাজ থেকে অপরাধ ও দুর্নীতি নির্মূল করা অনেক সহজ হয়। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইমামগণ সমাজের একেবারে তৃণমূলের মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে মিশে থাকেন, তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে তাঁদের কথা সাধারণ মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইমাম সমাজকে সব ধরনের প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।

ইবনে সিনা হাসপাতাল সিলেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাওলানা হাবিবুর রহমান আলেম সমাজ ও ইমামগণের স্বাস্থ্যসেবা ও কল্যাণমূলক কাজে অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, মানবসেবা ও ইসলামি অনুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

 ইমামদের এ ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল সমাজে সুশাসন ও ন্যায়ের পক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

শাহজালাল ডি ওয়াই কামিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মুফতি আবুসালেহ মো: কুতুবুল আলম বলেন, কোরআন ও সুন্নাহর শাশ্বত জ্ঞানই মানুষের ভেতর সুশাসন ও ইনসাফের বীজ বপন করে। তিনি বর্তমান যুগে নৈতিক অবক্ষয় রোধে মসজিদের ইমামদের আরও বেশি সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তরুণ সমাজকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করতে ইমাম ও শিক্ষকমণ্ডলীকে যৌথভাবে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। 


বিএনপি সিলেট মহানগর সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, গণতন্ত্র, মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ অপরিহার্য। রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং নৈতিক শক্তির বিকল্প নেই, যেখানে ইমামগণ জাতির বিবেক হিসেবে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেন। 

বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও গ্রন্থকার মো. জসীম উদ্দিন খন্দকার বলেন, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সমাজের সংকটময় মুহূর্তে ধর্মীয় নেতারাই জাতিকে সঠিক বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। গবেষণালব্ধ জ্ঞান এবং ইসলামের মৌলিক সাম্য ও ইনসাফের বাণী প্রচারের মাধ্যমে একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ এখন সময়ের দাবি। ইমামদের এই সম্মেলন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।

স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন সমিতির জন্য খাস জমি বরাদ্দ করে একটি ইমাম কমপ্লেক্স নির্মাণ, সমিতিকে ৫টি অ্যাম্বুলেন্স প্রদান, ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদিমদের চাকরি জাতীয়করণসহ বিভিন্ন ধরনের দাবি-দাওয়া পেশ করেন।

শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সমিতির জেলা সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন। পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ক্বারী
 আব্দুল বাছিত। বিগত বছরের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জালাল উদ্দিন এবং আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন জেলা শাখার অর্থ সম্পাদক মাওলানা আকমল হোসাইন।

সম্মেলনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে পরবর্তী তিন বছরের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সিলেট জেলা শাখার সভাপতি, সেক্রেটারি এবং সাংগঠনিক সম্পাদকসহ পুরো কমিটি নির্বাচন করা হয়। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা শাহ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সহকারী নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন ও দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেট ব্যুরো চিফ সিনিয়র সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদার। 

সম্মেলনে আগামী তিন বছরের জন্য সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন যথাক্রমে মাওলানা মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন, মাওলানা জালাল উদ্দিন ভূঁইয়া এবং মাওলানা আবুল বাশার।