কৃষিমন্ত্রী
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। নয়া দিগন্ত

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে সরকার একটি বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

Advertisement

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন মন্ত্রী। পরিদর্শন শেষে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

পরিদর্শনের শুরুতে মন্ত্রী গোদাগাড়ীর হাটপাড়া এলাকায় পন্টুনের মাধ্যমে পদ্মা নদী থেকে পাম্পে পানি উত্তোলন ও সরবরাহ কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। পরে সরমংলা খাল পরিদর্শন করে কৃষক ও বিএমডিএ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। 

এ সময় তিনি খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও অংশ নেন। পরবর্তীতে কলিপুর-৩ এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প পরিদর্শনের সময় নেট মিটারিং পদ্ধতিতে সেচের কাজে ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হন।

ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর তাগিদ

মতবিনিময় সভায় কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ কৃষিকাজের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। কৃষির প্রতি তাদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা প্রশংসনীয়। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে শুধু বরেন্দ্র অঞ্চল নয়, বিশ্বব্যাপীই ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। তাই কৃষিকাজে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে কৃষিকে শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।’

পদ্মার পানি ব্যবহারে নতুন মেগা প্রকল্প

পদ্মা নদীর পানি সেচকাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা নদী থেকে পানি এনে কৃষিকাজে ব্যবহারের উদ্যোগ সম্প্রসারণে সরকার একটি বড় প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করেছে। প্রকল্পটির প্রস্তুতির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটি অনুমোদন পাবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি নদীর পানির সাথে আসা পলি কৃষিজমির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।’

সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ ও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ

সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ ও নেট মিটারিং প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন প্রায় ১৭ হাজার গভীর নলকূপকে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পে রূপান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেচের কাজে ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে বিদ্যুতের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এ ধরনের উদ্যোগ কৃষি ও জ্বালানি—উভয় খাতেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

বিএমডিএর চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম

এর আগে মতবিনিময় সভায় বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক (গ্রেড-২) মো: জাহাঙ্গীর আলম খান সংস্থার চলমান কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। 

তিনি জানান, গোদাগাড়ী উপজেলায় বিএমডিএর ৭১খটি গভীর নলকূপ রয়েছে। এ ছাড়া ১১৮ কিলোমিটার খাল ও খাড়ি এবং ৪৬২টি পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে ৪১ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক। কৃষক প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সেচ কার্যক্রমের মাধ্যমে ৭৬ হাজার ৩৪৫ কৃষক উপকৃত হচ্ছেন।

তিনি আরো জানান, সরমংলা খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৯ কিলোমিটার। এ খালের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। পদ্মা নদী থেকে পানি উত্তোলনের জন্য দুটি পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, গোদাগাড়ীর কলিপুর-৩ সোলার সেচ প্রকল্পে ৪৫টি সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। ১৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পের মাধ্যমে ২৬৪ বিঘা জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে। এতে উপকৃত হচ্ছেন ৭৪ কৃষক। এ প্রকল্পে নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

অনুষ্ঠানে বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মো: আবুল কাসেম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাজিরুল ইসলাম, আব্দুল লতিফ, শিবির আহমেদ ও তরিকুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান ও মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল লতিফসহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, বিএডিসি ও বিএমডিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় কৃষক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।