প্রবাসী, মৃত, লাশ, পরিবার, মেয়ে
সৌদি প্রবাসী শামীমের লাশ দেখতে আত্মীয়দের ভিড়, ইনসেটে প্রবাসী শামীম। নয়া দিগন্ত

নাটোরের নলডাঙ্গার যুবক মো: শামীম হোসেন (৩০) আট মাস আগে পরিবারের ও নিজের ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন। তিন মাস আগে সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে মারা যান তিনি। চার মাস বয়সী মেয়ে সাফা জান্নাতকে আর দেখা হল না তার। শুনতে পারেননি বাবা ডাকও। অনেক আশা ছিল দেশে ফিরে সন্তানের মুখ দেখবেন শামীম। দূরদেশে থেকেও ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন তিনি। দেশে ফিরে মেয়েকে কোলে নেয়ার স্বপ্নও দেখতেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, এখন তারই মরা মুখ দেখতে হলো পরিবারের। 

Advertisement

শিশু সাফাকে দেখতো হলো তার প্রবাসী বাবার লাশ। জন্মের এক মাসের মাথায় বাবাকে হারায় সে।

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন শামীম। অগ্নিকাণ্ডে শরীর মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণে জটিলতার কারণে প্রায় তিন মাস পর ৩১ অক্টোবর তার গ্রামের বাড়িতে লাশ পৌঁছে। লাশ এক পলক দেখার জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে ভিড় জমায় অত্মীয়-স্বজনরা।

শনিবার বিকেলে নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের শ্রীপুরপাড়া গ্রামে নলডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো: শামীম হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার উপস্থিতিতে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়। এর আগে, সকালে বিমান বাংলাদেশের এয়ারলাইনন্সের ফ্লাইটে তার লাশ ঢাকায় পৌঁছায়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। 

মৃত শামীম হোসেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার ৩ নম্বর খাজুরা ইউনিয়নের দীঘিরপাড় এলাকার মো: জাকির হোসেনের ছেলে।

মৃতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে পার্শ্ববর্তী হালতি খোলাবাড়িয়া এলাকার নাজমা খাতুন মিতু নামে এক নারীকে বিয়ে করেন শামীম। বিয়ের পর সন্তান না হওয়ায় অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন। দীর্ঘ চার বছর পর স্ত্রী সন্তানসম্ভাবনা হন। সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে সন্তানসম্ভাবনা স্ত্রীকে রেখে আট মাস আগে প্রবাসজীবনে পাড়ি জমান শামীম। সন্তান হওয়ার খুশিতে বিদেশে আত্মহারা শামীম। অনেক স্বপ্ন ছিল দেশে ফিরে একমাত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সন্তানকে আর আদর করা হলো না তার। 

স্বামীর লাশ দেখে শোকে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন এবং বারবার অচেতন হয়ে পড়ছেন স্ত্রী মিতু। তিনি বলেন, ‘গত ৯ আগস্ট সকালে তার সাথে শেষ কথা হয়েছিল। প্রতিদিন মেয়েকে ভিডিও কলে দেখতো। এখন আমি কাকে দেখাবো, কার সাথে কথা বলব। কাকে আমার সন্তানের ভালো মন্দের কথা জানাবো। আমার ছোট শিশুটি এতিম হয়ে গেল। সে আর আমাকে ফোন দিবে না। তার সন্তানের খোজও নিবে না।’

মৃত শামীমের মা শাহীনুর বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘সরকারকে ধন্যবাদ আমার সন্তানের লাশটা আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। অনেক আশা নিয়ে আমার সন্তান সৌদিতে গিয়েছিল। আজকে লাশ হয়ে ফিরলে। আমার চার মাস বয়সী নাতনি তার বাবার জীবিত মুখটা দেখতে পেল না। সরকার যেন তার ভবিষতের জন্য কিছু করে দেয়।’

বাবা জাকির হোসেন বলেন, ‘সে আমার একমাত্র ছেলে। তার আয়ের ওপর সংসার চলত। অনেক টাকা ঋণ করে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। চার মাস বয়সী মেয়েকে এতিম ও বউকে বিধবা করে চলে গেলো আমার ছেলে। এতিম নাতনির ভবিষ্যতের জন্য সরকার যেন কিছু করে দেয়।’

নলডাঙ্গার ইউএনও শাম্মী আক্তার বলেন, ‘শনিবার সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে লাশ ঢাকায় পৌঁছায়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় ও গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। বিকেলে জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।’