
নামেই ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। বাস্তবে জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সঙ্কট নিয়ে চলছে সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্য জনবল কম। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষা, চিকিৎসাসেবা পেতে ভোগান্তি এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় অনেককে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে চিকিৎসার ব্যয়।
হাওরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা এ হাসপাতাল। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু রোগীর তুলনায় প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ করছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৭৪টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন। ২৬৩টি নার্স পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১৯৩ জন। এছাড়া মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টসহ অন্য ১৩৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৮৮ জন। বিভিন্ন বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিনিয়র ও জুনিয়র কনসালটেন্টও নেই। এর মধ্যে পাঁচজন চিকিৎসককে সুনামগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজে বদলি করা হয়েছে। অথচ সেখানে এখনো হাসপাতাল কার্যক্রম চালুই হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসকসঙ্কট আরো বেড়েছে।
চিকিৎসক ও সরঞ্জামের সঙ্কট
রোগীদের অভিযোগ, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রোগীর চাপ বেশি থাকায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় সেবা পেতেও বিলম্ব হয়। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এখনো ১০০ শয্যার উপযোগী বলে জানা গেছে। ফলে রোগীর চাপ বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম নিশ্চিত না হওয়ায় হাসপাতালের সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
দুই দফা উদ্বোধনের পরও চালু হয়নি আইসিইউ
হাসপাতালের আরেকটি বড় সমস্যা ১০ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা এ ইউনিটটি দুই দফা উদ্বোধন করা হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে সঙ্কটাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটসহ অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।
এদিকে হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি প্রায় দেড় বছর ধরে অকেজো পড়ে আছে। এতে জরুরি প্রয়োজনে রোগী পরিবহনেও ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। গুরুতর রোগীকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি রোগীর চিকিৎসা নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন কুরবান আলী বলেন, ‘জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসার পর অন্য হাসপাতালে নিতে হলে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি সচল থাকলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো। এখন বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।’
সদর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মতিন বলেন, ‘সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নিয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর চিকিৎসক দেখিয়েছি। হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অনেক, কিন্তু চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কম। সময়মতো সেবা না পেলে বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। এতে খরচও বেড়ে যায়। সরকারের উচিত এদিকে নজর দেয়া।’
জনবল নিয়োগ ও পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুর দাবি
সচেতন মহলের মতে, সুনামগঞ্জের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার প্রধান আশ্রয় এ হাসপাতাল। তাই ২৫০ শয্যা হাসপাতালের উপযোগী জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে দীর্ঘদিনের শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ, আইসিইউ ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালু এবং সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সচল করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: আলী আশরাফ সোহাগ বলেন, ‘অতিরিক্ত রোগীর চাপের মধ্যেও সীমিত জনবল নিয়ে সাধ্য অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। জনবলসঙ্কটের বিষয়টি ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানানো হয়েছে। আশা করি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’
জনবলসঙ্কট, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি, অচল অ্যাম্বুলেন্স ও আইসিইউ ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু না হওয়ার মতো সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান না হলে জেলার সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা আরো কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








