এইচআইভি, কিশোরগঞ্জ
কিশোরগঞ্জের ম্যাপ ছবি: মানচিত্র

কিশোরগঞ্জে ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ২৮ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ জনকে শনাক্ত করেছে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। আর ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থায় শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আরো দুজনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে বলে জানান জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাইদুর রহমান।

বেসরকারি সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত শনাক্ত ২৬ জনের মধ্যে ২২ জন ভৈরব, কুলিয়ারচর, বাজিতপুর, নিকলী, অষ্টগ্রাম ও কটিয়াদী উপজেলার বাসিন্দা। এসব উপজেলা সংস্থাটির ভৈরব কার্যালয়ের আওতাধীন। বাকি সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের আওতাধীন এলাকা থেকে শনাক্ত হয়েছেন আরো চারজন।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সংস্থাটির কার্যক্রমে শনাক্ত হয়েছেন নয়জন। তাদের মধ্যে ভৈরব কার্যালয়ের আওতাধীন উপজেলাগুলো থেকে পাঁচজন ও কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের আওতাধীন এলাকা থেকে চারজন।

একদিকে বেসরকারি সংস্থার হিসেবে ছয় বছরে ২৬ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থায়ও দুজন শনাক্ত হওয়ার তথ্য এসেছে। এতে জেলায় এইচআইভি সংক্রমণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

কিশোরগঞ্জে ২০১০ সাল থেকে এইচআইভি শনাক্ত ও অনুসন্ধানের কাজ করছে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। সংস্থাটি বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ কার্যক্রম চালায়। তাদের তালিকায় ভাসমান মানুষ, হিজড়া জনগোষ্ঠী, ট্রাকচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী, যৌনকর্মী, পোশাকশ্রমিক ও বিদেশফেরত ব্যক্তিরা রয়েছেন।

তবে শনাক্ত ২৬ জনের পরিচয় বা তাদের বসবাসের নির্দিষ্ট এলাকা প্রকাশ করেনি সংস্থাটি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলেন, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিচয় সংবেদনশীল ও গোপনীয় বিষয়। সেই গোপনীয়তা রক্ষা করেই তাদের পরীক্ষা করা হয়েছে।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে সংস্থাটির এক ম্যানেজার বলেন, কারও শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হলে তাকে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির (এআরটি) আওতায় আনা হয়। বিনামূল্যে এ চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি নিয়মিত ফলোআপ করা হয়।

সমন্বয় সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি আতা মোহাম্মদ ওবায়েদ বলেন, ‘এটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। কিশোরগঞ্জ হাওরবেষ্টিত জেলা। ভৈরবে গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন রয়েছে। এ ছাড়া সড়ক ও নৌপথেও মানুষের চলাচল রয়েছে। এসব কারণে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদ আহমেদ বলেন, ‘এইচআইভির বিস্তার শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক সঙ্কটও। সচেতনতার ঘাটতি, ভুল তথ্য, সামাজিক স্টিগমা (কলঙ্ক) ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ মানুষকে সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলছে। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা প্রয়োজন।’

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (মেডিসিন) আবিদুর রহমান ভূইয়া বলেন, ‘অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, সংক্রমিত রক্ত গ্রহণ এবং ব্যবহৃত বা অপরিষ্কার সুচ ও সিরিঞ্জ ভাগাভাগির মাধ্যমে এইচআইভি ছড়াতে পারে। আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকেও গর্ভাবস্থা, প্রসব বা বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুর মধ্যে সংক্রমণ হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘প্রবাসফেরত ব্যক্তিসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।’

জেলা সিভিল সার্জন মো: সাইদুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থায় শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দুজনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রতিটি উপজেলায় এইচআইভি শনাক্তের জন্য পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।’