ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল ছবি: সংগৃহীত

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি ও ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ বলেছেন, আগুনের আতঙ্কে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে পদদলিত বা অগ্নিদগ্ধ হয়ে কেউ মারা যাননি।

অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর পদদলিত হয়ে ছয়জন নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পদদলিত হয়ে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক কোনো প্রমাণ তাদের হাতে নেই।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত প্রথম তদন্ত কমিটি নিয়ে বিতর্কের পর সেটি বাতিল করে নতুন ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগের তীর যেসব কর্মকর্তার দিকে, তাদেরই আগের তদন্ত কমিটিতে রাখা হয়েছিল- এমন প্রশ্ন ওঠার পর গণপূর্ত অধিদফতরের দুই প্রকৌশলীকে বাদ দেয়া হয়েছে নতুন কমিটি থেকে।

নবগঠিত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

‘আতঙ্কে দুজনের মৃত্যু’
বৃহস্প‌তিমসবার সকালে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। তিনি বলেন, ‘অগ্নি-আতঙ্কে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে পদদলিত বা অগ্নিদগ্ধ হয়ে কেউ মারা যায়নি।’

তিনি দাবি করেন, ওই দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন। গণমাধ্যমে ছয়জনের মৃত্যুর যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেটিও সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সংসদ সদস্য বলেন, ‘মৃত্যুর তালিকায় জাহানারা বেগমের নাম থাকলেও তিনি এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’

তবে অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে মৃত অবস্থায় পাঁচজনকে আনার তথ্য কিভাবে লিপিবদ্ধ হলো এবং তাদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী- এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।

পদদলিত হয়ে মৃত্যু, নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু?
সোমবার সন্ধ্যায় মমেকের নতুন ভবনের লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, হুড়োহুড়ি করে একটি সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় অনেকে পড়ে যান এবং পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় ছয়জন নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে নার্স তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচজনকে মৃত অবস্থায় আনার তথ্য লিখেছিলেন। কিন্তু তাদের কাছে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক কোনো প্রমাণ নেই।

নিহতদের শরীরে পদদলিত হওয়ার স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

তাহলে আতঙ্কের মধ্যে আহত বা অসুস্থ হয়ে কারো মৃত্যু হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে সেই মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ কী- এ প্রশ্নের উত্তরই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একইসাথে জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে মৃত অবস্থায় আনার তথ্য এবং পরে মৃত্যুর কারণ নিয়ে যে ভিন্নতা তৈরি হয়েছে, তারও ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিতর্কের মুখে প্রথম তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের পর ওই রাতেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কমিটিতে গণপূর্ত অধিদফতরের দুই প্রকৌশলীকে অন্তর্ভুক্ত করায় শুরু হয় বিতর্ক।

দীর্ঘদিন ধরে মমেকের লিফট রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে গণপূর্ত অধিদফতর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘নাঈমা এন্টারপ্রাইজ’-এর বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতি, ভুয়া ভাউচার, অকেজো অটোমেটিক রেসকিউ ডিভাইস (এআরডি) সিস্টেম এবং মানহীন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের সাথে সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন ওঠা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) মাজেদুর রহমানকে অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত কমিটিতে রাখা হয়।

ফলে অভিযোগের তীর যাদের দিকে, তাদেরই সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনায় তদন্ত কমিটিতে রাখা হলে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে- এমন প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় লোকজনসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

গণমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপরই প্রথম কমিটি বাতিলের সিদ্ধান্ত আসে।

গণপূর্তের কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে নতুন কমিটি
বুধবার দুপুরে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা: জাকিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে আগের তদন্ত কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়।

নতুন ছয় সদস্যের কমিটিতে হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে।

কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক ডা: গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে। সদস্য সচিব হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ দক্ষিণের নির্বাহী প্রকৌশলী সুব্রত রায়, হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জন খন্দকার মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন এবং ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী।

তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে গাফিলতি
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা: মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, আগের তদন্ত কমিটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় গণপূর্তের দুই প্রকৌশলীকে বাদ দিয়ে নতুন ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, লিফটে আগুন লাগার ক্ষেত্রে কারো গাফিলতি বা অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্ত কমিটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।

তবে তদন্তের মূল প্রশ্ন শুধু আগুনের সূত্রপাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। লিফট রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মান, নিরাপত্তাব্যবস্থা, এআরডি সিস্টেম সচল ছিল কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিদর্শন হয়েছে কি না- এসব বিষয়ও তদন্তে উঠে আসা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুরনো অভিযোগের সাথে আগুনের যোগসূত্র কী?
মমেকের লিফট রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। গণপূর্ত অধিদফতর ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোটি টাকার অনিয়ম, ভুয়া ভাউচার, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের কোনোটি সত্য হলে অগ্নিকাণ্ডের সাথে তার কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

বিশেষ করে যে লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুনের সূত্রপাত, সেই লিফটের রক্ষণাবেক্ষণের নথি, সর্বশেষ মেরামত ও পরিদর্শনের তারিখ, ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মান, এআরডি সিস্টেমের কার্যকারিতা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো যাচাই না হলে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন কতটা সম্ভব- সে প্রশ্নও উঠেছে।

মৃত্যুর প্রকৃত কারণও উদ্ঘাটন জরুরি
অগ্নিকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা ও কারণ। একদিকে গণমাধ্যমে ছয়জনের মৃত্যুর খবর এসেছে, অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে পদদলিত হয়ে কারো মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক প্রমাণ নেই। সংসদ সদস্যও দুজনের মৃত্যুর কথা বলেছেন এবং তাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন।

অন্যদিকে জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে পাঁচজনকে মৃত অবস্থায় আনার তথ্য থাকার কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।

ফলে তদন্ত কমিটির সামনে শুধু ‘আগুনের কারণ’ নয়, অগ্নিকাণ্ডের সময় কী ঘটেছিল, কতজন আহত হয়েছিলেন, কতজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল, প্রত্যেকের মৃত্যুর মেডিক্যাল কারণ কী এবং পদদলিত হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না- এসব প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট উত্তর খুঁজে বের করার বিষয়টি সামনে এসেছে।

নবগঠিত কমিটির তিন কার্যদিবসের তদন্ত প্রতিবেদনেই এখন নির্ভর করছে এসব প্রশ্নের অনেকগুলোর উত্তর। আগের কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠনের পর তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর ও পূর্ণাঙ্গ হয়- সেদিকেই তাকিয়ে মমেকের রোগী, স্বজন ও স্থানীয় মানুষ।