ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত মার্কিন কংগ্রেসের ভবন
ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত মার্কিন কংগ্রেসের ভবন। সংগৃহীত ছবি

নির্বাচনের রাতটা ডেমোক্র্যাটদের জন্য এক স্বপ্নের মতো ছিল, যার বাস্তবতা জানুয়ারিতে এসে ধরা দেবে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে তাদের উল্লসিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। কেননা এক বিরাট বিজয়ের পর নতুন বছরের শুরু থেকে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেবে ডেমোক্র্যাটরা।

Advertisement

উচ্ছ্বসিত হাউজ ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস ঘোষণা করেন, ‘আজ থেকে আমেরিকার মহান প্রত্যাবর্তন শুরু হলো।’ 

মাসব্যাপী নির্বাচনী প্রচারণার সময় নানা প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর- যেমন দুর্নীতির তদন্ত করা, স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও পেট্রোলের খরচ কমানো এবং ইরান যুদ্ধ সীমিত করা, তারা এখন পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তবায়নের পথে আরো কঠিন পথচলা শুরু করবে।

ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন মানে এই নয় যে ডেমোক্র্যাটরা এখনই তাদের পরিকল্পনায় থাকা আইন প্রণয়নের বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন শুরু করতে পারবে। কারণ তাদের হাতে কংগ্রেস থাকলেও, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এখনো আইন প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা রয়েছে।

যা ঘটেছে তাকে ডেমোক্র্যাটদের ‘জনগণের ম্যান্ডেট’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, এমনটাই বলেছেন মার্কিন সিনেটর ক্রিস কুনস। তিনি সতর্ক করে বলেন, দলটি এখনো ‘গভীরভাবে অজনপ্রিয়’।

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমরা কাজ করতে পারি, মূলত তাদের উদ্বেগ ও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি, বিশেষ করে কম মজুরি এবং বাড়তে থাকা খরচ নিয়ে।’

ডেমোক্র্যাটরা যা অর্জন করতে পারে
ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান রবার্ট গার্সিয়া শিগগিরই প্রতিনিধি পরিষদের একটি শক্তিশালী তদারকি কমিটির নেতৃত্ব দেবেন, যা ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরকে বেশ কঠিন করে তোলার ক্ষমতা রাখবে।

নির্বাচনের রাতে জয়সূচক ফলাফল আসতে শুরু করার পর এক বিবৃতিতে এই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বলেন, ‘আইনজীবীর সাহায্য নিন।’

মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ- উভয় কক্ষেই কমিটিগুলোর তদন্ত করার ক্ষমতা আছে, যা ব্যবহার করে তারা প্রেসিডেন্ট এবং তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ওঠা কথিত স্বার্থের সংঘাত এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে পারে।

মঙ্গলবার সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর একটি তালিকা দেন গার্সিয়া। ট্রাম্পের পরিবার, করপোরেট দুর্নীতি, ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের বিরুদ্ধে ওঠা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এবং এপস্টিন ফাইলগুলো নিয়ে সরকারের কার্যকলাপ।

প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভা ও বিচার বিভাগীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করা বা আটকে দেয়ার ক্ষমতাও রয়েছে সিনেটের।

উদাহরণস্বরূপ, ট্রাম্পের মেয়াদে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে যদি কোনো শূন্যপদ তৈরি হয়, তাহলে সিনেট ডেমোক্র্যাটরা তাদের নতুন ক্ষমতা ব্যবহার করে মনোনয়ন আটকে দিতে পারেন। অথবা ট্রাম্পকে আরো মধ্যপন্থী প্রার্থী বেছে নিতে বাধ্য করতে পারেন, যিনি দ্বিদলীয় সমর্থন পাবেন।

প্রেসিডেন্টের অভিশংসন করার ক্ষমতাও প্রতিনিধি পরিষদের রয়েছে, যা কোনো কর্মকর্তাকে পদ থেকে সরানোর জন্য কংগ্রেসের প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ।

ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে দু’বার তাকে অভিশংসিত করেছিল, যদিও মার্কিন সিনেট শেষ পর্যন্ত উভয় ক্ষেত্রেই তাকে খালাস দেয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিল।

কিন্তু যেহেতু অভিশংসন মামলায় একজন প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করতে মার্কিন সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ৬৭ ভোট প্রয়োজন হয়, তাই এই বিষয়টি সম্ভবত ডেমোক্র্যাটদের নাগালের বাইরেই থাকবে।

অভিশংসন ভালো ধারণা কি না, তা নিয়েও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সক্রিয় বিতর্ক রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রথম অভিশংসন দলীয় বিদ্বেষকে উসকে দিয়েছিল এবং ট্রাম্পকে পরবর্তীতে নিজেকে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ করে দিয়েছিল। যা পরে তার দ্বিতীয় হোয়াইট হাউস দৌড়ের জন্য সমর্থন তৈরিতে সাহায্য করেছিল।

জেফরিস, যাকে প্রায় নিশ্চিতভাবে যেকোনো ডেমোক্র্যাট অভিশংসন প্রচেষ্টায় সবুজ সংকেত দিতে হবে, তিনি তার পরিকল্পনা অস্পষ্ট রেখেছেন।

তিনি আগস্টে সিএনএনকে বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, আমরা স্পষ্ট করেছি যে, আমরা কোনো কিছুই বাতিল করিনি।’

ডেমোক্র্যাটরা যা করতে হিমশিম খেতে হতে পারে
নির্বাচনের আগেই কংগ্রেসের কার্যকারিতা নিয়ে সুস্পষ্ট হতাশা ছিল আমেরিকানদের মধ্যে। অক্টোবরে প্রকাশিত গ্যালাপের এক জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত ভোটারদের মাত্র ১৪ শতাংশ আইনপ্রণেতাদের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট ছিলেন।

হোয়াইট হাউসে একজন রিপাবলিকান, কিন্তু কংগ্রেস পরিচালনা করছেন ডেমোক্র্যাটরা, এর ফলে আমেরিকানরা আরো বেশি অচলাবস্থার মুখোমুখি হতে পারেন।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনবিষয়ক অধ্যাপক কেসি বারগাট বলেছেন, ‘যদি আপনার মনে হয়ে থাকে যে রিপাবলিকানদের একক নিয়ন্ত্রণে থাকা গত কংগ্রেসে আইন পাস করা কঠিন ছিল, তাহলে সেটি এখন আরো অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠবে।’

যেহেতু তারা উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে, তাই ডেমোক্র্যাটরা তুলনামূলক সহজভাবে কংগ্রেসে আইন প্রণয়ন করতে সক্ষম হবে।

তবে এটিকে আইনে পরিণত করা কঠিন হবে। কারণ অধিকাংশ আইন কার্যকর হওয়ার জন্য একজন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়।

ট্রাম্পের কাছে কংগ্রেসের পাস করা আইন প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা আছে যা তিনি সমর্থন করেন না এবং কংগ্রেস কেবল উভয় কক্ষ থেকে সুপারমেজরিটি দিয়ে তাকে অগ্রাহ্য করতে পারে। মঙ্গলবারের সাফল্য সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব হবে না।

মঙ্গলবার রাতে তার দল একের পর এক সিনেট নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার সময়, ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসের সাথে কথা বলার সময় সমঝোতার সুর তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা ডেমোক্র্যাটদের সাথে কাজ করব এবং আপনি জানেন, তাদের সাথে কাজ করার অপেক্ষায় থাকব। আমরা সম্ভবত কিছু একটা ঠিক করে নেব।’

কিন্তু কয়েক মিনিট পরে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তার প্রচারণার লাল টুপির ছবি পোস্ট করেন, যার সামনে ‘ভেটো’ শব্দটি খোদাই করে লেখা। ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসের প্রতি তার এই দ্বৈত সত্তার কৌশলটি একটি মূল বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

যদিও ট্রাম্পের বিরোধিতা ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য এনে দিয়েছে, আইনপ্রণেতারা মঙ্গলবার রাতে স্বীকার করেছেন, এটা যথেষ্ট নাও হতে পারে।

কুনস বলেন, ‘এটা অপ্রতিরোধ্যভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার অ্যাজেন্ডা ও নীতির প্রত্যাখ্যান। কিন্তু আমরা যদি অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করি, বা আমরা যদি নিজেদের মধ্যে খুব বেশি লড়াই করি, তাহলে আমরা এই মুহূর্তটি হারাতে পারি।’

ভেটোর হুমকি সত্ত্বেও জেফরিস বলেছেন যে, তার দল মেডিকেইডের মতো স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিগুলোতে (যা নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী ব্যবহার করে) এবং ওবামাকেয়ার মার্কেটপ্লেসে রিপাবলিকানদের করা উল্লেখযোগ্য কাটছাঁটগুলো পুনর্বহাল করতে চায়।

স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আয়োজিত সেপ্টেম্বরের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘হাউজ ডেমোক্র্যাট হিসেবে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই মেডিকেইড কর্তন প্রত্যাহার করতে এবং অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের ট্যাক্স ক্রেডিটগুলোর মেয়াদ বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ 

সাধারণত দ্বিদলীয় বিষয়গুলোতে– যেমন সাশ্রয়ী মূল্য, এআই শিল্প নিয়ন্ত্রণ, ইসরাইলের জন্য সামরিক তহবিল পুনর্মূল্যায়ন এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে আনা– আইনপ্রণেতারা আপস করার চেষ্টা করলে আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে।

২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় রিপাবলিকানরা যেহেতু বিরোধী দলে পরিণত হচ্ছে, তাই ডেমোক্র্যাটদের খুব বেশি জয় অর্জনে সহায়তা করার মানসিকতা তাদের নাও থাকতে পারে।

ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের মধ্যেও ফাটল দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে ইসরাইল-সংক্রান্ত বিষয়ে, যা দলীয় ঐকমত্য কঠিন করে তুলতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় ইসরাইলের জন্য অব্যাহত মার্কিন সামরিক তহবিল নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে বিভাজন দেখা দিয়েছিল।

মিশিগানের আবদুল আল-সাইয়িদের মতো নতুন সিনেটররা এবং মার্কিন হাউসের কিছু নতুন সদস্য প্রচারণার সময় বলেছিলেন, তারা ইসরাইলকে সাহায্য কমানোর জন্য আইনে ভোট দেবেন। এই ডেমোক্র্যাটরা তাদের নিজেদের নেতৃত্বের কাছ থেকে বাধার মুখোমুখি হতে পারেন।

এরপর রয়েছে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়টি, যা ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও কঠিন হতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেও কংগ্রেস ইরানের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার জন্য দ্বিদলীয় প্রচেষ্টা দেখেছিল। এই পদক্ষেপগুলোর কয়েকটি এক বা উভয় কক্ষে পাস হলেও, কংগ্রেস সেগুলো কার্যকর করতে পারেনি।

উল্লেখযোগ্যভাবে, হাউস ও সিনেট- উভয়ই জুন মাসে ইরানের সাথে শত্রুতা বন্ধ করার একটি প্রস্তাব পাস করেছিল, ট্রাম্প সেখানে ভেটো দিতে না পারলেও, উপেক্ষা করেছিলেন।

হোয়াইট হাউস যুক্তি দিয়েছে যে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রাম্পের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। তাকে বাধ্য করার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের কর্তৃত্বের বিষয়টি একটি ‘আইনি প্রশ্ন’। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের শাসনব্যবস্থা অধ্যয়ন বিভাগের সিনিয়র ফেলো স্কট অ্যান্ডারসন এ কথা বলেছেন।

তিনি আরো বলেছেন, ‘কংগ্রেস বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াই চালানোর চেষ্টা করতে পারে এবং আদালতকে বাধ্য করতে পারে আমাদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য।’

সূত্র : বিবিসি