মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন
আজ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন : কী বলছে জরিপ। সংগৃহীত

আজ মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্র এবং সেইসাথে পুরো দুনিয়ার জন্য এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি এতে হেরে গেলে মার্কিন রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সেটার প্রভাব বিশ্ব রাজনীতিতেও পড়তে পারে।

Advertisement

অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অভিবাসন সমস্যাই এই নির্বাচনের শীর্ষ আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় শিবিরের সমর্থকরাই উদ্বিগ্ন হলেও সাম্প্রতিক জরিপগুলো অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কার্যকারিতা এবং অন্যান্য মূল ইস্যুতে দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরেছে।

রবিবার প্রকাশিত এনবিসির এক জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৭৫ শতাংশই মার্কিন অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং ৫১ শতাংশ ব্যক্তি তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট।

অক্টোবর মাসে পরিচালিত অন্য জরিপগুলোতেও দুই দলের ভোটাররা তাদের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে কী ভাবছেন এবং কোন বিষয়গুলো তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে তার চিত্র ফুটে উঠেছে।

জরিপের মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো

ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের কাছে কোন ইস্যুগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

মার্কিন ভোটারদের কাছে অর্থনীতিই প্রধান উদ্বেগের বিষয়, তবে স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন ও অপরাধের মতো বিষয়গুলোতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের গুরুত্ব দেওয়ার মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে।২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবরের মধ্যে পরিচালিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের ৮৪ শতাংশই অর্থনীতিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে 'অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ' হিসেবে বিবেচনা করছেন। রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনকারীদের ৮২ শতাংশ এবং ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ৮৮ শতাংশের কাছে এটিই ছিল শীর্ষ ইস্যু।
তবে অন্যান্য ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্য ভিন্নতা দেখা গেছে : ডেমোক্রেসির ভবিষ্যৎ ও স্বাস্থ্যসেবা: ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থকদের প্রায় ৮৫ শতাংশ গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ রক্ষা করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, যেখানে রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৯ শতাংশ। ডেমোক্র্যাটদের ৮২ শতাংশের কাছে স্বাস্থ্যসেবা একটি প্রধান অগ্রাধিকার ছিল, যা রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে ছিল ৫৩ শতাংশ।

অভিবাসন ও অপরাধ : রিপাবলিকান সমর্থকরা অভিবাসন নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন; তাদের ৭২ শতাংশ এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ। হিংসাত্মক অপরাধের বিষয়টিও রিপাবলিকানদের কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে (৬৪ শতাংশ), যা ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে ছিল ৩৭ শতাংশ।

কাইজার ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন কর্তৃক ১৬ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পরিচালিত এক স্বাধীন জরিপ অনুযায়ী, ৪২ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার স্বাস্থ্যসেবার খরচ নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাটদের ওপর বেশি আস্থা রেখেছেন, যেখানে মাত্র ২২ শতাংশ ভরসা রেখেছেন রিপাবলিকানদের ওপর।

জীবনযাত্রার ব্যয়ের ক্ষেত্রে ৩৯ শতাংশ ভোটার ডেমোক্র্যাটদের এবং ২৫ শতাংশ রিপাবলিকানদের বেশি পছন্দ করেছেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার অর্থনৈতিক নীতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরের মতোই দলীয় লাইনে বিভক্ত।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে, ডেমোক্র্যাট ও ডেমোক্র্যাট-ঘেঁষা উত্তরদাতাদের ৯১ শতাংশই মনে করেন ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি পরিস্থিতিকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে গেছে।

অন্যদিকে, রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ বলেছেন তার নীতি অর্থনীতির উন্নতি ঘটিয়েছে, ৩৫ শতাংশ মনে করেন এগুলো পরিস্থিতি খারাপ করেছে এবং ২৫ শতাংশের মতে এর প্রভাব খুবই সামান্য।

১ নভেম্বরের এনবিসি নিউজের জরিপ অনুযায়ী, নিবন্ধিত ভোটারদের মাত্র ৪০ শতাংশ ট্রাম্পের সামগ্রিক কাজের অনুমোদন দিয়েছেন, যেখানে ৬০ শতাংশই তাঁর ভূমিকার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন।

অর্থনীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?

ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে সকল আমেরিকানই উদ্বিগ্ন, তবে রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বেশি দেখা গেছে।

অক্টোবরে পরিচালিত পিউ রিসার্চের জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের ৩৬ শতাংশ মার্কিন অর্থনীতিকে 'চমৎকার বা ভালো' হিসেবে রেটিং দিয়েছেন, যা ডেমোক্র্যাট বা ডেমোক্র্যাট-ঘেঁষা ভোটারদের ক্ষেত্রে ছিল মাত্র ৯ শতাংশ।তবে উভয় পক্ষের বড় একটি অংশই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবামূল্যের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

পিউ-এর তথ্যমতে, ডেমোক্র্যাট ও ডেমোক্র্যাট-ঘেঁষাদের ৮২ শতাংশ খাদ্য ও ভোক্তা পণ্য নিয়ে চিন্তিত, যা রিপাবলিকানদের মধ্যে ৬২ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবার খরচ ডেমোক্র্যাটদের ৮০ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৫৭ শতাংশকে চিন্তিত করেছে। পেট্রোল ও জ্বালানির দাম ডেমোক্র্যাটদের ৮১ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৬৫ শতাংশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়েছে।

১৪ অক্টোবরে প্রকাশিত ফক্স নিউজের জরিপেও দেখা গেছে, ৭৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার অর্থনীতিকে নেতিবাচক রেটিং দিয়েছেন এবং ৬০ শতাংশ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয়কে তাদের প্রধান অর্থনৈতিক উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

১ নভেম্বরের এনবিসি নিউজের জরিপে উঠে এসেছে, রিপাবলিকান উত্তরদাতাদের ৫৩ শতাংশও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট।এছাড়া পিউ রিসার্চ সেন্টার আরও দেখেছে যে, ২০২২ সালের তুলনায় এবার গর্ভপাত এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ  ইস্যু ডেমোক্র্যাট ভোটারদের কাছে কিছুটা কম কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের কাছে চার বছর আগের তুলনায় শিক্ষা নীতি ও জ্বালানি নীতির গুরুত্ব কিছুটা কমেছে।

আমেরিকানরা কি তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট?

এনবিসির জরিপে ৫১ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, যেখানে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ৪৯ শতাংশ।এনবিসির ৩০ বছরের জরিপের ইতিহাসে এই প্রথম ব্যক্তিগত অর্থনীতি নিয়ে সন্তুষ্টির চেয়ে অসন্তোষের পাল্লা ভারী হতে দেখা গেল।১৯-২০ অক্টোবরের এনপিআর/পিবিএস নিউজ/মারিস্ট জরিপে ৩৮ শতাংশ ভোটার বলেছেন যে গত এক বছরে তাদের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে, ৪৪ শতাংশ বলেছেন পরিস্থিতি প্রায় একই রকম রয়েছে এবং ১৫ শতাংশ জানিয়েছেন তাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

ডেমোক্র্যাট ভোটারদের ৫১ শতাংশ বলেছেন তাদের আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে, যেখানে রিপাবলিকানদের মধ্যে এই দাবি করা ভোটারের হার ছিল ২১ শতাংশ।রয়টার্স/ইপসোস জরিপ (৩০ সেপ্টেম্বর–৫ অক্টোবর)-এ ডেমোক্র্যাটদের ৭১ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৫৭ শতাংশ জানিয়েছেন যে তাঁদের আয় পণ্যের দাম বাড়ার হারের সাথে তাল মেলাতে পারছে না।ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসের সাবেক কর্মকর্তা এবং সিনেটের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এরিক হ্যাম বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী শুল্ক আরোপ এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ আমেরিকান পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।আল জাজিরাকে হ্যাম বলেন, 'আমেরিকানরা কেবল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের কারণে নিজের ডেকে আনা খেসারতই দিচ্ছে না, বরং এই অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও যুদ্ধের প্রভাবও তাদের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে।'

ভোট দেওয়া নিয়ে কাদের মধ্যে বেশি উদ্দীপনা?

নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে উচ্চতর উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়েছে।মারিস্টের জরিপে দেখা গেছে, ৯১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ভোটার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদ্দীপিত বা উৎসাহিত, যা রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে ৮৬ শতাংশ এবং স্বতন্ত্রদের ক্ষেত্রে ৭৬ শতাংশ।সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস কর্মকর্তা জন ফিউরি বলেন, প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে মূলত ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।'এটি নতুন ভোটারদের রাজি করানোর নির্বাচন নয়। এটি নিজের মূল ভোটব্যাংককে ভোটকেন্দ্রে টেনে নিয়ে আসার নির্বাচন,' বলেন ফিউরি।

কেএফএফ জরিপে ডেমোক্র্যাট সমর্থকরা রিপাবলিকানদের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি বলেছেন যে তারা আগের চেয়ে ভোটদানে 'অধিক অনুপ্রাণিত' (৬৩ শতাংশ বনাম ৩৮ শতাংশ)।

১ নভেম্বরের এনবিসি নিউজ জরিপেও নির্বাচনের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে; যেখানে নিবন্ধিত ভোটারদের ৭০ শতাংশই ১০-পয়েন্ট স্কেলে তাদের আগ্রহের মাত্রা ৯ বা ১০ হিসেবে রেটিং দিয়েছেন।আমেরিকানরা কাকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন?

নির্বাচনের শেষ কয়েক সপ্তাহে পরিচালিত জরিপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ভোটাররা রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বা ডেমোক্রেটিক নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।২৮-৩০ অক্টোবরে পরিচালিত এবং ১ নভেম্বরে প্রকাশিত এনবিসি জরিপ অনুসারে, ৫২ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার কংগ্রেসে ডেমোক্রেটিক নিয়ন্ত্রণ পছন্দ করেছেন, যার বিপরীতে ৪৫ শতাংশ রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণ পছন্দ করেছেন।একইভাবে ২২ থেকে ২৬ অক্টোবরের রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটার তাঁদের এলাকার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দেবেন বা তাঁদের দিকে ঝুঁকেছেন, যার বিপরীতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থন করেছেন ৪৪ শতাংশ।

উল্লেখ্য, এই সমীক্ষাগুলো কেবল ভোটারদের সার্বিক মনোভাবের পরিমাপ করে, যা প্রতিটি পৃথক আসনের চূড়ান্ত ফলাফলের হুবহু প্রতিফলন নাও হতে পারে।

সূত্র : আল জাজিরা