রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, আইএমএফ বার্ষিক সভা
আইএমএফ সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন অর্থ ‍উপদেষ্টা। সংগৃহীত

দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার চাপ সামাল দিতে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এসব কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্য কমবে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে আশা করছেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

Advertisement

শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চলমান বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভার এক ফাঁকে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

উপদেষ্টা বলেন, ‘দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি চাপে রয়েছেন। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও কৃষি উপকরণের ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। তাই জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সরকার সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের চেষ্টা করছে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘অতীতের মূল্যস্ফীতির কারণে ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। একইসাথে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কট নতুন করে দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো, নতুন করে মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামতে না দেয়া এবং যারা দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন, তাদের সেখান থেকে বের করে আনা।’

ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য কমার আশা

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতা ছিল। যাদের সহায়তা পাওয়ার কথা, তাদের অনেকে তালিকায় স্থান পাননি। অন্যদিকে, অযোগ্য ব্যক্তিরা তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এ সমস্যা দূর করতে সরকার ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো ব্যবহার করে উপকারভোগী নির্বাচন ও সহায়তা বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে চায়।’

তার দাবি, ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ড সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা পরিবারগুলো সুরক্ষা পাবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে বলে সরকারের প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মূল্যায়নেও এ ধরনের কর্মসূচির কার্যকারিতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলেও জানান উপদেষ্টা।

রাজস্ব বাড়াতে সংস্কারের ওপর জোর

রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা।

তার ভাষ্য, অতীতে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি, কর অব্যাহতি ও কর ফাঁকির কারণে রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এসব অনিয়ম মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে।

তিনি জানান, ‘গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। আর দায়িত্ব গ্রহণের পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এই অগ্রগতিকে কর ফাঁকি ও অনিয়ম কমানোর উদ্যোগের ফল হিসেবে দেখছেন তিনি।’

আইএমএফের সংস্কারসংক্রান্ত শর্ত ও অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, ‘অতীতে বিভিন্ন সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়নে ঘাটতি ছিল। বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নে কাজ করছে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার মাধ্যমে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।’

ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা

ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও পতিত সরকারের আমলে অর্থ লুটপাটের কারণে সৃষ্ট সঙ্কট মোকাবিলায় সরকারকে বড় আর্থিক দায় সামলাতে হচ্ছে বলে জানান তিতুমীর।

তার ভাষ্য, পতিত সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির যে বোঝা তৈরি হয়েছে, তা অতীতের অনিয়মের পরিণতি। তবে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার এ খাতে আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন এবং ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।’

অন্যদিকে, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে রেজল্যুশন আইনের আওতায় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

উপদেষ্টার মতে, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা পরস্পর সম্পর্কিত। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটের মতো বহিরাগত অভিঘাতের মধ্যেও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।