
আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বজুড়ে ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। অথচ এ সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৮০ কোটি। বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থানের এই বৈশ্বিক সংকট বাংলাদেশের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ। কারণ, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষিত বেকারত্ব কমানো এবং দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলা এখন অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু তাঁদের সবার জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণ যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। আবার শিল্প ও সেবা খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারত্ব, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি—দুই সমস্যাই দেশের শ্রমবাজারকে চাপে ফেলছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভার মূল অধিবেশনে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা তার দেয়া বক্তব্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বৈশ্বিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এ দুইটি লক্ষ্য একসাথে অর্জন করা জরুরি।’
বাংলাদেশের জন্য এই বার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে কর্মসংস্থানের বড় অংশ তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, প্রবাসী শ্রমবাজার ও অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল। এসব খাতে কাজের সুযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা, মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা সীমিত।
অন্যদিকে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ায় প্রচলিত অনেক কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা তৈরি করতে না পারলে তরুণদের কর্মসংস্থানের সঙ্কট আরো তীব্র হতে পারে।
দক্ষতার ঘাটতি ও শিক্ষিত বেকারত্ব বড় বাধা
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের দক্ষতার সাথে শিল্প ও সেবা খাতের চাহিদার যথেষ্ট মিল নেই। প্রযুক্তিগত জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা, ইংরেজিতে যোগাযোগ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতায় ঘাটতি থাকায় অনেক তরুণ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
এ পরিস্থিতিতে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বা সনদধারীর সংখ্যা বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের সমস্যার সমাধান হবে না। শিল্পের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। একইসাথে কর্মরত শ্রমিকদের নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাওয়াতে পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিনিয়োগ বাড়াতে হবে কর্মসংস্থানমুখী খাতে
অজয় বাঙ্গা বলেন, ‘ভবিষ্যতের উন্নয়ন নির্ভর করবে সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, জনহিতকর উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর ওপর। যেসব দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেশি এবং বাজার এখনো পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি, সেখানে সরকারি ও স্বল্পসুদের উন্নয়ন অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে বেসরকারি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।’
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উৎপাদনশীল খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ অর্থবছরে বেসরকারি মূলধন সংগ্রহে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ভূমিকার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১২ বিলিয়ন ডলারে। নিজস্ব অর্থায়নসহ মোট অর্থায়নের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ২৩০ বিলিয়ন ডলার।
নারীর কর্মসংস্থান ও অনানুষ্ঠানিক খাতেও নজর প্রয়োজন
বাংলাদেশে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিশুযত্নের সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সেবায় নারীদের প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে যৌথ অর্থায়নব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে। ছয়টি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক বিনিয়োগ মূল্যায়ন, নথিভুক্তকরণ ও বিনিয়োগ স্থানান্তরের অভিন্ন পদ্ধতি তৈরিতে কাজ করছে। এর লক্ষ্য হলো উন্নয়ন অর্থায়নের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশের জন্যও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন ও বেসরকারি মূলধনকে কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না; বিনিয়োগের ফলে কতটা নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে, চাকরির মান কেমন এবং স্থানীয় শ্রমশক্তি কতটা উপকৃত হচ্ছে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় শক্তি হতে পারে। তাদের উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা গেলে আয়, ভোগ, বিনিয়োগ ও জীবনযাত্রার মান বাড়বে। বিপরীতে, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হলে শিক্ষিত বেকারত্ব, অনিশ্চিত আয় এবং সামাজিক চাপ বাড়ার ঝুঁকি থাকবে।
অজয় বাঙ্গার মতে, কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য ঘাটতি একটি পূর্বাভাস, অনিবার্য ভবিষ্যৎ নয়। সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য এখন মূল কাজ হলো তরুণদের দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে ব্যবধান কমানো, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া গেলে তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতির বোঝা নয়, বরং উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








